img

সয়াবিন তেলের বাজারে চলছে সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য

প্রকাশিত :  ০৮:২৩, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

সয়াবিন তেলের বাজারে চলছে সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য

একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সরকারকে চাপে ফেলে সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে । পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরও মিলপর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় খুচরা বাজার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল একপ্রকার গায়েব হয়ে গেছে।

এই সুযোগে বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও চক্রটি নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ক্রেতার।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের ৪ থেকে ৫টি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের ৮৫-৯০ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। বাকি ১০-১৫ শতাংশ অন্য ছোট কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে।

ওইসব বড় কোম্পানি দেশের চাহিদামতো তেল আমদানির পর রিফাইন করে বাজারে ছাড়ে। বাড়তি মুনাফা করতে তারা বছরের একেক সময় তাদের ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। সরকারকে চাপে ফেলে সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করে মূল্য বাড়িয়ে নেয়। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে এপ্রিলের প্রথম দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৯৫ টাকা।

এছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতিলিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ মূল্য সরকারের অনুমতি পাওয়ার আগেই তারা কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ১২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকে তিনি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কোনোভাবেই দাম না বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান। তবে বৈঠকের ১১ দিনেও বাজারে সয়াবিন তেল সরবরাহ বাড়েনি।

মন্ত্রী কড়া অবস্থানে থাকলেও ওই সিন্ডিকেট বাজারে তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। মুদি দোকান থেকে দিনে ২০ কার্টনের চাহিদা দিলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র দুই থেকে চার কার্টন। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা বাড়ায় সুযোগ বুঝে খোলা সয়াবিনের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন সব শ্রেণির ক্রেতা।

মঙ্গলবার নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী তুহিরন বলেন, রোজার শুরু থেকেই কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ২০ কার্টন চাহিদা দিলে ২-৩ কার্টন দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো ডিলারদের মাধ্যমে এমন কারসাজি করছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। টার্গেট ছিল ঈদের আগেই দাম আরেক দফা বাড়ানোর। কিন্তু নতুন সরকারের কঠোর তদারকিতে তা পারেনি। তাই ঈদের পর আবার দাম বাড়াতে পাঁয়তারা শুরু করেছে ৫ থেকে ৬টি কোম্পানির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

এ দিন বাড্ডা এলাকার গুদারাঘাট বাজারের পাঁচটি দোকানের চারটিতে বোতল সয়াবিন তেলের সংকট দেখা গেছে। এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। ৫ লিটারের কয়েকটি বোতল বিক্রি করতে দেখা যায় তাদের। ক্রেতারা যে দোকানে খোলা তেল পাচ্ছেন কিনে নিচ্ছেন। একই দিন নয়াবাজারের চারটি মুদি দোকান ঘুরে তেলের সংকট দেখা গেছে। ৭ এপ্রিল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কাওরান বাজার ও শান্তিনগর বাজারে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েও এমন চিত্র দেখতে পেয়েছেন।

গুদারাঘাট বাজারের ভাই ভাই জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা আল আমিন বলেন, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতাম, বিক্রি করতাম ৯৪০ টাকায়। ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু রোজার মধ্যে ৫ লিটারের বোতল কিনতে হয়েছে ৯৫০ টাকায়, বিক্রি করতে হয়েছে ৯৫৫ টাকায়। ডিলার পর্যায় থেকে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে ৫ টাকা লাভ কমেছে।

কাওরান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, রোজায় তীরের তেলের বেশ সংকট ছিল। স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পেতাম। সেখানে তখন কোম্পানি মাত্র ৫০ কার্টন তেল দিত। তাই তখন খুচরায় তেল সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়েছিল। তবে ঈদের আগে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল। এখন আবার সরবরাহ কিছুটা কম। তাই খুচরা বাজারে বোতল সয়াবিন কম সরবরাহ করতে পারছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিকে গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম টনপ্রতি ১৩৭০ ডলার, যা আগে ১১০০ ডলার ছিল। যখন ১১০০ ডলার ছিল, তখন দেশে দাম সমন্বয় হয়েছে। এখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় তা ফের সমন্বয় করতে হবে। কারণ বাজারে কয়েক মাস ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কোম্পানিগুলো কতদিন এভাবে লোকসানে পণ্য বিক্রি করবে?

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বর্তমানে বাজারে ১ লাখ ৭০ হাজার টন তেল মজুত আছে। আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকার ভোক্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে এই সময়ে যেন কোনো পণ্যের দাম না বাড়ে। সেটিকে লক্ষ্য হিসাবে নিয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেব।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১০ নভেম্বর লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর তারা আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দুবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয় তখন সাড়া দেয়নি। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারকে পাত্তা না দিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রতি লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম উল্লেখ করে বাজারে ছাড়া হয় তেল। তখন ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হয়েছে। সরকারকে না জানিয়ে কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন।

img

টিটন আমার বন্ধু, ওকে আমি ভালোবাসতাম: হত্যার মূল অভিযুক্ত পিচ্চি হেলাল

প্রকাশিত :  ০৭:৪৮, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের কোনো জড়িত থাকা নেই বলে দাবি করেছেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। বুধবার রাতে তিনি জানান, টিটনের সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তাকে তিনি বন্ধুর মতোই ভালোবাসতেন।

খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। বুধবার রাতে তিনি বলেন, টিটনের সঙ্গে তার ‘চমৎকার সম্পর্ক’ ছিল এবং তাকে তিনি ‘বন্ধু হিসেবে ভালোবাসতেন’।

হেলাল অভিযোগ করেন, স্থানীয় কিছু অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম অপরাধচক্রের প্রভাবেই বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে তার নাম সামনে আনা হচ্ছে। তার দাবি, তার কোনো \'কিশোর গ্যাং\' বা সন্ত্রাসী বাহিনী নেই; বরং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে সহজেই তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

টিটন হত্যার বিষয়ে হেলাল বলেন, নিহত টিটন অতীতে তার সঙ্গে টেলিভিশনে বক্তব্য দিয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, টিটন জীবিত অবস্থায় তাকে জানিয়েছিলেন যে প্রতিপক্ষ সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন একাধিক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করছে এবং হত্যার আশঙ্কার কথাও প্রকাশ করেছিলেন। হেলাল আরও দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইমনের স্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত বলেও মনে করেন হেলাল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, টিটনের ওই এলাকায় যাওয়ার কথা ছিল না; তাকে \'টোপ দিয়ে\' সেখানে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, \'মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ডাটা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে কে বা কারা তাকে সেখানে ডেকেছিল এবং কারা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল।\' প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও মিথ্যা প্রমাণিত হবে বলে জোর দিয়ে বলেন তিনি।

মামলার এজাহারের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হেলাল। তার দাবি, একটি অনলাইন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকার \'পরিকল্পিত\' এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে \'চাপ দিয়ে\' কথা বলানো হয়েছে। এজাহার দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, নিহতের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট কিছু নাম যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, \'ঘটনার আগ পর্যন্ত যাদের নাম সামনে আসছিল, পরদিনই এজাহারে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়—এটা স্বাভাবিক নয়।\' ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে \'হার্ট সংক্রান্ত বিরোধের গল্প\' দাঁড় করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন হেলাল। তার অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও অপরাধ চললেও তা কার্যকরভাবে দমন করা হয়নি। তিনি বলেন, \'একটি ঘটনা ঘটলে কিছুদিন তৎপরতা দেখা যায়, পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়—এই সুযোগেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।\' অতীতের কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও একই চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হেলাল বলেন, তিনি দেশে থেকেই সব অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে এভাবে প্রকাশ্যে কথা বলতেন না। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের মোবাইল ফরেনসিক পরীক্ষার দাবিও জানান তিনি। হেলাল বলেন, \'সত্য উদঘাটন না হলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং নির্দোষ মানুষ হয়রানির শিকার হবে।\'