প্রকাশিত :
১০:৫৬, ০৩ মে ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ১১:১৯, ০৩ মে ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। আজ রোববার (৩ মে) এ ফল প্রকাশ হয়।
শিক্ষার্থীরা দুইভাবে ফল জানতে পারছেন। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে NU ATHN লিখে রোল নম্বর দিয়ে 16222 নম্বরে পাঠালে ফিরতি বার্তায় ফল জানা যাবে। এছাড়া ভর্তিবিষয়ক ওয়েবসাইটে (https://nu.admissions.com.bd/nu-admission-result/) লগইন করে ড্যাশবোর্ড থেকে ‘ফল’ অপশনে গিয়ে ফল দেখা ও ডাউনলোড করা যাবে।
এর আগে, ২৫ এপ্রিল সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে একযোগে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
গত ২৪ এপ্রিল রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তির পরীক্ষায় ৩১টি বিষয়ে ভর্তি–ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ জন। ৮৮০টি কলেজে স্নাতকে (সম্মান) শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এ সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নিজেদের ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা, ট্রেড কোর্স চালু করা, আগামী বছরের মধ্যে সেশনজট শূন্যে আনা ইত্যাদি।
ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য জানান, দেশের ৮৮০টি কলেজে আসন রয়েছে ৪ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৫টি। এর মধ্যে ৩৭৫টি সরকারি কলেজে আসন রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৫২০টি এবং ৫০৫টি বেসরকারি কলেজে আসন রয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৩৫৫টি। সরকারি কলেজে আবেদন জমা পড়ে ৩ লাখ ৯৪ হাজারের বেশি। আর বেসরকারি কলেজে আবেদন জমা পড়েছে ৫৮ হাজার ৯১৯টি।
এর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। গত বছর থেকে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা বাগানের শ্রমিক লাইনের ছোট্ট একটি ঘরে জন্ম শান্তা যাদবের। সেই শান্তা এখন পড়বেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে। সেখানে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি পেয়েছেন তিনি।
শান্তার বাবা-মা দুজনই চা শ্রমিক। বাবা-মায়ের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও কম। সেই সীমিত সামর্থ্যের পরিবার থেকেই উঠে এসে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি’ প্রোগ্রামে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন শান্তা।
শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব ও মা রীনা যাদব দুজনই চা শ্রমিক। সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানোই তাঁদের জন্য কঠিন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না। তবে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী শান্তা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।
পারিবারি সূত্রে জানা যায়, লংলা চা বাগানের স্থানীয় স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে কুলাউড়ার ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি।
উচ্চশিক্ষার জন্য শান্তা ভর্তি হন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে। সেখান থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি।
হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ পাওয়ার আগে বিশ্বের আরও ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার প্রস্তাব পেয়েছিলেন শান্তা। নিজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রোগ্রামটি বেছে নেন। প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি নিয়ে সেখানে পড়ার সুযোগ তাঁর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে করেন শান্তা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পথও খুলছে তাঁর সামনে।
শান্তার কাছে জনস্বাস্থ্য কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়। চা বাগানের শ্রমিকেরা অসুস্থ হলে চিকিৎসা পেতে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন, তা তিনি কাছ থেকেই দেখেছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পেতে দূরে যেতে হওয়া এবং চিকিৎসা গ্রহণের নানা সীমাবদ্ধতা তাঁর নিজের কমিউনিটির মানুষের জীবনের অংশ।
এসব অভিজ্ঞতা থেকেই জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় শান্তার। নিজের এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। হার্ভার্ডে পড়াশোনার সুযোগ তাই তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, নিজের কমিউনিটির স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মেয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শুরুতে শান্তাকে শহরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ হয়নি। তবু মেয়ের মেধা, আগ্রহ ও অধ্যবসায় দেখে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একদিন মেয়ে নিজের যোগ্যতায় ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে।
শান্তার বর্তমান অর্জন সেই আশা এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগের প্রতিফলন। মাসে ১০ হাজার টাকারও কম আয়ের একটি পরিবার থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে, সীমিত সামর্থ্য সব সময় শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শান্তা নিজের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি চা বাগানের অন্য শিক্ষার্থীদের নিয়েও ভেবেছেন। চা ছাত্র সংসদের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চা বাগানের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেন তিনি।
চা বাগানের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার পথে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সুযোগের অভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে শান্তার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো তাঁদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তাঁর পথচলা অন্য শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের সামর্থ্য ও সুযোগ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে।
হার্ভার্ডে পড়াশোনা শেষে নিজের এলাকায় ফিরে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে চান শান্তা। তাঁর এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের অভিজ্ঞতা এবং বেড়ে ওঠা কমিউনিটির মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
যে চা বাগানের সীমাবদ্ধতা কাছ থেকে দেখে তাঁর জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে, উচ্চশিক্ষার পর সেই এলাকার মানুষের জন্যই কাজ করতে চান তিনি। হার্ভার্ডের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজের কমিউনিটির স্বাস্থ্যসেবায় কীভাবে অবদান রাখা যায়, সেটিই এখন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শান্তা শুধু নিজের পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। চা ছাত্র সংসদের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময় চা বাগানের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার উদ্যোগও নেন।