ঐতিহাসিক মসজিদকে ফের মন্দির ঘোষণা, ভারতে কি ‘হিন্দু শাসন’ চলছে?
ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদকে আদালতের রায়ে ‘বাগদেবী মন্দির’ ঘোষণা করার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। মধ্যযুগীয় এই স্থাপনাকে কেন্দ্র করে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, একের পর এক মসজিদকে মন্দির দাবি করার প্রবণতা কি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে বদলে দিয়ে ‘হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার দিকেই ইঙ্গিত করছে?
গত শুক্রবার শুনানির পর হাইকোর্ট রায় দেন যে মধ্যযুগে তৈরি এ কমপ্লেক্স ছিল প্রকৃতপক্ষে এক হিন্দু দেবীর উদ্দেশে উৎসর্গ করা মন্দির।
আদালতের এই রায়ের পর মুসলিমদের ওই চত্বরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রায়ের পর রোববার (১৭ মে) মসজিদ চত্বর জুড়ে গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী যুবকদের উল্লাস করতে দেখা যায়। কট্টরপন্থী হিন্দু যুবকদের সেখানে ধর্মীয় সংগীতের তালে নাচতে ও ধর্মীয় বিভিন্ন আচার মুঠোফোনে ধারণ করতে থাকে। বিপুল পুলিশ সদস্য মোতায়েনের মধ্যেই দেবীর একটি অস্থায়ী মূর্তিও স্থাপন করা হয় সেখানে। আদালতের এই একতরফা রায়ে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটির মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত মসজিদটি আমাদের ছিল। আজ আর নেই। এমন কিছু ঘটতে পারে, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।’
ভারতে প্রাচীন মসজিদকে মন্দির দাবি করার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদকে মন্দির দাবি করার প্রবণতা বাড়ছে। এমনকি, বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম তাজমহলের নিচেও মন্দিরের অস্তিত্ব খোঁজা হয়েছে। অথচ তাজমহল কোনো মসজিদ নয় বরং একটি সমাধিসৌধ। তা সত্ত্বেও সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত এ মোগল স্থাপনাকে বিতর্কের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে।
কী এই ভোজশালা-কামাল মাওলা বিতর্ক?
কামাল মাওলা মসজিদ বা কথিত ভোজশালা কমপ্লেক্স নিয়ে কয়েক দশক ধরেই বিতর্ক চলছে। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে এ স্থানের ওপর হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা প্রথম নিজেদের দাবি জানান।
ভারত সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিস্তম্ভ রক্ষাকারী সংস্থা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) সঙ্গে ২০০৩ সালের একটি চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মঙ্গলবার এ স্থান পরিদর্শনের অনুমতি পান হিন্দুরা। আর মুসলিমরা প্রতি শুক্রবার সেখানে নামাজ আদায় করতে পারতেন।
এখন আদালতের রায়ে এ স্থানকে ‘বাগদেবী’ বা জ্ঞান ও বাণীর দেবীর মন্দির ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে হিন্দুরা সেখানে পূজার অধিকার পেলেন। খারিজ হয়ে গেল মুসলিমদের দাবি। আদালত মুসলিমদের আবেদন খারিজ করে দিলেও তাদের জন্য জেলার অন্য জায়গায় একটি মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে বিকল্প জমির আবেদন করার সুযোগ রেখেছেন।
আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া দুই বছর আগে কামাল মাওলা মসজিদ নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। মূলত এ জরিপের ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন আদালত।
মামলার হিন্দুপক্ষ রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে স্বাগত জানিয়েছে। তবে মুসলিমরা সুপ্রিম কোর্টে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।
মুসলিমপক্ষের আইনজীবী ও আদালতের দেওয়া ওই রায়ের সমালোচকেরা বলছেন, বিতর্কিত স্থানটি হিন্দুদের হাতে তুলে দিতে আদালত প্রচলিত সীমা অতিক্রম করেছেন।
হিন্দুপক্ষের দাবি, বর্তমানে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত ‘বাগদেবী’র একটি মূর্তি এ কথিত মন্দিরের অংশ। আদালত ভারত সরকারকে সেই মূর্তি ফিরিয়ে আনার কথা বিবেচনা করতে বলেছেন।
এখানে যে মূর্তির কথা বলা হচ্ছে, সেটি ‘অম্বিকা’ নামে পরিচিত, যা সাদা মার্বেল পাথরে খোদাই করা। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি পরমার রাজবংশের নিদর্শন। এটি ১৮৭৫ সালে ধার শহরের ‘সিটি প্যালেস’-এর ধ্বংসাবশেষ থেকে ব্রিটিশ মেজর জেনারেল উইলিয়াম কিনকায়েড সংগ্রহ করেছিলেন।
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি এ মামলায় মুসলিমপক্ষের হয়ে লড়েছেন। তিনি বলেন, আদালতের রায় ‘ত্রুটিপূর্ণ’ এবং এটি ভারতের ‘উপাসনালয় আইন, ১৯৯১’-এর পরিপন্থী।
এই আইন অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের আগস্টে স্বাধীনতার সময় যেকোনো উপাসনালয়ের ধর্মীয় চরিত্র যেমন ছিল, তা পরিবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মূলত ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রকৃতি পরিবর্তনের নতুন যেকোনো দাবি ঠেকাতে এ আইন করা হয়েছিল।
ওয়ারসি আরও বলেন, বিবরণীর সঙ্গে থাকা মানচিত্রটিতে পরিষ্কার দেখা যায় যে কামাল মাওলা মসজিদ ও সিটি প্যালেস দুটি আলাদা স্থান। ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে এ কথা স্পষ্ট যে কামাল মাওলা মসজিদের স্থানে ওই মূর্তি পাওয়া যায়নি। বিরোধী পক্ষ এ বিষয়ে ডাহা মিথ্যা বলছে।
এদিকে দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ শহর থেকে নির্বাচিত পাঁচবারের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, হাইকোর্টের এ রায় অযৌক্তিক। কারণ, এএসআই এখন হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে।
ওয়াইসি বলেন, বর্তমান সরকার যদি সব মসজিদকে মন্দিরে রূপান্তর করতে চায়, তবে এটি এ বার্তাই দেয় যে ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা মুসলিমদের উপাসনালয়গুলো চরম হুমকির মুখে রয়েছে। এ রায়ের মধ্যে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা শহরের ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদ ধ্বংসসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের ২০১৯ সালের রায়ের ‘দুর্গন্ধ’ মিশে আছে। বাবরি মসজিদের রায় এ ধরনের সব দাবি ও রায়ের জন্য বিপদের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।
প্রশ্ন তুলে ওয়াইসি বলেন, এর শেষ কোথায়? নিশ্চিতভাবেই ধারের কামাল মাওলা মসজিদে এটি শেষ হচ্ছে না।
এএসআইয়ের কার্যক্রমের প্রতি ইঙ্গিত করে ভারতীয় উপমহাদেশবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে বলেন, গবেষকেরা এমন পদ্ধতি, নির্ভুলতা ও সিদ্ধান্ত খোঁজেন, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নিম্নমানের জরিপের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই।
ট্রুশকে আরও বলেন, ভারতে বর্তমানে বিভিন্ন মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এ প্রবণতা হিন্দু জাতীয়তাবাদের গভীরে প্রোথিত ইসলামভীতির অংশ।
এই ইতিহাসবিদ আরও বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়কে হয়রানি, হুমকি ও ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা যেসব কৌশল গ্রহণ করেছেন, এটি তার একটি। মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য ভারতে চলমান এসব অভিযান বেশ ভয়াবহ।
ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের একটি দল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে
‘বাবরি মসজিদ ধ্বংস হিন্দু “গৌরব”কে উজ্জীবিত করেছে’
ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতারা উগ্রপন্থী জনতাকে ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করতে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল, মোগল সম্রাট বাবরের আমলে একটি মন্দিরের ওপর মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানটি তাদের প্রধান দেবতা রামের জন্মস্থান।
মুসলিমরা ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত বাবরি মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু সে বছরই অভিযুক্ত হিন্দু পুরোহিতেরা মসজিদের ভেতর মূর্তি স্থাপন করেন। ১৯৯২ সালে মসজিদটি ধ্বংস করা হয়। এ ঘটনায় ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এতে দুই হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। তাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিতভাবে রামমন্দির নির্মাণের জন্য স্থানটি হিন্দুদের হাতে তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মন্দিরটির প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এটাকে হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের জন্য এক বড় বিজয় হিসেবে দেখা হয়। অনুষ্ঠানে মোদি বলেছিলেন, সময়ের চাকা পেছনে ঘুরেছে। হিন্দুদের গৌরবের দিন ফিরেছে।
প্রকৃত বিষয় হলো, ঐতিহাসিক মসজিদের ওপর একই ধরনের দাবি তোলা মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনীতির একটি মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পর দলটি স্লোগান দেয় ‘অযোধ্যা তো কেবল একঝলক, কাশী, মথুরা এখনো বাকি’। স্লোগানটি তাদের প্রচারণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এতে উত্তর প্রদেশের আরও দুটি শহরের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ স্লোগানের মাধ্যমে শহর দুটির মসজিদগুলোকে মন্দির বলে দাবি করা হচ্ছে।
কাশী বারানসি নামেই বেশি পরিচিত। এটি প্রধানমন্ত্রী মোদির সংসদীয় আসন। ২০২৪ সালে বারানসির একটি আদালত রায় দেন যে শহরের সপ্তদশ শতাব্দীর জ্ঞানবাপী মসজিদের নিচে হিন্দু মন্দিরের চিহ্ন রয়েছে। রায়ে হিন্দুদের সেখানে প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে মথুরায় উগ্রপন্থী বিভিন্ন হিন্দু গোষ্ঠী অযোধ্যার ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাইছে। তাদের দাবি, মোগল আমলের শাহি ইদগাহ মসজিদটি ঠিক এমন এক স্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাদের দেবতা শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের সেই বিতর্কিত ভোজশালা চত্বরে রোববার যখন হিন্দু উপাসকেরা সমবেত হন, তখন জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা হিন্দু মূর্তি স্থাপনের উৎসবে যোগ দিতে আচার-অনুষ্ঠানে বসেছিলেন। এর মধ্যে জেলার সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন।
স্থানীয় হিন্দু সংগঠনের নেতা গোপাল শর্মা দাবি করেছেন, এটি ‘হিন্দু সভ্যতার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই’।
শর্মা বলেন, ‘৭২০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা আমাদের দেবীর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করছি, যাকে অপমান করা হয়েছিল এবং যার মন্দির “ইসলামি শাসকেরা” ভেঙে ফেলেছিলেন।’
তার ভাষায়, এটি শুধু একটি স্থাপনার জন্য লড়াই ছিল না। এটি ছিল, হিন্দু সভ্যতার জন্য লড়াই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকেই ভারতে ‘হিন্দু গৌরব’ ফিরে এসেছে। আর সেই আত্মবিশ্বাসই এখন আমাদের দেশে “হিন্দু শাসন” প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করে এই রাজনীতি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আরও অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ একই ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা



















