সিলেটে পৌঁছে সড়কপথে মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশিত :
০৮:২৯, ১৭ জুন ২০২৬
একদিনের সফরে মৌলভীবাজারের পথে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বুধবার (১৭ জুন) সকাল সোয়া ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখান থেকে সড়কপথে মৌলভীবাজার যাত্রা করেছে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী; জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ; সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী; সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা, এম এ মালিক, এমরান আহমদ চৌধুরী; বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী; সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী; সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাহের শামীম; সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমসহ অন্যরা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌঁছে দুপুর ১টায় পৌঁছে ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ কর্মসূচির আওতায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫৫টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে।
এদিন দুপুর আড়াইটায় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন। সেখানে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। বিকেলে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে দুসাই রিসোর্টের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে তিনি সড়কপথে সিলেটে ফিরে রাত সাড়ে আটটায় বিমানযোগে ঢাকায় ফিরবেন।
স্থানীয় বিএনপির নেতারা জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২ মে প্রথমবার সিলেট সফর করেন তারেক রহমান। আজকের সফরটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দ্বিতীয় সিলেট সফর। এ উপলক্ষে সিলেট ও মৌলভীবাজারে দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।
ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গের জাতিগত বাঙালিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই যাদের সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর এমন পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অবস্থানের কারণে বহু পরিবার দুই দেশের সীমান্তের ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়েছে বলেও জানায় সংস্থাটি।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্যের বরাতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, গত ১ জুন থেকে বিএসএফের ২১টি ‘পুশ-ইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২০০ জনের বেশি মানুষকে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
মার্চ মাসের নির্বাচনের জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ‘ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে’।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘মৌলিক মানবাধিকার উপেক্ষা করে ভারত সরকার নির্মমভাবে পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে।’
‘অবৈধভাবে মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়া সরকারকে বন্ধ করতে হবে, প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং মুসলমানদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বৈরিতা বন্ধ করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা রাতের বাংলাদেশের পুশইনের চেষ্টা করেছে— এমন ৯ প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরা প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর বিএসএফ শেষ পর্যন্ত সেসব মানুষদের ভারতে ফিরিয়ে নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে গত ৫ জুন বিএসএফ ১০ জনকে, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল, বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে ৭৫ ঘণ্টাব্যাপী এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পঞ্চগড়ের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী রুবেল হোসেন বলেন, ‘১০ জনের দলটি বাংলাদেশের প্রায় ৫০ ফুট ভেতরে চলে এসেছিল। স্থানীয়রা বিজিবিকে খবর দিলে তারা সেখানে আসে। এরপর তারা সরে গিয়ে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ একটি বাঁধের ওপর অবস্থান নেয়।’
তিনি বলেন, ‘প্রথম রাতে তারা বজ্রপাত ও প্রবল বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিল। দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ তাদের কিছু শুকনো খাবার দেয়। পুরো পরিস্থিতি আমার কাছে যুদ্ধকালীন অচলাবস্থার মতো মনে হয়েছে। দুই বাহিনীর মধ্যে একাধিক পতাকা বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিএসএফ দলটিকে ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’
গত ৬ জুন ভোরে বিএসএফ দুই বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে বাংলাদেশের তেতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, দুইজন নারী ও একটি শিশু ছিল। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়, অন্যদিকে বিএসএফও তাদের ভারতে ফিরতে দেয়নি। ফলে পরিবারগুলো সীমান্তে আটকা পড়ে। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর পর তাদের ভারতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়।
৮ জুন বিজিবি জানায়, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ঠাকুরগাঁও জেলার জিরো লাইনে আটকে থাকার পর বিএসএফ ১১ জনকে, যাদের মধ্যে এক গর্ভবতী নারী ও তার সন্তানও ছিল, ফেরত নিয়ে যায়।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের নির্বাচন কমিশন দ্রুত ও বিতর্কিতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করে, যাতে ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়ে। এর ফলে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়। এর আগে ২০১৯ সালে আসামে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার বাংলাভাষী বাসিন্দাকে আটককেন্দ্রে রাখা হয়। অনেককে বেআইনিভাবেও বহিষ্কার করা হয়।
আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সীমান্তের কাছে সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে যাই এবং একেবারে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই। এখন আসামে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে অনেক অবৈধ বাংলাদেশি নিজেরাই ফিরে যেতে শুরু করেছে।’
বাংলাদেশের পঞ্চগড় সদর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাসিবুর ইসলাম বলেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরিবারটির সদস্যদের ভারতের আধার কার্ড ছিল। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে এবং পরে সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দেয়। এরপর তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘পরিবারটির সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এ বছর তাদের কারও নাম ভোটার তালিকায় ছিল না। সীমান্তে তিন দিন আটকে থাকার পর তাদের ভারতে ফিরতে দেওয়া হয়।’
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে এবং তারা চাইলে দেশে ফেরার জন্য সহায়তা দেওয়া হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা গ্রহণযোগ্য নয়। সাক্ষাৎকারদাতাদের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কাগজপত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটক রাখা হয়েছে। তাদের অধিকাংশ মুসলিম হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছে। এক ভারতীয় মানবাধিকারকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৪০০ মানুষ আটক রয়েছেন। অনেককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর আটক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার বলেছে, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া কাউকে তারা গ্রহণ করবে না। নাগরিকত্ব যাচাই ও নির্ধারিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যেকোনো প্রত্যাবর্তন হতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি এবং সব ধরনের বর্ণবৈষম্য বিলোপসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের আওতায় ভারতের দায়িত্ব হলো সবার অধিকার রক্ষা করা এবং বর্ণ, বংশ, জাতীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত না করা।
সংস্থাটি বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। খাবার, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা ছাড়া মানুষকে সীমান্তে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, বহিষ্কারের মুখোমুখি যেকোনো ব্যক্তির জন্য অভিযোগের ভিত্তি জানার অধিকার, আইনজীবীর সহায়তা এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত। শিশুদের বহিষ্কার বা সীমান্তে আটকে রাখা শিশু অধিকার সনদের পরিপন্থী, যেখানে শিশুদের নাগরিকত্ব রক্ষার অধিকার এবং তাদের স্বাধীনতা থেকে স্বেচ্ছাচারীভাবে বঞ্চিত না করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই ও নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের সুশৃঙ্খল হস্তান্তরের জন্য দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার ফলে বহু মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে আটকা পড়ছে এবং তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘কোনো মানুষ—তার জাতীয়তা যাই হোক না কেন—দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটানোর মতো পরিস্থিতিতে ফেলে রাখা উচিত নয়। ভারতকে এই অমানবিক তাড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং উভয় সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সীমান্তে মানুষের মৌলিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়।’