শ্রীমঙ্গলে সাংবাদিক পরিচয়পত্র বিতর্ক: রাজনৈতিক সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তিকে কার্ড, প্রশাসনিক যাচাই নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক যাচাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের একাংশের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পত্রিকার বৈধতা, নিয়মিত প্রকাশনা ও আবেদনকারীদের প্রকৃত সাংবাদিকতা সম্পৃক্ততা যথাযথভাবে যাচাই না করেই পরিচয়পত্র ইস্যু করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে; জাতীয় দৈনিক \"খোলা কাগজ\" এর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মো. এহসানুল হক তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
কীভাবে ইস্যু হলো পরিচয়পত্র
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিচয়পত্রপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। সম্প্রতি তারা একটি স্থানীয় পত্রিকার পরিচয়পত্র ও লেটারহেড প্রদর্শনের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পর্যবেক্ষণধর্মী সাংবাদিক পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের কয়েকজন বলেন, সংশ্লিষ্ট পত্রিকার নিবন্ধন ও প্রকাশনা-সংক্রান্ত তথ্য, সম্পাদকীয় কাঠামো কিংবা আবেদনকারীদের মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মী হিসেবে কার্যক্রমের প্রমাণ যাচাইয়ের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সাংবাদিক পরিচয়পত্র ইস্যুর ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন—সংবাদপত্রের বৈধ ডিক্লারেশন ও নিবন্ধন, আবেদনকারীর নিয়মিত সাংবাদিকতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা, স্থানীয় প্রেসক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠনের মতামত এবং রাজনৈতিক পদে সক্রিয়তার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত মূল্যায়ন।
অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের ভাষ্য, এসব ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ না হলে পরিচয়পত্র ব্যবস্থার অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো কিংবা পেশাগত নৈতিকতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা
সাংবাদিকতা পেশা নিরপেক্ষতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও জনস্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একই ব্যক্তি সক্রিয় রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করলে তথ্য পরিবেশনে পক্ষপাত বা প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে—এমন মত দিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
জেলা প্রশাসনের অবস্থান
সমালোচকদের প্রশ্ন, শুধুমাত্র স্থানীয় কোনো পত্রিকার পরিচয়পত্র ও লেটারহেডের ভিত্তিতে যদি সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
অন্যদিকে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা সম্ভব বলেও তারা উল্লেখ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। শ্রীমঙ্গলের খোলা কাগজ–এর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মো. এহসান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি তুলে ধরে প্রশাসনিক যাচাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার ওই পোস্ট স্থানীয় সাংবাদিক মহলে আলোচনার সূত্রপাত করে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিতে করণীয়
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিক পরিচয়পত্র ইস্যুর জন্য সুস্পষ্ট ও একক নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাই এবং জেলা পর্যায়ে যৌথ যাচাই কমিটি গঠন করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হতে পারে। এতে সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
শেষ কথা
শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনা কেবল দুই ব্যক্তির সাংবাদিক পরিচয়পত্র পাওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রশাসনিক যাচাই ব্যবস্থা, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জনমনে সৃষ্ট সংশয় দূর করতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।



















