স্বাধীনতা দিবসে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের ‘একাত্তরের গল্প’ শীর্ষক অনুষ্ঠান সম্পন্ন
লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের আয়োজনে বাংলাদেশের ৫৫তম মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ‘একাত্তরের গল্প’ শীর্ষক ব্যতিক্রমধর্মী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো স্মরণ করে এতে অংশ নেন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধারা, তৎকালীন সময়ে ভারতের শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্রিটিশ নার্স, মানবাধিকারকর্মী, ক্লাবের সদস্য শহীদ সন্তান এবং প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দ।
গত ৮ই এপ্রিল পূর্ব লন্ডনের মাইক্রো বিজনেস সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারি আকরামুল হুসাইনের পরিচালনায় শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ক্লাব সদস্য আবু মুসা হাসান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ক্লাব সদস্য মোজাম্মেল হোসেন কামাল, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্রিটিশ নার্স ভ্যাল হার্ডিং এবং শরণার্থী শিবিরে কাজ করা ক্লাব সদস্য ও অক্সফামের সাবেক কর্মকর্তা উদয় শঙ্কর দাশ।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান। আবু মুসা হাসান ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন। এই গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা ভারতের আসাম অঞ্চলের তেজপুর সামরিক ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন।
আবু মুসা হাসান ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুন্সীগঞ্জ এলাকায়। গ্রুপ লিডার ছিলেন ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান।
আবু মুসা হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ফাস্ট ইয়ারে অধ্যয়ণরত অবস্থায় ১৯ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল ছাত্র সংসদের এ জি এস নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের বিজয়ের চল্লিশ বছর উদযাপন উপলক্ষে, বাংলাদেশ ব্যাংক চল্লিশ টাকার স্মারক নোট এবং রুপার দশ টাকার কয়েন প্রকাশ করেছিল। সেই মুদ্রায় যে ছয় বীর মুক্তিযোদ্ধার ছবি আছে সেখানে আবু মুসা হাসানের ছবিও রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান বলেন, রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যের শিকার ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথান, ৬ দফা, ১১ দফা সকল আন্দোলন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের শোষনের বিরুদ্ধে।
আবু মুসা হাসান বলেন, একাত্তরের ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের সময়ে সেই জনসমুদ্রের মধ্যে আমিও ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্ৰাম’ শোনার পর মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেই। আমরা ডামি রাইফেল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে বিস্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করি এবং ঢাকা শহরে মিছিল সহকারে প্রদক্ষিণ করি। সেই মিছিল জনগণের মাঝে ব্যাপক সারা ফেলে।
আবু মুসা হাসান ২৫শে মার্চ কাল রাতের ভয়াভয়তা তুলে ধরে বলেন, ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী বাহিনী যেমন গণহত্যা চালিয়েছে, তেমনি জনগণ প্রতিহত করার চেষ্টাও করেছে। তিনি নিজেও সে কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন উল্লেখ করে বলেন, ২৫শে মার্চ শুধু কাল রাত নয়, তা প্রতিরোধেরও রাত।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান তার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া, ট্রেনি কেম্পের বর্ননা দেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে লাভ নেই, সত্য ইতিহাস মুছে ফেলা যায়না।
অপর বক্তা ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলায় নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি ২৪ বছর বয়সী ব্রিটিশ নার্স ভ্যাল হার্ডিং। তিনি বলেন, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, বিশেষ করে তারুণ্যে, তিনি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। ভারতে আশ্রয় নেওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সেবা দিতে তিনি ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সর্বোচ্চ দিয়ে তাঁদের সেবা করেছেন।
২০০৪ সালে তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ সফর করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তার পরম বন্ধু। বাংলার কৃষ্টি-সংস্কৃতি তাকে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে মানুষের সহজ-সরল ও লড়াকু মনোভাব ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হোসেন কামাল বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মাঠপর্যায়ের যুদ্ধের বাস্তব গল্প জানতে পারে, যা তাদের অনুপ্রাণিত করে।
বিবিসির সাবেক সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অক্সফামের প্রাক্তন কর্মকর্তা উদয় শঙ্কর দাশ বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষ দেশান্তরি হয়েছিলেন। স্বাধীনতার খবর শুনে ভারতে আশ্রিত মানুষরা ট্রাকে করে আনন্দ-উল্লাসে দেশে ফিরে আসেন। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রবাসীরা শরণার্থীদের জন্য কাপড় সংগ্রহ করেছিলেন এবং রয়েল মেইল তা বিনা খরচে ভারতে পাঠিয়েছিল।
প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন সিনিয়র সাংবাদিক মুসলেহ উদ্দিন, ক্লাবের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি চৌধুরী আব্দুল কাদির মুরাদ এবং সাংবাদিক আনোয়ারুল ইসলাম অভিসহ অনেকে।
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত পরিবারের সদস্যদের স্মৃতি তুলে ধরেন ক্লাব সদস্য ও শহীদ পরিবারের সন্তান মো. বাবুল হোসেন ও আকবর হোসেন। এছাড়া একাত্তরের দিনগুলো নিয়ে নিজের লেখা বই থেকে স্মৃতিচারণ করেন সিনিয়র সাংবাদিক রহমত আলী।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট আহাদ চৌধুরী বাবু, ট্রেজারার মো. আব্দুল হান্নান এবং এক্সিকিউটিভ মেম্বার সরওয়ার হোসেন ও এনাম চৌধুরী।
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে অতিথিদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেজারার এখলাছুর রহমান পাক্কু, অর্গানাইজিং ও ট্রেনিং সেক্রেটারি আলাউর রহমান শাহীন এবং মিডিয়া অ্যান্ড আইটি সেক্রেটারি ফয়সল মাহমুদ।
আলোচনা শেষে ইভেন্ট সেক্রেটারি রুপি আমীনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন উর্মি মাজহার, নিলুফা ইসয়াসমীন হাসান, মিসবাহ জামাল, মামুনুর রশিদ, জিয়াউর রহমান সাকলাইন, মোস্তফা কামাল মিলন, হিমিকা ইমাম,পলি রহমান, হাফসা নুর, শামিমা মিতাসহ আরও অনেকে।
সূত্র: সত্যবাণী ডট কম



















