উন্নয়নের নামে দেশের মানুষের অর্থ তছরুপ করা হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশিত :
১৩:৫৯, ১৬ মে ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আমরা দেখেছি বিগত ১৬ বছর এই দেশের মানুষের লক্ষ-কোটি অর্থ বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছিল। এই দেশের মানুষের সম্পদ বিদেশে পাচার করে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ফোকলা করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা দেখেছি কীভাবে প্রশাসনকে রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে প্রশাসনের যে দক্ষতা, সেই দক্ষতাকে নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। আমরা দেখেছি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল আরেকটি দেশের চিকিৎসার সুবিধার জন্য। আমরা দেখেছি উন্নয়নের নামে এই দেশের মানুষের অর্থ তছরুপ করা হয়েছে।
আজ শনিবার (১৬ মে) বিকেল ৫টার দিকে চাঁদপুর সদরের বিশ্বখাল পুনঃখননের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেই কাজ আমরা শুরু করেছি। খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়ন শুরু করেছি। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা হবে কৃষকদের। খাল খনন কর্মসূচিতে গ্রাম থেকে শহর সব জায়গার মানুষ উপকৃত হবে। যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, তা আমরা বাস্তবায়ন করবো। এতে মানুষ উপকৃত হবে। আমাদের রাজনীতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার। আমাদের রাজনীতি প্রতিশ্রুতি পালনের।
তারেক রহমান বলেন, আমরা যখন প্রতিশ্রুতি পালন শুরু করেছি, তখন কিছু সংক্ষুব্ধ মানুষ বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছে। সাধারণ মানুষকে সজাগ থাকতে হবে যে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ সচেতন ছিল বলেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে রায় দিয়েছে। যেসব কাজ করার রায় মানুষ দিয়েছে, সেসব কাজ আমরা বাস্তবায়ন করবো। কেউ বাধা দিতে চাইলে মানুষ তাদের সেই ষড়যন্ত্রকে ভেস্তে দেবে। বিভ্রান্তকারীদের ফাদে পা দেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, জনগণই বিএনপির রাজনৈতিক শক্তির উৎস। জনগণ যতক্ষণ সমর্থন দেবে, দেশের জন্য কাজ করে যাব। তার থেকে একবিন্দু এদিক ওদিক হবে না।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, শিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলন, জেলা বিএনপির সভাপতি ও চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমদ মানিক প্রমুখ।
সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক: তত্ত্বাবধায়ক প্রধান উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব
প্রকাশিত :
১৬:৫৮, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব উঠেছে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে। নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে উচ্চকক্ষের মেয়াদ শেষ না হলে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও এসেছে।
আজ শনিবার সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৈঠকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের অধ্যাপক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা উপস্থিত থেকে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন। দুপুরে এক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এই মতবিনিময় সভা চলে।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদ আরও জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে অনেকে বিভিন্ন ধারণা দিয়েছেন। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে এবং সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পরও উচ্চকক্ষ বহাল থাকলে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় কিনা, সেই ধারণাও দিয়েছেন কেউ কেউ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য উপদেষ্টাদেরও দুদলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের বিধান রাখার প্রস্তাব এসেছে।
তিনি বলেন, এসব প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এখনও সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া ও কর্মপরিধির বিষয়ে সবাইকে লিখিত মতামত দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে এবং রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটি বাদ দিয়ে কীভাবে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায়, সে বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। কমিটি প্রত্যেকের মতামত পর্যালোচনা করবে।
আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতত্ত্ব, নির্বাহী বিভাগ ও আইন প্রণয়নবিষয়ক কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব এসেছে। এ ছাড়া ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া এবং মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত সংশোধনে আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি– এ চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
সরকারি হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কমিটির মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এর বদলে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যায় কিনা, সে প্রস্তাবও এসেছে। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হয়ে যায় কিনা, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশের মত, সংসদকে সংশোধনীর মাধ্যমে আদালতের রায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ সময় আলোচকরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সঙ্গে ঐকমত্যে আসার তাগিদ দেন। জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা সব রকমের চেষ্টা করছেন। জবাবে আলোচকরা বলেন, এই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির দেওয়া আপত্তির বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে কিনা– এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিরোধী দলকে কমিটির বৈঠকে এসে তাদের মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপত্তি শিথিল করার প্রস্তাব দিলে কমিটি তা বিবেচনা করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি।
২০১১ সালের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার মতো এবারও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ওই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার বিষয়ে একমত হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তা বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তখন একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা ছিল, যা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না।
এর আগে বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধী দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ঠিক করা উচিত। তিনি নিজেসহ আরও কয়েকজন বিরোধী দলকে আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলেছেন। কমিটি জানিয়েছে, এ বিষয়ে তারা অনেক রকম চেষ্টা করেছে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক, রাগীব রউফ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক, অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন প্রমুখ।