প্রকাশিত :
০৬:১৭, ৩০ মার্চ ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আবারও অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। শনিবার (২৮ মার্চ) দুপুরে উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এক ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। তিনি জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইসলাম উদ্দিনের নির্দেশে সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাংলিয়া ছড়া বালু মহালের তফসিল বহির্ভূত মৌজা ও দাগ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে মো. সাহবুদ্দীনকে ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে উত্তোলিত বালুও জব্দ করা হয়।
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ বালু উত্তোলন পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, “এই ধরনের কার্যক্রম বন্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, সমস্যাটি কেবল বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। পাহাড়ঘেরা শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন ছড়া বা ছোট নদী থেকে বছরের পর বছর ধরে সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী এসব অবৈধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।
এসব অবৈধ উত্তোলনের সামাজিক প্রভাবও উদ্বেগজনক। ভূনবীর ও সিন্দুরখান ইউনিয়নে পৃথক ঘটনায় বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় এক বৃদ্ধ, এক শিশু এবং এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ভূনবীর ইউনিয়নের ঘটনায় স্থানীয় জনসাধারণ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে প্রশাসনের সামনে স্লোগান দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানায়। কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে তা আবারও শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হলেও তা মূলত শ্রমিক, ড্রাইভার বা হেলপারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ এই অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সদস্যরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদিকে, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামসংলগ্ন এলাকায় নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। ‘দি হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড’-এর পূর্ব পাশে জাগছড়া থেকে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সহায়তায় বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, দৈনিক কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দাবি করেছেন, অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু পাচারে তদবিরে প্রভাবশালী সাংবাদিকও জড়িত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত পোস্ট ভাইরাল হলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ছড়া ও ছোট নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং ভাঙন, জীববৈচিত্র্য হ্রাসসহ পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলেও অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি পদক্ষেপই পারে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে।