img

​বিদেশি বিনিয়োগের রুদ্ধদ্বার: আমলাতান্ত্রিক মরীচিকা ও স্বার্থান্বেষী বলয় ভাঙবে কে?

প্রকাশিত :  ০৫:৪৪, ০৮ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৬, ০৮ মে ২০২৬

​বিদেশি বিনিয়োগের রুদ্ধদ্বার: আমলাতান্ত্রিক মরীচিকা ও স্বার্থান্বেষী বলয় ভাঙবে কে?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

​২০২৬ সালের মে মাস। বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আমাদের নীতিনির্ধারণী মহলের ভূমিকা এখনো মান্ধাতা আমলের ও রক্ষণশীলতায় মোড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী কিংবা পরিকল্পনা মন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি কি এখনো অস্পষ্ট যে, একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ স্রেফ ডলারের প্রবাহ নয়? বরং এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যখন ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তখন বিদেশি বিনিয়োগের পথে এই আমলাতান্ত্রিক বাধা লক্ষ্য অর্জনকে কেবল কঠিনই করবে না, বরং অসম্ভব করে তুলবে।

​প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকালে আমাদের দৈন্যদশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া আজ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য 'রেড কার্পেট' বিছিয়ে দিয়েছে। আমিরাত তাদের বাণিজ্যিক আইন সংশোধন করে নির্দিষ্ট কিছু খাত বাদে শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করেছে। সিঙ্গাপুরের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইডিবি) বিনিয়োগকারীদের কেবল লাইসেন্সই দেয় না, বরং তাদের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করে। এমনকি মালয়েশিয়াও চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে 'নিউ ইনসেনটিভ ফ্রেমওয়ার্ক' (এনআইএফ) চালু করেছে, যা বিনিয়োগের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে কর ছাড় দিচ্ছে।

​অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে একজন বিদেশি উদ্যোক্তাকে প্রায় ৫০টি দপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য মাসের পর মাস আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের কাছে রাষ্ট্রের নেতিবাচক ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তোলে।

​বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পথে দৃশ্যমান বাধার চেয়েও বিপজ্জনক হলো 'অদৃশ্য ছায়া'। একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিদেশি বড় কোম্পানির প্রবেশকে নিজেদের একচেটিয়া ব্যবসার জন্য হুমকি মনে করে। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির ব্যাকরণ বলে—বিদেশি বিনিয়োগ কেবল প্রতিযোগিতা বাড়ায় না, বরং স্থানীয় শিল্পের মানোন্নয়ন এবং 'ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ' শক্তিশালী করার মাধ্যমে পুরো ইকোসিস্টেমকে সমৃদ্ধ করে।

​পরিসংখ্যান বলছে, এফডিআই-তে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গুটিকতক ব্যবসায়ীর সংকীর্ণ মুনাফা রক্ষা করতে গিয়ে দেশের কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট করার কোনো নৈতিক অধিকার কারও নেই। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক এই 'অলিগার্কি' বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর প্রভাব বলয় থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

​বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু পুঁজি আনেন না, তারা নিয়ে আসেন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, অর্জিত লভ্যাংশ এবং মূলধন নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার (Repatriation) ক্ষেত্রে তাদের এখনো নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। যদিও ২০২৬ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রক্রিয়া সহজ করার কিছু নির্দেশনা দিয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তার সুফল মিলছে না বললেই চলে।

​আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, আপনার ঘোষিত "বাংলাদেশ ফার্স্ট" দর্শনের সফল বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা অপরিহার্য। বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখন আর খণ্ড খণ্ড উদ্যোগ নয়, বরং একটি শক্তিশালী 'একক কর্তৃপক্ষ' (Unified Authority) গঠন করা জরুরি; যেখানে একজন বিনিয়োগকারী কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।

​মনে রাখতে হবে, বিদেশি বিনিয়োগের বদ্ধ কপাট না খুললে বাংলাদেশের উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

রিজার্ভ চুরির অভিযোগপত্রে ড. আতিউরসহ ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান

প্রকাশিত :  ০৮:২৪, ১৮ জুন ২০২৬

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ ৬৪ ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পেয়েছে। খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করেছে সিআইডি।

আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। 

এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। 

প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার এই খসড়া অভিযোগপত্রটি চূড়ান্ত আইনি পরামর্শের জন্য এরই মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সিআইডি সূত্রে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় ১০ বছরের বেশি সময় তদন্তের পর খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। 

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় করা অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশের ১০ জন ও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও চীনের নাগরিকসহ দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে।

অভিযোগপত্র অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করে আইনি পরামর্শ চেয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। যা যাচাই-বাছাই করছে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়। 

অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইনি পরামর্শ পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

১০১ মিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ চুরির এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান, উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদার নাম রয়েছে। 

অভিযুক্ত ভারতীয়দের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা রাকেশ আস্থানার নাম আছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরি করে। 

এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে থাকা চারটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয় এবং বাকি ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে পাঠানো হয়।

তবে হ্যাকারদের বানান ভুলের কারণে শ্রীলঙ্কায় ২০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ফিলিপাইন থেকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। 

এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন উপ-পরিচালক (হিসাব ও বাজেটিং) জোবায়ের বিন হুদা ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ তদন্ত করছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুততম সময়ে এই অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনা হবে।