মরে যাচ্ছে কাওয়াদিঘী, হারাচ্ছে এক জলরাজ্যের প্রাণ
দখল–দূষণ আর অব্যবস্থাপনায় সংকটে মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী হাওর
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কাওয়াদিঘী হাওর একসময় ছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম জীবন্ত জলাভূমি। বর্ষায় দিগন্তজোড়া পানির বিস্তার, শীতে অতিথি পাখির কলকাকলি আর দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণে মুখর থাকত পুরো এলাকা। স্থানীয় মানুষের জীবিকা, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই হাওর এখন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক রূপ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাবে কাওয়াদিঘী হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও পানির গভীরতা কমে গেছে, কোথাও জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর ও সদর উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত কাওয়াদিঘী হাওরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর এলাকা রাজনগরে এবং বাকি অংশ সদর উপজেলায় অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি জলাভূমি নয়, বরং জীবন ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের হাওরাঞ্চল প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব জলাভূমি বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, দেশীয় মাছের প্রজনন নিশ্চিত করে এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও হাওরের বড় অবদান রয়েছে।
একসময় শীত মৌসুমে কাওয়াদিঘী হাওরে দেখা মিলত নানা প্রজাতির অতিথি পাখির। ভোরবেলায় কুয়াশা ভেদ করে নৌকা চলার দৃশ্য ছিল এ অঞ্চলের পরিচিত সৌন্দর্যের অংশ। তবে এখন আগের মতো সেই পরিবেশ আর চোখে পড়ে না বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিবেশকর্মীদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে কাওয়াদিঘী হাওরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা। নৌভ্রমণ, পাখি পর্যবেক্ষণ, ওয়াচ টাওয়ার এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের সমন্বয়ে এটি হতে পারে সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র। এতে যেমন হাওর সংরক্ষণ সহজ হবে, তেমনি স্থানীয় মানুষের জন্য তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
তবে বর্তমানে কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে একসময় কাওয়াদিঘীর বড় অংশ তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলতে পারে।
পরিবেশবিদেরা বলছেন, একটি হাওর রক্ষা মানে শুধু একটি জলাভূমি সংরক্ষণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। তাই কাওয়াদিঘী হাওর রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।



















