জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষমতা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত শিক্ষাগত সনদের ভিত্তিতে স্থানীয় পর্যায়েই বয়স সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করা যাবে। এতে এনআইডির তথ্য সংশোধন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ হবে বলে আশা করছে কমিশন।
গত ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের ১২তম সভা শেষে এ তথ্য জানান ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি জানান, এনআইডি-সংক্রান্ত সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও নাগরিকবান্ধব করতে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ভোটার এলাকা পরিবর্তন (মাইগ্রেশন) পুরোপুরি অনলাইনে করার প্রস্তাব রয়েছে। এ সেবা নিতে নির্ধারিত ফি দিতে হবে, যা নতুন বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সিনিয়র সচিব বলেন, আইন অনুযায়ী প্রতি ১৫ বছর পর এনআইডি নবায়নের বিধান রয়েছে। এ জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদনকারীকে পারিবারিক তথ্য (ফ্যামিলি ট্রি) জমা দিতে হবে, যাতে তথ্য যাচাই আরও সহজ হয়। এনআইডি নবায়নের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফি রাখা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এনআইডির জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন কেন্দ্রীয়ভাবে নিষ্পত্তি করা হলেও নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি বা সমমানের পাবলিক পরীক্ষার সনদে উল্লেখিত জন্মতারিখের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাই এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারবেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়াও আরও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদের বায়োমেট্রিক তথ্য সরাসরি অনলাইনে আপলোড করা হবে। তদন্তে তথ্য সঠিক পাওয়া গেলে কেন্দ্র থেকেই অনুমোদন দেওয়া হবে। এতে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার একটি ধাপ কমে যাবে এবং সেবা গ্রহণ আরও দ্রুত হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রণীত এ আইনের খসড়ায় গুমের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধান এ আইনে যুক্ত করা হয়েছে।
এই আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এ গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
এ আইন গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।
আইনটিতে গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র কর্তৃক ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া, এ আইনে গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ প্রদান, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ আইনে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্নকরণ এবং সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে।
বৈঠকে আইন ও বিচার বিভাগের প্রস্তাবিত দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, ১৮৮২-এর দাতা কর্তৃক জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান-সংক্রান্ত বিধান সংযোজনের লক্ষ্যে ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ শীর্ষক খসড়া আইন প্রণয়নপূর্বক মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যমান আইনে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকায় পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি কর্তৃক সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করেও নিজ জীবদ্দশায় তা ভোগ-ব্যবহারের আইনি নিশ্চয়তা অর্জন সম্ভব হচ্ছিল না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে বিষয়টিকে সুনির্দিষ্ট রূপ ও আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
এছাড়াও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬ বাতিলের প্রস্তাবটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকার নিরাপদ, কার্যকর, মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ জনগণের জন্য নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের কারণ হলো, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের পূর্বে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ গ্রহণের বিধান রয়েছে, যা প্রতিপালন করা হয়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ঔষধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ ব্যতীত প্রণীত হওয়ায় এর বৈধতা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন।
ইতোমধ্যে গত ২৯ জুন ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছে। এই পরিষদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে।
২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল হলেও, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদকরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ওষুধের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে যেন জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না হয় এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।