জগন্নাথপুরে শ্রীরামসী গ্রামে একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করার অভিযোগ
প্রকাশিত :
১৫:৪২, ০১ জুলাই ২০২৪ সর্বশেষ আপডেট: ১৬:২৫, ০১ জুলাই ২০২৪
জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামসী গ্রামে একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আজ রবিবার শ্রীরামসী গ্রামের মৃত রমিজ আলীর ছেলে আনার মিয়া বাদী হয়ে শ্রীরামসী গ্রামের মৃত আরশ আলীর ছেলে সায়েক মিয়া ও চমক আলীর ছেলে মাহবুব হোসেন সহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে এ অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগে আনার মিয়া উল্লেখ করেন, আমি ১৯৭৩ সন হতে ইসমাইল আলী ও আফতাব আলী কয়েস লন্ডনীর বাড়িতে বসবাস করিয়া তাহাদের বাড়ী ঘর জায়গা জমি দেখাশুনা সহ রক্ষনাবেক্ষন করিয়া আসিতেছি। আমিসহ আমার পরিবারের লোকজন ইসমাইল আলী ও আফতাব আলী কয়েস দ্বয়ের বাড়িতে থাকিয়া তাহাদের বাড়ী ঘর দেখাশুনা করার কারণে বিবাদীগণ আমাদের উপর ক্ষিপ্ত থাকে এবং আমাদের ক্ষতি সাধনের অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকিয়া সুযেগের সন্ধানে রয়েছে।
গত মে মাসে বিবাদীগণ আমাকে সহ আমার পরিবারের লোকজনদের এলাকা ছাড়া করার জন্য হুমকি প্রদর্শন করে। বিবাদীগণ এলাকায় বৈঠক করিয়া আমাদেরকে সমাজচ্যুত করিয়া রাখে। তিনি আরো উল্লেখ করেন আমরা এলাকা ছাড়িয়া না গেলে তাহারা ইসমাইল আলী ও আফতাব আলী গংদেরকেও সমাজচ্যুত করিবে বলিয়া হুমকি প্রদর্শন করে। বিবাদীগন প্রায় সময় আমাকেসহ আমার পরিবারের সদস্যদের রাস্তা ঘাটে দেখলে গালমন্দসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
আমাদেরকে রাস্তাঘাটে, দোকানে, বাজারে, মসজিদে এবং স্কুলে যাওয়া আসাতে আমাদেরকে বাধা নিষেধ করিয়া আসিতেছে। গত ১৬ জুন বিকেল সাড়ে ৪ টায় শ্রীরামসী সাকিনস্থ শামসুননেছা মার্কেটের সামনে বিবাদীগণ আমাকে দেখিয়া অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করিতে থাকে। বিবাদীদেরকে বাধা নিষেধ করিলে বিবাদীগণ আমার উপর উত্তেজিত হয়ে আমার সাথে মারমুখী আচরণ করে। শোর- চিৎকারে আশপাশের লোকজন আগাইয়া আসিয়া আমাকে বিবাদীদের কবল হইতে উদ্ধার করেন। বিবাদীদের ভয়ে আমি সহ আমার পরিবারের লোকজন চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভূগছি।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল- বশিরুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পেয়েছি। আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অভিযোগটি থানায় প্রেরণ করা হয়েছে
দখল, বৃক্ষ নিধন, রিসোর্ট আর প্রভাবের বলয়ে সংকুচিত হচ্ছে দেশের অন্যতম সংরক্ষিত বনাঞ্চল
সংগ্রাম দত্ত: ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ছড়ার পাশে দাঁড়ালে দূর থেকে ভেসে আসে পাখির ডাক। শতবর্ষী গাছের ছায়া, টিলার পর টিলা আর চিরসবুজ অরণ্যের বিস্তার দেখে মনে হতে পারে, প্রকৃতি এখনো তার সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেছে। কিন্তু এই নৈসর্গিক দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের এক সংকটের গল্প—বনভূমি দখল, অবৈধ বৃক্ষ নিধন, বনজ সম্পদ পাচার, বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ এবং ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলো বলছে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল বহু বছর ধরেই বহুমাত্রিক চাপের মুখে রয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। একসময় ভানুগাছের পাহাড়ি বনাঞ্চলের অংশ হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চল ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এখানে রয়েছে বিপন্ন উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বনবিড়াল, অজগর, নানা প্রজাতির সরীসৃপ এবং শতাধিক প্রজাতির পাখি। প্রতিবছর দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক এই বন দেখতে আসেন।
কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, যে বন একসময় ঘন সবুজে আচ্ছাদিত ছিল, তার অনেক অংশ এখন আর আগের মতো নেই।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, স্বাধীনতার পর গত প্রায় পাঁচ দশকে লাউয়াছড়া ও এর আশপাশের বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধভাবে বনজ সম্পদ লুটপাট ও ভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।
তাঁদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বন বিভাগের একশ্রেণীর দুর্নীতি পরায়ণ কর্মকর্তা কর্মচারীদের পরস্পর যোগসাজশে সেগুন, মেহগনি, গর্জনসহ বিভিন্ন মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করেছে। বনভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বাগান, বসতি, রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনজ সম্পদ লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে অভিযুক্তদের কেউ কেউ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে দেশে-বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তুলেছেন বলেও এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
এমন অভিযোগও রয়েছে যে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পরে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ লুটপাটের অভিযোগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এসেছে।
তাঁদের ভাষ্য, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও বনসম্পদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল।
বিগত কয়েক দশকে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম লাউয়াছড়ার বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা, গাছ পাচার এবং বন উজাড় নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
যমুনা টেলিভিশনসহ বিভিন্ন জাতীয় ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিবেদনে বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশে দখল, স্থাপনা নির্মাণ এবং সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের কয়েকটিতে দখল নিয়ে আলোচিত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এসব ঘটনা এলাকায় বহুদিন ধরেই পরিচিত বাস্তবতা হলেও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে আসে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অন্তর্গত কালাছড়া বন বিটকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি গাছ পাচারের সময় একটি গাড়িভর্তি কাঠ স্থানীয় জনতার হাতে আটক হওয়ার ঘটনা আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে, কখনো দিনের আলোতেও মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে। যার ফলে বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীন এই কালাছড়া বনবিটের দুর্গম এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে একটি সক্রিয় চক্র আকাশমণি, সেগুন, আগর ও গর্জনের মতো মূল্যবান গাছ কেটে খণ্ড খণ্ড করে পিকআপ, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানে করে পাচার করছে।
সোমবার (১ জুন) ভোরে আকাশমণি গাছ পাচারের সময় স্থানীয়রা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও গাছ আটক করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, প্রায়ই রাতের বেলায় বনের ভেতর গাছ কাটার শব্দ শোনা যায় বলে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব খবর এসেছে । কখনো কখনো গাছবোঝাই যানবাহন বের হতেও দেখা যায়। বাধা দিতে গেলে তারা হুমকির মুখে পড়েন বলেও অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কালাছড়া বনবিট কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম নাঈম। তিনি বলেন, “গাছ পাচারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং আমি যোগদানের পর গাছ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা করেছি। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, আটককৃত গাছ ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
দৈনিক কালের কণ্ঠ–এর কমলগঞ্জ প্রতিনিধি মো. মোস্তাফিজুর রহমান তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের কালাছড়া বিটে রাতে চলে বৃক্ষ নিধনের মহোৎসব।”
অন্যদিকে দৈনিক ইত্তেফাক–এর কমলগঞ্জ প্রতিনিধি মোহাম্মদ নুরুল মুত্তাকিন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে উল্লেখ করেছেন, “লাউয়াছড়া ও কালাছড়া বনের গাছ চুরি এবং পার্শ্ববর্তী পাহাড়-টিলায় রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের কারণে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি বন বিভাগের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে প্রভাবশালী দখলদার ও বনজ সম্পদ পাচারকারী চক্রের যোগসাজশের কারণে বন উজাড়, অবৈধ গাছ কাটা, বনভূমিতে বসতি স্থাপন এবং অন্যান্য অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
তাঁদের দাবি, বনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে বা গোপনে বনজ সম্পদ পাচারের ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর ও আশপাশে বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে বনভূমি ব্যবহার করা হয়েছে।
কোথাও গড়ে উঠেছে রিসোর্ট, কোথাও বসতি, কোথাও আবার বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক বাগান। ফলে বনভূমির স্বাভাবিক চরিত্র পরিবর্তিত হয়েছে।
পরিবেশকর্মীদের মতে, সংরক্ষিত বন যদি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তাহলে বন সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বনভূমি দখলের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে বন বিভাগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় কিছু দখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে অভিযান চালায়। সংবাদ প্রতিবেদনে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুস শহীদের দখলে ছিল বলে অভিযোগ থাকা কিছু ভূমি উদ্ধারের বিষয়ও উঠে আসে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বনাঞ্চলের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁদের মতে, পূর্ণাঙ্গ জরিপ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া দখলের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে না।
স্থানীয় সূত্র ও সংসদের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী সংসদে বক্তব্য দিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও এর আশপাশের বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল, বসতি স্থাপন, রিসোর্ট নির্মাণ, বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলা এবং বন উজাড়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বনভূমি উদ্ধার, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জাতীয় বনসম্পদ, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
পরিবেশবিদদের মতে, বনভূমি উজাড়ের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জীববৈচিত্র্যের ওপর।
বড় ও পুরোনো গাছ কমে গেলে পাখির বাসা, প্রাণীর আশ্রয় এবং খাদ্যচক্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে বিগত পাঁচ দশকে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় ২০০০-এর বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকটি বিশালাকৃতির অজগর সাপ উদ্ধারের ঘটনাও বনভূমির ওপর বাড়তে থাকা চাপের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশবিদদের মতে, লাউয়াছড়া রক্ষায় শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ।
তাঁদের সুপারিশ—বনভূমির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ,
দখলকৃত ভূমি দ্রুত উদ্ধার,
অবৈধ গাছ কাটা ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা,
বন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা,
বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জন্য করিডোর ও আন্ডারপাস নির্মাণ,
অনিয়ন্ত্রিত রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ,
স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা।
লাউয়াছড়া শুধু একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বনভূমি দখল, বৃক্ষ নিধন, বনজ সম্পদ পাচার এবং অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কারণে এই অরণ্য ক্রমেই চাপে পড়ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, লাউয়াছড়ার সংকট আজ শুধু গাছ হারানোর গল্প নয়; এটি একটি বন, একটি বাস্তুতন্ত্র এবং একটি জাতীয় সম্পদ রক্ষার সংগ্রাম।
কালাছড়ার নীরব অরণ্য যেন এখনো প্রশ্ন করে—সংরক্ষিত বন কি সত্যিই সংরক্ষিত থাকবে, নাকি প্রভাব, দখল আর লোভের চাপে একদিন হারিয়ে যাবে তার নিজস্ব পরিচয়?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ লাউয়াছড়া বাঁচলে শুধু একটি বন নয়, বাঁচবে প্রকৃতি, বাঁচবে জীববৈচিত্র্য, বাঁচবে ভবিষ্যৎ।
বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে মূল্যবান গাছগুলো কেটে এনে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া কালে আটককৃত গাছগুলো।