img

সবুজের নরম ইশারা, আস্থার আলো জ্বালছে ডিএসই—ফিরছে কি বিনিয়োগকারীর আত্মবিশ্বাস?

প্রকাশিত :  ১১:৪২, ০৪ মে ২০২৬

সবুজের নরম ইশারা, আস্থার আলো জ্বালছে ডিএসই—ফিরছে কি বিনিয়োগকারীর আত্মবিশ্বাস?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ | অর্থনীতি 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সোমবারের লেনদেন যেন এক নীরব বার্তা দিয়েছে—বাজারে ধীরে ধীরে ফিরছে আস্থা, যদিও তা এখনো ভঙ্গুর। দিনের লেনদেন শেষে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে ৫২৭৭.৮১ পয়েন্টে, যা আগের দিনের তুলনায় ১২.৪২ পয়েন্ট বা ০.২৪ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। সূচকের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যদিও সামগ্রিক চিত্রে সতর্কতার ছাপ স্পষ্ট।

দিনের শুরুতে সূচক কিছুটা ইতিবাচক গতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও মধ্যাহ্নের পর এক পর্যায়ে কিছুটা চাপের মুখে পড়ে। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের আগ্রহে সূচক আবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং সবুজ রেখায় লেনদেন শেষ করে। এই ওঠানামা বাজারের ভেতরে বিদ্যমান দ্বিধা ও প্রত্যাশার মিশ্র প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।

লেনদেনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৫২টি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ৩০ দশমিক ১০ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। বাজার মূলধনের হিসেবে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭৬ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা। যদিও এই লেনদেন আগের তুলনায় খুব বেশি নয়, তবুও এটি বাজারে একটি স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।

বাজারে আজ ১৭৩টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ৪৫ শতাংশ। বিপরীতে ১৫১টি কোম্পানির দর কমেছে, যা প্রায় ৩৯ শতাংশ। অপরিবর্তিত ছিল ৬১টি কোম্পানির শেয়ার। এই তথ্য বলছে, বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ভারসাম্য থাকলেও সামান্য হলেও ক্রেতাদের দিকেই পাল্লা ভারী ছিল।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাত লেনদেনে এগিয়ে ছিল। পাশাপাশি টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতেও কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। তবে কিছু খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল, বিশেষ করে বীমা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে লাল-সবুজের মিশ্র চিত্র দেখা গেছে।

মার্কেট ম্যাপ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বড় মূলধনী কিছু কোম্পানি সূচকের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে কিছু ব্যাংক এবং শিল্প খাতের শেয়ার বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কেড়েছে। তবে একই সঙ্গে কিছু বড় কোম্পানির দরপতন বাজারকে পুরোপুরি শক্তিশালী হতে দেয়নি।

টপ সেক্টর বাই গেইনার চার্টে দেখা গেছে, টেক্সটাইল ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাত তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স করেছে। অন্যদিকে ফুয়েল অ্যান্ড পাওয়ার, ব্যাংকিং এবং বীমা খাতেও কিছু ইতিবাচক গতি ছিল, যদিও তা স্থায়ী নয়। এই খাতগুলোতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়লেও এখনো পূর্ণ আস্থার অভাব রয়েছে।

অন্যদিকে ভ্যালু বা ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো লেনদেনে প্রাধান্য পেয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক, কারণ সাধারণত ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোতেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা বেশি আগ্রহী হন। ‘বি’ ও ‘এন’ ক্যাটাগরির শেয়ারেও কিছুটা লেনদেন হয়েছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে কম।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সূচকের এই সামান্য উত্থানকে বড় কোনো ট্রেন্ড পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। বরং এটি একটি \"টেকনিক্যাল বাউন্স\" বা স্বল্পমেয়াদি পুনরুদ্ধার হতে পারে। তারা মনে করেন, বাজারে টেকসই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি করতে হলে লেনদেনের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

বিনিয়োগকারীদের আচরণেও এখন একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে যেখানে আতঙ্কে বিক্রির প্রবণতা বেশি ছিল, এখন সেখানে ধীরে ধীরে \"ওয়েট অ্যান্ড সি\" মনোভাব তৈরি হচ্ছে। অনেক বিনিয়োগকারী এখন ভালো কোম্পানির শেয়ার ধরে রাখার দিকে ঝুঁকছেন, যা বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত।

তবে বাজারের সামনে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার, ডলার সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ঘাটতি—সব মিলিয়ে বাজার এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই বিষয়গুলো সমাধান না হলে বাজারের স্থায়ী উন্নতি কঠিন হতে পারে।

আগামীকালের বাজার পূর্বাভাস:

বর্তমান প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আগামীকাল বাজারে মিশ্র কিন্তু সামান্য ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। সূচক ৫২৫০–৫৩০০ পয়েন্টের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বাড়ে এবং বড় মূলধনী কোম্পানিগুলো ইতিবাচক থাকে, তাহলে সূচক আরও কিছুটা উপরে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বাজারে এখনো ভলিউমের ঘাটতি থাকায় বড় ধরনের উত্থানের সম্ভাবনা কম। বরং ধীরে ধীরে, ছোট ছোট ধাপে বাজার এগোতে পারে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ধৈর্য ধরে ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারে অবস্থান নেওয়া।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডিএসইতে এখন \"সতর্ক আশাবাদ\" বিরাজ করছে। বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি, তবে অন্ধকার কাটার ইঙ্গিত স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়—এই আলো কতটা স্থায়ী হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কত দ্রুত ফিরে আসে।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান হারাল বাংলাদেশ

প্রকাশিত :  ০৬:৩৯, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের আমদানি বাড়লেও কমছে রপ্তানি। এর ফলে মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান হারিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বরাবরই শীর্ষ স্থানে ছিল ভিয়েতনাম; এখনো সেই স্থান ধরে রেখেছে দেশটি। দ্বিতীয় ছিল বাংলাদেশ; সেই স্থান এখন দখলে নিয়েছে চীন।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ (৫.৩৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।

এই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬৩ কোটি সাত লাখ (৫.৬৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; যা ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্টের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ (৪.৬৬ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল; যা ছিল গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কম।

একই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫৫ কোটি ৫৭ লাখ (৪.৫৫ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। তবে এটিও ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের চেয়ে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ কম।

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মত আসে দেশটি থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০২২ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি (৯.৭৩ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছিল। কিন্তু পরের বছর প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমে। ওই বছরে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৭২৯ কোটি ডলার।

২০২৪ সালে আবার রপ্তানি সামান্য বেড়ে ৭৩৪ কোটি ডলার হয়; শতাংশ হিসাবে বেড়েছিল দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে বেড়েছিল ১২ শতাংশের মতো; রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৮২০ কোটি ডলার।

অটেক্সার তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে মোট ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৫ লাখ (৪৯.০৭ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কম।

গত বছরের প্রথম আট মাসে ৫ হাজার ৩০০ কোটি ৮২ লাখ (৫৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক আমদানি করেছিলেন দেশটির ব্যবসায়ীরা।

এই আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ ছিল ভিয়েতনাম। তারপরও দেশটি থেকে আমদানি শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে ১১০৫ কোটি ৯২ লাখ ডলার থেকে ১০৯৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে নামে।

অর্থনীতি এর আরও খবর