লন্ডনে বাংলাদেশি প্রবীণদের আবাসন বৈষম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা

img

হাউস অব লর্ডসে উন্মোচিত হলো ‘আমার বাড়ি, আমার জীবন’

প্রকাশিত :  ০৮:৪৭, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:২৯, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হাউস অব লর্ডসে উন্মোচিত হলো ‘আমার বাড়ি, আমার জীবন’

লন্ডন, ৫ ফেব্রুয়ারি: পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রবীণদের আবাসন বাস্তবতা নিয়ে পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদন “আমার বাড়ি, আমার জীবন” আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়েছে লন্ডনের হাউস অব লর্ডসের চোলমন্ডেলি রুমে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লর্ড বেস্ট, OBE, DL। তিনি গবেষণাটিকে “অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সুসংহত ও লক্ষ্যভিত্তিক” হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি এমন একটি কাজ যা সিভিল সার্ভেন্ট ও মন্ত্রীদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাঁর মতে, গবেষণাটি বাস্তব ও অর্থবহ পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

তিন বছরব্যাপী এই গবেষণাটি ভিভেনসা ফাউন্ডেশনের কমিশনে পরিচালিত হয় এবং এতে অংশীদার ছিল দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি, বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন এবং হাউজিং লার্নিং অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট নেটওয়ার্ক (Housing LIN)। গবেষণায় টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, হ্যাকনি ও রেডব্রিজে বসবাসরত ৫০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ৭৬ জন বাংলাদেশি নারী-পুরুষের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

গবেষণাটি দেখিয়েছে, আজীবন চলমান আবাসন বৈষম্য বার্ধক্যে এসে আরও ঘনীভূত হয় এবং তা প্রবীণদের স্বাস্থ্য, সামাজিক কেয়ার, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামগ্রিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অংশগ্রহণকারী অনেক প্রবীণ এমন ঘরে বসবাস করছেন, যা তাদের বয়সজনিত শারীরিক সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা কিংবা চলাফেরার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশেষ করে সোশ্যাল হাউজিং ও প্রাইভেট ভাড়া বাসায় বসবাসকারীদের মধ্যে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, বাতাস চলাচলের অভাব এবং হিটিং সমস্যার বিষয়টি ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে। এসব কারণে শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ‘কার্যকরী অতিরিক্ত ভিড়’ বা জনাকীর্ণ বসবাস। অধিকাংশ বাসস্থান একক পরিবারের ধারণায় নির্মিত হলেও বাস্তবে অনেক বাংলাদেশি পরিবার যৌথ বা মাল্টি-জেনারেশনাল কাঠামোয় বসবাস করে। এর ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা তৈরি হচ্ছে।

অনেক প্রবীণ অভিযোগ করেছেন, কাউন্সিল বা বাড়িওয়ালার কাছে সহায়তা চাইলে তারা ধীর বা অনুপযুক্ত সাড়া পান। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত আবেদন করা থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুপযুক্ত পরিবেশেই তাদের বসবাস অব্যাহত থাকে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের ওপর কেয়ারের চাপও বৃদ্ধি করে।

দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির বার্ধক্য বিষয়ক সিনিয়র লেকচারার এবং গবেষণার প্রধান গবেষক মানিক গোপীনাথ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক বাংলাদেশি মানুষরা বার্ধক্য ও আবাসন–সংক্রান্ত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে অদৃশ্য থেকেছেন। এই গবেষণা তাদের কণ্ঠকে কেন্দ্রে এনে দেখিয়েছে—বৈষম্য কেবল বিদ্যমান নয়, বরং তা প্রতিদিনের জীবনে কীভাবে অনুভূত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আজীবন বঞ্চনার পরিণতি হিসেবে কীভাবে প্রকাশ পায়।”

বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের সিইও বশির উদ্দিন বলেন, “গবেষণা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। এটি একটি স্পষ্ট ‘কল টু অ্যাকশন’। বিদ্যমান ঘরগুলোকে বসবাসযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজনীয় অভিযোজন নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন নির্মাণে বড় ও পরিবার–উপযোগী বাসস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।”

গবেষণাটি নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কয়েকটি সুস্পষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—জাতিগত ও বয়সভিত্তিক বিভাজিত আবাসন তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ, প্রবীণদের জন্য বাসায় বিশেষ সুবিধা সংযোজনের পথে বৈষম্যমূলক বাধা দূর করা, মাল্টি-জেনারেশনাল বসবাসকে বৈধ আবাসন পছন্দ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আবাসনকে স্বাস্থ্য ও সামাজিক কেয়ারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা।

গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের আবাসনের প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। ফলে বিদ্যমান বাসস্থানগুলোকে আরও নিরাপদ, প্রবেশগম্য ও বয়স-উপযোগী করে তোলা এখনই জরুরি। অন্যথায় আবাসন–সংক্রান্ত বৈষম্য ভবিষ্যতে জাতিগত, স্বাস্থ্য ও কেয়ার–সংক্রান্ত বৈষম্যকে আরও গভীর করবে।

সব মিলিয়ে,  ‘আমার বাড়ি, আমার জীবন’ শুধু একটি গবেষণা প্রতিবেদন নয়—এটি পূর্ব লন্ডনের প্রবীণ বাংলাদেশি কমিউনিটির জীবনসংগ্রামের এক মানবিক দলিল। গবেষণাটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: উপযুক্ত আবাসন ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ ও সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কমিউনিটি এর আরও খবর

img

বিশ্বজুড়ে শিশুদের জীবন রক্ষাকারী অস্ত্রোপচারের সুযোগ করে দিচ্ছে এডিনবার্গের দাতব্য সংস্থা: ফয়ছল চৌধুরী এমবিই

প্রকাশিত :  ০৬:৪৭, ১৫ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:৫৮, ১৫ মার্চ ২০২৬

স্কটিশ পার্লামেন্ট সদস্য ফয়ছল চৌধুরী এমবিই (MSP) স্কটিশ চ্যারিটি কিডস অপারেটিং রুম (KidsOR)-এর অগ্রণী কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সম্প্রতি তিনি সংস্থাটির এডিনবার্গের অফিস পরিদর্শন করেন এবং বিশ্বজুড়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ অস্ত্রোপচারের সুযোগ তৈরিতে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন।

পরিদর্শনকালে জনাব চৌধুরী প্রজেক্ট ম্যানেজার ক্রিস্টিনা এ. রাইকোভস্কা এবং কিডসওআর (KidsOR) টিমের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বিশ্বব্যাপী শিশুদের সার্জিক্যাল কেয়ারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্কটল্যান্ড যে ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কে আলোচনা করেন। বর্তমানে লক্ষ লক্ষ শিশু প্রয়োজনীয় সাধারণ অস্ত্রোপচারের সুযোগ পায় না, যার ফলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু বা আজীবন পঙ্গুত্বের শিকার হতে হচ্ছে।

২০১৮ সালে স্কটিশ সমাজসেবী গ্যারেথ এবং নিকোলা উড কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কিডসওআর (KidsOR) হলো বিশ্বের একমাত্র স্বাস্থ্যবিষয়ক দাতব্য সংস্থা যা একচেটিয়াভাবে শিশুদের অস্ত্রোপচারের জন্য কাজ করে। স্কটল্যান্ড ভিত্তিক এই সংস্থাটি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শিশু-বান্ধব অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করে, স্থানীয় সার্জিক্যাল টিমকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তা করে, যাতে শিশুরা তাদের বাড়ির কাছেই নিরাপদ ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা সেবা পেতে পারে।

এ পর্যন্ত কিডসওআর-এর কার্যক্রম ৩৮টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে ১২৫টি বিশেষায়িত শিশু অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করেছে তারা। এর মাধ্যমে ৭ লক্ষ ৮০ হাজারেরও বেশি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা না হলে এই শিশুদের জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হতো। স্বতন্ত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই দাতব্য সংস্থার কাজ ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ বছরের পঙ্গুত্ব রোধ করেছে এবং অংশীদার দেশগুলোর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে।

স্কটল্যান্ডে এডিনবার্গের অফিস এবং গ্লাসগো সদর দপ্তরের পাশাপাশি ডান্ডিতে কিডসওআর-এর একটি 'গ্লোবাল অপারেশন সেন্টার' রয়েছে। সেখানে বিশেষজ্ঞ দল বিদেশের হাসপাতালগুলোর জন্য অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম প্রস্তুত ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। এই নেপথ্য সুবিধাই নিশ্চিত করে যে, বিদেশে পাঠানো প্রতিটি অপারেটিং রুম ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে, যেখানে শিশুদের উপযোগী অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম থেকে শুরু করে ছোট রোগীদের ভয় কাটাতে রঙিন ও আশ্বস্ত করার মতো নকশাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

কিডসওআর-এর দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো শক্তিশালী ও স্বনির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে এক সময় বাহ্যিক সাহায্যের আর প্রয়োজন না পড়ে। তারা চায় প্রতিটি দেশের নিজস্ব অবকাঠামো এবং বিশেষজ্ঞ থাকুক যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের শিশুদের যত্ন নিতে পারে। স্বল্পমেয়াদী সফরের পরিবর্তে, এই সংস্থাটি স্থায়ী অপারেটিং রুম তৈরি এবং স্কলারশিপ ও বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় সার্জনদের দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়।

ফয়ছল চৌধুরী এমএসপি বলেন, "কিডস অপারেটিং রুম পরিদর্শন করা এবং বিশ্বজুড়ে এই স্কটিশ দাতব্য সংস্থার অবিশ্বাস্য প্রভাব স্বচক্ষে দেখাটা ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক। শুধুমাত্র কোথায় জন্ম নিয়েছে, সেই কারণে কোনো শিশুর জীবন রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার থেকে বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। তাদের কাজ প্রমাণ করে যে স্কটল্যান্ডের দক্ষতা এবং প্রতিশ্রুতি কীভাবে শিশুদের বেড়ে উঠতে, বিকশিত হতে এবং তাদের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে সাহায্য করছে।"


কমিউনিটি এর আরও খবর