img

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাজনগরের জলের গ্রাম অন্তেহরী

প্রকাশিত :  ১৮:১৫, ০১ জানুয়ারী ২০২৫

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাজনগরের জলের গ্রাম অন্তেহরী
সংগ্রাম দত্ত: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাজনগরের  জলের গ্রাম অন্তেহরী। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে কাওয়াদীঘি হাওরের পাশেই অবস্থিত অন্তেহরী গ্রামটি। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এ অন্তেহরী গ্রামকে পর্যটন এলাকা ঘোষণা করে নামকরণ করা হয় ‘জলের গ্রাম অন্তেহরী’। প্রকৃতির অপরূপ রূপে সাজানো এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ি দেখে মনে হবে জলে ভাসছে বাড়িগুলো।

হাওরের টলটলে স্বচ্ছ জল আর সবুজ অরণ্যের মাঝে দাঁড়ানো এই গ্রামটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। ভ্রমণপিপাসুরা এই স্থানে প্রতিদিন ভিড় করেন। বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই জল থাকে বলে এই গ্রাম পরিচিতি পেয়েছে ‘জলের গ্রাম নামে’। নির্মল প্রকৃতির কারণে গ্রামটি বক-পানকৌড়ি ও দেশি পাখির কলকাকলিতে মুখর। এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের স্বাদ আস্বাদন করতে আসেন ভ্রমণ পিপাসুরা।

কাউয়াদিঘি হাওরকে কেন্দ্র করে অন্তেহরী গ্রামে লোকবসতি গড়ে উঠে প্রায় শতবছর পূর্বে। জেলার রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে সবচেয়ে বড় এই জলাভূমির অবস্থান। হাওরপাড়ের এ গ্রামে বসবাস করেন প্রায় ছয় হাজার মানুষ। গ্রামটি বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ ধারণ করে, যখন হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। গ্রামটির বৈশিষ্ট্য বছরের প্রায় অর্ধেকটা সময় পানির ওপর ভেসে থাকে। এরই মধ্যে এই গ্রামটি ‘সোয়াম ভিলেজ অন্তেহরী’ নামে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।

কাউয়াদিঘি হাওরকে কেন্দ্র করে অন্তেহরী গ্রামে লোকবসতি গড়ে উঠে প্রায় শতবছর পূর্বে। জেলার রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে সবচেয়ে বড় এই জলাভূমির অবস্থান। হাওরপাড়ের এ গ্রামে বসবাস করেন প্রায় ছয় হাজার মানুষ। গ্রামটি বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ ধারণ করে, যখন হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। গ্রামটির বৈশিষ্ট্য বছরের প্রায় অর্ধেকটা সময় পানির ওপর ভেসে থাকে। এরই মধ্যে এই গ্রামটি ‘সোয়াম ভিলেজ অন্তেহরী’ নামে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।

হাওরপাড়ের নৈসর্গিক গ্রাম অন্তেহরীতে জল আর অরণ্যের মাঝে দাঁড়ানো এই জলারবনে শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে হেঁটে আর বর্ষার সময়ে নৌকা করে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়ানো যায়। 

বর্ষাকালে পুরো গ্রামই পানির ওপর ভাসমান থাকে। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির যাতায়াতের মাধ্যম শুধুই নৌকা। যেনো একেকটি বাড়ি একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। সবুজ হিজল-করচ-তমাল বনের ছায়া সুশীতল পরশ। হালকা বাতাসে ঢেউ আছড়ে পরে বিভিন্ন গাছের উপর আর বাড়ির সীমানায়। পুরো গ্রামের সুনশান নীরবতা ভেঙে পাখিদের কলতান সত্যিই মনোমুগ্ধকর।

 এই গ্রামের নাম অনেকে হয়তো শুনেছেন আবার অনেকের কাছে এখনো অজানা। চারিদিকে পানি, সবুজ গাছগাছালি, পাখিদের ডাক, নির্মল বাতাস। প্রকৃতির এতো বৈচিত্র্য রুপ এক সঙ্গে দেখে আনন্দ পেয়েছি। এখানে না আসলে কেহ  বুঝবে না প্রকৃতির কি অপরুপ মহিমা এখানে লুকিয়ে আছে।’

পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে আরও সুন্দর করে রাখলে অনেক বেশি পর্যটক আকৃষ্ট হবে।এই স্থানের প্রতি এক ধরনের অবহেলাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রায় চার বছর আগে এখানে প্রচুর শাপলা-শালুক দেখা যেতো, কচুরিপানার স্তূপের কারণে এখন এগুলো নেই।’

জেলা প্রশাসন থেকে এরই মধ্যে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা দিয়ে চারটি আকর্ষণীয় নৌকা এবং একটি ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে।

বস্তুত কাউয়াদিঘি হাওরকে কেন্দ্র করে এই গ্রামে লোকবসতী গড়ে উঠে। গ্রামটি বৈচিত্রপূর্ণ রূপ ধারণ করে যখন হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। আর তখনই অন্তেহরী ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ালে এই জলের গ্রামের বিচিত্র রূপ চোখে ধরা পড়ে। 

উল্লেখ্য, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন থেকে ২০১৮ সালে অন্তেহরী গ্রামকে পর্যটন এলাকা ঘোষণা করে নামকরণ করা হয় ‘জলের গ্রাম অন্তেহরী’।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের প্রাণরেখা গোপলা নদী, ভরাট আর অবহেলায় মৃতপ্রায় এক ঐতিহাসিক জলপথ

প্রকাশিত :  ১০:২৫, ০৯ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: এক সময় যেখানে স্টিমার-জাহাজ চলত, আজ সেখানে জন্মেছে ধানক্ষেত। কোথাও কচুরিপানার স্তূপ, কোথাও শুকনো মাটি। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার একমাত্র নদী গোপলা এখন যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ লড়াই করছে।

চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন, ভূনবীর, মির্জাপুর ও সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গোপলা নদী একসময় ছিল খরস্রোতা ও প্রাণচঞ্চল। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পানি এই নদী দিয়েই প্রবাহিত হয়ে হাইল হাওড়ে গিয়ে মিলত। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে আজ সেই নদী প্রায় মৃত।

ইতিহাস বলছে, বিলাশছড়া ও উদনাছড়া মতিগঞ্জ এলাকায় এসে মিলিত হওয়ার পর নদীটি ‘গোপলা’ নাম ধারণ করে। একসময় এ নদীপথে স্টিমার ও জাহাজ চলাচল করত। চা বাগানের মালামাল এবং ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন হতো এই নদীপথে। নদীর তীরে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য নির্মিত জেটির স্মৃতি এখনও বহন করছে সদর ইউনিয়নের ‘জেটি রোড’ নামের এলাকা।

কিন্তু সেই নদীর আজ করুণ দশা। সরেজমিনে জিলাদপুর ও উত্তর উত্তরসুর এলাকায় দেখা গেছে, রাবারড্যামের পর থেকে গোপলা নদী তার পুরোনো গতিপথ হারিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গরুরদ্বারা হয়ে সেই পানি হাইল হাওড়ে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নদীর মূল অংশ প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

কোথাও নদীর বুক শুকিয়ে ফেটে গেছে, কোথাও কচুরিপানায় ঢেকে আছে জলপথ। আবার কোথাও নদীর জমি দখল করে তৈরি হয়েছে মাছের খামার, বসতবাড়ি কিংবা ধানক্ষেত। এমনকি কোনো কোনো স্থানে নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল ও ভরাট চললেও তা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একইভাবে নদী খনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনতেও নেওয়া হয়নি কোনো বড় প্রকল্প।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মানিক সরকার বলেন,

“প্রায় ত্রিশ বছর আগে নদীর গতিপথ বদলে যায়। এরপর থেকেই অনেক মানুষ জমি হারিয়েছেন। নদীর দুই পাশের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমি এখন অনাবাদি পড়ে থাকে।”

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কবির মিয়া জানান,

“রাবারড্যাম থেকে কালেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদী এখন মৃত। এর প্রভাব পড়েছে হাওড়ের বিলগুলোতে। দিঘালীয়াবিল, রাতারবিল, কুঞ্জবেরী, ঘোড়ামারা, আগুড়া, কুচবিল, চণ্ডীবিল, ছড়াডুবা, ধইলডুবাবিল, পাত্রবেরী ও নাইফতাডুবাবিল ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে ডুমরবিল ও বাধাইবিল।”

তার মতে, নদীটি পুনঃখনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনা গেলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরতে পারে হাওড়াঞ্চলে।

মতিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বলাল আহম্মেদ বলেন,

“নদীর নতুন গতিপথের কারণে আমার প্রায় বারো বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে নদীটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এর প্রশস্ততাও কমে গেছে। পুরোনো গতিপথ খনন করা গেলে নদী আবার নাব্য ফিরে পাবে।”

গোপলা নদী রক্ষার দাবি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সেই সভায় শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী গোপলা নদী পুনঃখননের জোর দাবি তোলেন।

তিনি রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেছিলেন নদীটির গুরুত্ব, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে এর সম্ভাবনার কথা। একইসঙ্গে তিনি বালিশিরা পাহাড়কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার দাবিও জানান। জানা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনেন এবং বলেন, “নোট করে রাখা হলো।”

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর সেই বক্তব্য তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ, সিলেট কেন্দ্র থেকেও একাধিকবার প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও গোপলা নদী পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, “গোপলা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কাজ করব।”

প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা গোপলা নদী এখন শুধুই এক মৃতপ্রায় জলধারা নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের পরিবেশগত সংকটেরও প্রতীক। দ্রুত পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ না নিলে একদিন হয়তো এই নদীর অস্তিত্ব থাকবে শুধু মানচিত্রে, স্মৃতিতে আর ইতিহাসের পাতায়।


সিলেটের খবর এর আরও খবর