ঈদে পর্যটকের ঢল সামলাতে কতটা প্রস্তুত শ্রীমঙ্গল?
প্রকৃতির মোহ, পর্যটনের সম্ভাবনা আর অব্যবস্থাপনার পুরনো বাস্তবতা
সংগ্রাম দত্ত: প্রকৃতির আপন খেয়ালে সাজানো পাহাড়, দিগন্তজোড়া চা-বাগান, হাওর, লেক আর বনভূমির অপরূপ সমাহারে মৌলভীবাজার যেন বাংলাদেশের এক জীবন্ত সবুজ ক্যানভাস। আর সেই জেলার প্রাণকেন্দ্র শ্রীমঙ্গল—যাকে বলা হয় দেশের “চায়ের রাজধানী” ও অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন নগরী। প্রতি বছর ঈদ এলেই এখানে নামে পর্যটকের ঢল। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা ছুটিকে ঘিরে ইতোমধ্যে সরগরম হয়ে উঠছে পুরো জেলা।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের আশা, দীর্ঘ এই ছুটিতে দেশজুড়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হবে শ্রীমঙ্গল। নীল আকাশ, সাদা মেঘ, পাহাড়ি বাতাস আর সবুজ চা-বাগানের টানে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসবেন এখানে। তবে প্রকৃতির মোহনীয় সৌন্দর্যের পাশাপাশি এবারও সামনে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পর্যটকদের বরণ করতে বাস্তবিক অর্থেই কতটা প্রস্তুত শ্রীমঙ্গল?
সবুজের রাজ্যে পর্যটনের অফুরন্ত আকর্ষণ
শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারজুড়ে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঢালে বিস্তৃত চা-বাগান, আনারস বাগান, লেকের নীল জলরাশি, বনভূমি ও হাওরের সৌন্দর্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মুগ্ধ করে প্রতিনিয়ত।
পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাইক্কা বিল, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, চা জাদুঘর, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, চা কন্যা ভাস্কর্য, ধলই চা-বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, কমলা রানির দিঘি, খোজার মসজিদ, নির্মাই শিববাড়ি, বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গ্রাম ও খাসিয়া পুঞ্জি।
এছাড়া জুড়ীর আগর ও কমলার বাগান, কুলাউড়ার গগনটিলা, কালাপাহাড়, মূরইছড়া ইকোপার্ক, হরিণছড়া ঝাউবন, শংকর টিলা লেকসহ আরও বহু স্পট পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বড় একটি অংশ রাতযাপনের জন্য শ্রীমঙ্গলকেই বেছে নেন। প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যটক শ্রীমঙ্গলের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে অবস্থান করেন। এখান থেকে তারা মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটন স্পটের পাশাপাশি সিলেট বিভাগের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানেও ঘুরে বেড়ান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ঈদ উপলক্ষে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পকে ঘিরে পর্যটকদের ব্যাপক আগমন ঘটবে এবং তাদের ব্যয়ে এ অঞ্চলে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি হবে। হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় বিভিন্ন সেবাখাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটনের সম্ভাবনায় আশাবাদ
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ-এর জেনারেল ম্যানেজার আরমান খাঁন গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, পাহাড়ি অরণ্য ও চা-বাগানের কচি পাতায় এখন সবুজের মায়াবী হাতছানি। এই নয়নাভিরাম পরিবেশ উপভোগ করতে পর্যটকরা প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন।
তিনি আরও গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চার লেনের কাজ সম্পন্ন এবং শমসেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তার মতে, একজন পর্যটক গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ব্যয় করেন। ফলে পর্যটন খাত থেকে বছরে বিপুল অঙ্কের অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
“প্রস্তুত” শ্রীমঙ্গল, নাকি প্রস্তুতির সংকট?
যদিও প্রতি ঈদের আগেই প্রশাসন ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়, “পর্যটকদের বরণ করতে প্রস্তুত শ্রীমঙ্গল”, কিন্তু বাস্তব চিত্র প্রায়ই ভিন্ন কথা বলে।
গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ঈদের ছুটিতে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেক পর্যটককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে রাস্তায়। কখনও কখনও কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতেই লেগেছে দীর্ঘ সময়।
ঈদের সময় শ্রীমঙ্গল শহর সংলগ্ন হবিগঞ্জ রোড, পল্লী বিদ্যুৎ গেইট এলাকা থেকে লাউয়াছড়া প্রবেশপথ পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড়ের কারণে স্বাভাবিক চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধার অভাব, সড়ক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং সমন্বিত ট্রাফিক পরিকল্পনার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সমাধান দৃশ্যমান নয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা
ঈদের সময়কার এমন পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা দেখা যায়। শ্রীমঙ্গলের পরিচিত মুখ মো. তারেক হাসানের একটি ভিডিও পোস্ট ভাইরাল হলে নতুন করে আলোচনায় আসে পর্যটন ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা।
ভিডিওতে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন, “শুধু কয়েকটি রিসোর্ট থাকলেই কি একটি শহর পর্যটনবান্ধব হয়ে যায়?”
তার এই মন্তব্য স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, পর্যটনের প্রচারণা বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন সেই তুলনায় এগোয়নি।
প্রশাসনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
শ্রীমঙ্গল ট্যুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, দীর্ঘ ছুটিতে এই জেলায় বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে। তাদের ধারণা, এবারের ঈদেও ৫০ থেকে ৬০ হাজার পর্যটকের সমাগম হতে পারে।
তিনি আরও গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারেন, সে জন্য টহল ও নজরদারি জোরদার থাকবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, পর্যটন, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সেবা নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি, থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে প্রশাসন। পাশাপাশি হয়রানি রোধেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাঠে থাকবে।
উন্নয়নের পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক আশ্বাস
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ অঞ্চলে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে যানজটসহ কিছু সমস্যার বিষয়ও পর্যটকরা তার নজরে এনেছেন।
তিনি আরও গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে চাতলাপুর পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু, রেললাইন উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ নিয়েও আলোচনা চলছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র পর্যটন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সৌন্দর্যের সঙ্গে চাই বাস্তব প্রস্তুতি
বিশ্লেষকদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে। তবে পরিকল্পিত অবকাঠামো, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পার্কিং, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সমন্বিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন।
অপরূপ প্রকৃতির টানে মানুষ বারবার ছুটে আসে শ্রীমঙ্গলে। কিন্তু সেই আকর্ষণকে দীর্ঘস্থায়ী ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে শুধু প্রচারণা নয়, বাস্তবভিত্তিক প্রস্তুতিরও প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
সব মিলিয়ে, ঈদে পর্যটকের পদচারণায় আবারও মুখরিত হতে যাচ্ছে চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল। এখন দেখার বিষয়—প্রকৃতির এই স্বর্গরাজ্য পর্যটকদের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক ও সুশৃঙ্খল অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে পারে।



















