img

শ্রীমঙ্গলের ডাকবাংলো পুকুর: অবহেলা থেকে সৌন্দর্যের নতুন ঠিকানার প্রত্যাশা

প্রকাশিত :  ১৫:৫৩, ০৫ জুন ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের ডাকবাংলো পুকুর: অবহেলা থেকে সৌন্দর্যের নতুন ঠিকানার প্রত্যাশা

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের পর্যটনের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল। \r\nচা-বাগানের সবুজ ঢেউ, পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে \r\nসারা বছরই এখানে ভিড় করেন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা। কিন্তু শহরের \r\nপ্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ডাকবাংলো পুকুর আজ সেই পরিচিত সৌন্দর্যের\r\n সঙ্গে যেন বেমানান এক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একসময় এলাকার অন্যতম \r\nআকর্ষণ হিসেবে পরিচিত এই পুকুর বর্তমানে অপরিচ্ছন্নতা, অযত্ন এবং প্রয়োজনীয়\r\n সংস্কারের অভাবে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য অনেকটাই হারিয়েছে। পানিতে ভাসমান \r\nআবর্জনা, অপরিকল্পিত পরিবেশ এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন অবকাঠামো \r\nদর্শনার্থীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে পারছে না। ফলে পর্যটননির্ভর \r\nএকটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানটি যথাযথ পরিচর্যার দাবি জানাচ্ছে।

শহরের\r\n প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, ডাকবাংলো পুকুর শুধু একটি জলাশয় নয়; এটি \r\nশ্রীমঙ্গলের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও নগর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নানা \r\nসময় এই পুকুরকে ঘিরে মানুষের অবসরযাপন, সামাজিক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক আবহ\r\n গড়ে উঠেছে। তাই এর সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করা শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণের \r\nসঙ্গেও সম্পর্কিত।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিকল্পিত উন্নয়ন করা\r\n হলে ডাকবাংলো পুকুর পাড় শ্রীমঙ্গলের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে \r\nপারে। পুকুরের পানি পরিষ্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি মাঝখানে \r\nএকটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা স্থাপন করা যেতে পারে। রাতের সৌন্দর্য \r\nবাড়াতে উপযুক্ত আলোকসজ্জা, চারপাশে ফুল ও শোভা বর্ধনকারী গাছপালা, বসার \r\nজন্য বেঞ্চ এবং আকর্ষণীয় ল্যান্ডস্কেপিং যুক্ত করা হলে এলাকাটির সৌন্দর্য \r\nনতুন মাত্রা পাবে।

এ ছাড়া প্রবীণ নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ওয়াকিং \r\nট্র্যাক, শিশুদের জন্য ছোট বিনোদন কর্নার এবং পর্যটকদের জন্য ছবি তোলা ও \r\nবিশ্রামের উপযোগী স্থান নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস, চা-শিল্পের\r\n ঐতিহ্য এবং শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তুলে ধরে নান্দনিক \r\nকারুকার্য সংযোজন করা গেলে এটি শুধু বিনোদনকেন্দ্র নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক\r\n পরিচয়ের স্থান হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

পর্যটন নগরীর মর্যাদা ধরে \r\nরাখতে শহরের উন্মুক্ত ও জনসাধারণের ব্যবহারের স্থানগুলোর উন্নয়নকে গুরুত্ব \r\nদেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগের \r\nমাধ্যমে ডাকবাংলো পুকুর পাড়কে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশে \r\nরূপান্তর করা সম্ভব। এতে একদিকে স্থানীয় মানুষের বিনোদন ও হাঁটাচলার সুযোগ \r\nবাড়বে, অন্যদিকে পর্যটকদের জন্যও সৃষ্টি হবে নতুন আকর্ষণ।

শ্রীমঙ্গলের\r\n সৌন্দর্য শুধু চা-বাগান বা পাহাড়ে সীমাবদ্ধ নয়; শহরের প্রতিটি \r\nগুরুত্বপূর্ণ স্থানই এই পরিচয়ের অংশ। সেই বিবেচনায় ডাকবাংলো পুকুরকে \r\nনতুনভাবে সাজিয়ে তোলা গেলে এটি হতে পারে শ্রীমঙ্গলের গর্বের আরেকটি \r\nপ্রতীক—যেখানে ঐতিহ্য, সৌন্দর্য ও নাগরিক জীবনের সমন্বয় ঘটবে একই সঙ্গে।

শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য রক্ষায় এমন উদ্যোগ এখন সময়ের দাবিই বলে মনে করছেন অনেকেই।

img

শ্রীমঙ্গলে প্রথমবার দেশোয়ালি সমাজের মিলনমেলা: ঐক্য, শিক্ষা ও উন্নয়নের অঙ্গীকার

প্রকাশিত :  ১৫:৪৭, ০৫ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: ‘চলো এক হই, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করি, উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশোয়ালি সমাজ মিলনমেলা ও আলোচনা সভা-২০২৬। শতাধিক পরিবারের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ মিলনমেলা পরিণত হয় দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীর এক প্রাণবন্ত পুনর্মিলনী ও সামাজিক সংহতির উৎসবে।

গত ২৯ মে শ্রীমঙ্গল জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর, বড়লেখা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশোয়ালি সম্প্রদায়ের শত শত নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও সমাজের বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন। দীর্ঘদিন পর এক ছাদের নিচে মিলিত হয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পুরো অডিটোরিয়ামজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দেশোয়ালি সমাজের প্রবীণ অভিভাবক ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক কৃষ্ণলাল কালোয়ার। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. সুধাকর কৈরী।

স্বাগত বক্তব্যে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজেন কৈরী বলেন, দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক ঐক্য আরও শক্তিশালী করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, “দেশোয়ালি সমাজ বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হলেও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত ও আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. সুধাকর কৈরী বলেন, সমাজের শিক্ষা, অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি বলেন, “ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। সমাজের যেকোনো প্রয়োজনে আমি সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করব।”

অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন প্রকাশ ভর, সজল কৈরী ও বিজয় নুনিয়া।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজনগর সরকারি কলেজের প্রভাষক সঞ্জিত যাদব, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরী, মাধবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানু, বাংলাদেশ চা শ্রমিক কমিউনিটির প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট সারদা গোয়ালা, বাংলাদেশ দেশোয়ালি সমাজ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল প্রসাদ কানু এবং সহসাধারণ সম্পাদক সংযুক্তা দুবে।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান প্রাণেশ গোয়ালা, ব্যবসায়ী জয়প্রকাশ কৈরী, পরাগ বারই, মিলন শীলসহ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের উচিত নতুন প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করা। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করা, পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করা, গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা প্রদান, অসহায় পরিবারের কন্যাদের বিয়েতে সহযোগিতা করা, প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং দেশোয়ালি সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বৈবাহিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কানু সমাজের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কানু, জেনারেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী অশোক পাশী, সাবেক স্বাস্থ্য পরিদর্শক দিলীপ কুমার কৈরী, ছাত্র প্রতিনিধি শুভ কৈরী ও হৃত্তিক রাম যাদব। এছাড়া লোহার, তেলী, পাশী, যাদব, ছত্রী ও বারই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও মতামত তুলে ধরেন।

মিলনমেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। লক্ষ্মীনারায়ণ পাশী ও তাঁর দলের পরিবেশনায় এবং সারদা গোয়ালার বিশেষ অংশগ্রহণে ভোজপুরী ভাষার গান, লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। লোকজ সুর ও সংস্কৃতির আবহে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অডিটোরিয়াম।

দিনব্যাপী এ আয়োজনের শেষে অংশগ্রহণকারীরা দেশোয়ালি সমাজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ‘ঐক্যই শক্তি’—এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে প্রতিবছর এমন মিলনমেলার আয়োজন অব্যাহত রাখার দাবি জানান তারা।

সিলেটের খবর এর আরও খবর