প্রকাশিত :
২০:০৭, ১৩ মে ২০২৬
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমের পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবিতে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
আজ বুধবার (১৩ মে) রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান চত্বর থেকে মিছিল বের করেন তারা। এতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসিক হল ঘুরে প্রক্টর অফিসের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি জানান।
দাবিগুলো হলো- আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে, দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্পূর্ণ প্রক্টোরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করতে হবে, শিক্ষার্থী, বহিরাগত বা শ্রমিক—যে কারও দ্বারা সংঘটিত হয়রানি ও হেনস্তার ঘটনা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রবেশপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ ও কুইক রেসপন্স টিমে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, ‘মঙ্গলবার রাতে প্রক্টর অফিসের সামনে অধ্যাপক রশীদুল আলম বলেছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রক্টরের দায়িত্ব নয়, বরং রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব।’
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘প্রক্টর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি কীভাবে বলতে পারেন যে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্ব তার নয়? এছাড়া তার অফিসে জমা পড়া কোনো হয়রানির অভিযোগও তিনি সমাধান করতে পারেননি।’
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে পাশের জঙ্গলে ধর্ষণচেষ্টা করা হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর চিৎকার শুনে আশেপাশে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী এগিয়ে গিয়ে তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক তানভীর হোসেন বলেন, ‘ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হলের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি তার পিছু নেন। হঠাৎ দেখা যায় ওই ব্যক্তি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর গলায় দড়ির মতো কিছু একটা পেঁচিয়ে টেনে পাশের জঙ্গলে নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় বুধবার অজ্ঞাতদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. জেফরুল হাসান চৌধুরী বাদী হয়ে এই মামলা করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, আমরা কয়েকজন বাইকে করে পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল অতিক্রম করার সময় হঠাৎ একজনের চিৎকার শুনতে পাই। আমরা সেখানে গেলে পাশের জঙ্গল থেকে একটা মেয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় আসে। তার পায়ে স্যান্ডেল ছিল না। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মাটি, ধুলা লেগে ছিল। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আপু কী সমস্যা?’ তখন ওই শিক্ষার্থী জানান, কেউ একজন তাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করছে। আমরা উপস্থিত সবাই তৎক্ষণাৎ জঙ্গলে ঢুকে অভিযুক্তকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, কিন্তু অন্ধকারে তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর আমরা নিরাপত্তা শাখায় ফোন দিই। তারা আসার পরে ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীকে মেডিকেল সেন্টারে পাঠানো হয়।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর জাকসুর নেতারাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা শাখার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে অভিযুক্তকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন এবং দ্রুত এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ওই শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, রাত ১১টার কিছু পর ওই শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের একটি সড়ক ধরে হাঁটছিলেন। সে সময় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। পরিত্যক্ত ফজিলাতুন্নেছা হলের কাছাকাছি পৌঁছালে ওই ব্যক্তি তার গলায় জালের মতো একটি বস্তু পেঁচিয়ে আল বেরুনী হলের বর্ধিত অংশের পাশের ঝোপে টেনে নিয়ে যান। সিসিটিভি বিশ্লেষণে অজ্ঞাতনামা ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেলেও তার পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তকে চিহিৃত করেছি। তবে তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় রয়েছে। আমরা কোনো না কোনো ফুটেজ দেখে তার পরিষ্কার ছবি পাব বলে আশা করছি। আমরা ইতিমধ্যে পুলিশকে এই বিষয়ে জানিয়েছি। অতি দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’