লন্ডনে মাহফুজ আনাম জবাব দিলেন না, কিন্তু বিএনপি কী আদৌ রক্ষা পাবে?
মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, সাংবাদিক
মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, লন্ডন ৭ জুলাই ২০২৬: বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক মাহফুজ আনাম প্রতি বছর জুন মাসটাতে কিছু সময় কাটিয়ে যান যুক্তরাজ্যে। এদেশে তাঁর মেয়ে থাকেন। নানা মাহফুজ আনাম নাতি-নাতনীদের সাথে কিছু সময় কাটাতে চলে আসেন এখানে। এবারের জুনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
এই অবকাশের সুযোগে ডেইলি স্টারের ইউকে করেসপন্ডেন্ট-এট-লার্জ, বিশিষ্ট সাংবাদিক বুলবুল হাসান লন্ডনে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সাথে মাহফুজ আনামের একটি মত বিনিময় সভার আয়োজন করেছিলেন ২১শে জুন রোববার বিকেলে লন্ডনের বিখ্যাত কুইন মেরী ইউনিভারসিটিতে।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, মূলধারার ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি, আইনজীবি, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও ছাত্রসহ কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের বিপুল সমাগম হয়েছিলো।
দু‘ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে অব্যাহত এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে অনেকে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। অনেকেই মাহফুজ আনামের কাছে জানতে চান নানা প্রসঙ্গে তাঁর নিজের অভিমত।
আমার সুযোগ হয়েছিলো মাহফুজ আনামের কাছে একটি প্রশ্ন করার। প্রশ্নটির মূল বিষয় ছিলো এ রকম: ২০২৪ সালে ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের মূল শ্লোগান ছিলো ‘সংস্কার‘। এর ১৭ বছর আগে ২০০৭ সালে আর্মির উদ্যোগে গঠিত ড. ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও মূল শ্লোগান ছিলো ‘সংস্কার‘। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কার করার চেষ্টা হয়েছিলো তখন। ওই উদ্যোগটির নামকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো ‘মাইনাস টু ফর্মুলা‘। চেষ্টাটি তখন সফল হয়নি। কিন্তু ১৭ বছর পর আমরা দেখতে পেলাম ফর্মুলার প্রথম অংশ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছেন আর তাঁর দল আওয়ামী লীগ
পরিণত হয়েছে কার্ক্রম নিষিদ্ধ একটি দলে। ২০০৭ সালে মাইনাস টু ফর্মুলার আরেকটি টার্গেট ছিলো বিএনপি, যারা এখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে। বেগম জিয়া এখন বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁরই ছেলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন। মাইনাস টু ফর্মুলার মূল লক্ষ্য ছিলো, বাংলাদেশ থেকে রাজতন্ত্রের আদলে বংশানুক্রমিক দলতন্ত্র তথা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রচলন উচ্ছেদ করা। এখন কী ধরে নেয়া যায় যে, ওই ফর্মুলার আওতায় বিএনপিকে মাইনাস করার কাজ এখন চলমান রয়েছে? ১৭ বছরের চেষ্টায় আওয়ামী লীগকে মাইনাস করা সম্ভব হয়েছে, মাইনাস টু ফর্মুলার উদ্গাতাদের কাছে ফর্মুলার অবশিষ্ট অংশ বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি-ই এখন ইমেডিয়েট টার্গেট, এমন ধারণা কী অমূলক হবে?
জবাবে মাহফুজ আনাম হেসে উঠলেন, বললেন, কঠিন প্রশ্ন। এর পর তিনি বলতে শুরু করলেন, বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে তাঁদের দেশটাকে দেখতে চান, কিভাবে দেশের উন্নতি হোক-তাঁরা চান, দেশ নিয়ে সবার কী স্বপ্ন -এসব নিয়ে কিছুক্ষণ তিনি বিভিন্ন কথা তুলে ধরলেন। কিন্তু মাইনাস টু ফর্মুলার যূপকাষ্ঠে এবার বিএনপির বলি হবার পালা কিনা, সে প্রসঙ্গে কিছুই বললেন না। মাইনাস টু-এর বিষয়টি নিয়েও কিছু বললেন না তিনি।
অনুষ্ঠানের ফরম্যাট অনুযায়ি সম্পূরক প্রশ্ন করার কোন সুযোগ ছিলো না বলে এ নিয়ে তাঁর আসল মনোভাব জানা সম্ভব হলো না।
কিন্তু তাই বলে মাহফুজ আনাম কেন এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর কোন মতামতই তুলে ধরলেন না-এ প্রশ্নটি বাতাসে মিলিয়ে যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘পরিশুদ্ধ‘ করার মন-মানসিকতা ও চেষ্টা তাঁর ছিলো এবং রয়েছে, তাঁর সাংবাদিকতার সুবাদে আমরা এ সম্পর্কে জানি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওলট-পালট ঘটানোর মতো একটি বিষয়ে মাহফুজ আনামের মতো বিপুল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ সম্পাদকের নিজের কোন মতামত নেই, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিপুল নেতা-কর্মীকে দেশছাড়া করা এবং রাজনীতিতে তাঁদের ফিরে আসার সকল পথ এ পর্যন্ত সাফল্যের সাথে রুদ্ধ করে রাখার পর মাইনাস টু ফর্মুলার উদ্গাতারা বিএনপিকে ছেড়ে দেবেন-এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না।
আওয়ামী লীগ রাজত্ব হারিয়েছে, কিন্তু তারেক রহমান তো একই ধারাতেই, রাজপুত্র হিসেবেই, সিংহাসনে বসেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজতন্ত্রের এই অবশিষ্ট অংশ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় মাইনাস টু ফর্মুলার মূল হোতারা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন, কোন যুক্তিতেই তা হয় না। আওয়ামী লীগকে ফেলে দেবার সাফল্যকে তারা এভাবে হারিয়ে যেতে দিতে পারেন না।
আমার তো মনে হয়, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জিতবে, সেটা মাইনাস টু ফর্মুলার মূল হোতারা নির্বাচনের আগে থেকেই ধারণা করে নিয়েছিলেন। তাই সময় মতো বিএনপিকেও ফেলে দেয়ার কাজ তখন থেকেই শুরু হয়েছে বলে আমার মনে হয়। কিভাবে তা হবে, সেটা এখন আন্দাজ করা যাবে না, যেমন দেশের মানুষ তো বটেই, খোদ শেখ হাসিনা ও তাঁর দলও ক্ষমতাচ্যুতির দিন কয়েক আগে পর্যন্তও আন্দাজ করতে পারেননি যে, তাঁদের দিন ফুরিয়ে এসেছে।
বিএনপি এসব বিষয়ে যে সতর্ক নয়, সেটা বলা ঠিক হবে না। তারা অবশ্যই সতর্ক। কিন্তু ‘মেটিকুলাস ডিজাইন‘ এবং ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক‘ সম্পর্কে আগাম বুঝতে পারা বিশাল কঠিন ব্যাপার। বিএনপি সেই কঠিন কাজটা কী করতে সক্ষম হবে?



















