তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবেই ভারত থেকে ফিরেছি: জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত :
০৯:০০, ১৬ জুন ২০২৬
ভারতের নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার প্রতিবাদ হিসেবে ভারতে প্রবেশ না করে দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নয়াদিল্লি বিমানবন্দর থেকে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত ছিল তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের অংশ।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ওখানে ব্যক্তি হিসেবে যাইনি, সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছি। ফলে আমার সঙ্গে ওখানে যা হয়েছে তাৎক্ষণিক একটা প্রতিবাদ করা দরকার। সে কারণে আমি আসলে ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, ‘একটা পর্যায়ে তারা খুব চেষ্টা করেছে যেন আমি ভারতে প্রবেশ করি এবং আমার যে নিয়মিত কর্মকাণ্ড সেটায় অংশগ্রহণ করি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে তখন আমার মনে হয়েছে, রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে একটা সিগনেচার থাকা দরকার।’
দিল্লিতে সোমবার শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে জাহেদ উর রহমান রোববার সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। ওই বৈঠকে তার বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল।
কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দেয়। পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দিল্লিতে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানান এবং কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সোমবার দুপুরে তিনি ঢাকায় ফেরেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ওই বৈঠকে উপদেষ্টার অংশ নেওয়ার বিষয়টি গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল।
সোমবার সকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, পুরো ঘটনা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরপর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলবের ঘটনা ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা হলেও ইরানে শান্তি নিয়ে সংশয় কাটেনি
প্রকাশিত :
০৬:৪০, ১৬ জুন ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ০৭:১৩, ১৬ জুন ২০২৬
দীর্ঘ চার মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি এবং সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানোর ঘোষণা দিলে বিশ্বজুড়ে স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়। তবে বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও উত্তেজনায় ক্লান্ত ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো স্থায়ী শান্তি নিয়ে আস্থা তৈরি হয়নি।
গত রোববার দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, সেটি আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির আওতায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবরোধে দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে থাকা ইরানের অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যু অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের প্রশ্ন। এসব বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে অনেক ইরানির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পারিসা বলেন, এই সমঝোতা সাধারণ মানুষের জন্য খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। কারণ এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে না। সাময়িকভাবে কাজ করলেও দুই পক্ষ নিজেদের স্বার্থে আবারও এটি ভঙ্গ করতে পারে।
রাজধানীর আরেক বাসিন্দা মেহদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ন্যূনতম দাবিও মেনে নিতে প্রস্তুত নয় বলে আমার মনে হয়। তাই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আমি আশাবাদী নই।
ইরানিদের মতে, স্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছাতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে এবং দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য বৈশ্বিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিদেশে জব্দ থাকা কয়েকশ কোটি ডলারের সম্পদ ফেরত এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে জাহাজ থেকে ফি আদায়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব এই জলপথে টোলমুক্ত চলাচলের পক্ষে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং ইসরায়েলের বিরোধিতা সত্ত্বেও সমঝোতা স্মারকটি হয়েছে। রোববার বৈরুতের উপশহরে ইসরায়েলের বিমান হামলা পরিস্থিতিকে আবারও অস্থির করে তোলে। কারণ ওই এলাকা ইরানের জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচিত।
এদিকে সমঝোতা নিয়ে ইরানের কট্টরপন্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। তারা আলোচনায় আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে ছিল এবং যেকোনো ছাড়কে সমালোচনার চোখে দেখছে।
ইরান মধ্যরাতের পর আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিনে এই ঘোষণা এড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও সময়ের ব্যবধানের কারণে ওয়াশিংটন রোববারই সমঝোতার খবর প্রকাশ করে।
সোমবার তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কয়ারে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি বিশাল কালো ম্যুরাল উন্মোচন করা হয়। জুলাইয়ে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে। জীবদ্দশায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসের নীতি সমর্থন করতেন। দেশজুড়ে সরকারপন্থিদের সমাবেশে অনেকে খামেনি হত্যার প্রতিশোধ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করেছেন। কেউ কেউ আলোচক দল ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরও সমালোচনা করেছেন।
সরকারপন্থি নারী মোহাদেসে আল জাজিরাকে বলেন, আমার মনে হয় এই সমঝোতা টিকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আবারও এটি লঙ্ঘন করবে। তাই আমাদের কঠোর অবস্থান ধরে রাখা উচিত। যেমন হরমুজ প্রণালি বন্ধই রাখা উচিত।
চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রোববার রাতে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলঘদর ইসরায়েলের বৈরুত হামলার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেও পরে পরিষদটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে এবং কোনো পাল্টা হামলা হয়নি।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রতিশোধমূলক হামলা বন্ধ রাখার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে নৌ অবরোধ প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছে। আগে এই অবরোধ ৩০ দিনের মধ্যে তুলে নেওয়ার আলোচনা চলছিল।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ দেশেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বিরোধীরা এই সমঝোতাকে ইসরায়েলের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই এবং ইরান হামলা চালালে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এখনো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পূর্ণাঙ্গ লিখিত চুক্তি প্রকাশ করা হয়নি। তবে উভয় পক্ষই এটিকে নিজেদের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ইসলামিক রিপাবলিক ও প্রতিরোধ অক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে এই সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে।
এদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও অবরোধ প্রত্যাহারের খবরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইরানের বাজার। সোমবার টানা তৃতীয় দিনের মতো দেশটির মুদ্রার মান শক্তিশালী হয়েছে। প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ১০ হাজার রিয়াল। গত মাসে যা রেকর্ড সর্বনিম্ন ১৯ লাখ রিয়ালে নেমে গিয়েছিল।
তেহরানে স্বর্ণমুদ্রার দামও কমেছে। একই সঙ্গে তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক প্রায় ৫০ লাখ পয়েন্টে পৌঁছে নতুন উচ্চতায় উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ সম্পদ ফেরত পেলে ইরানের অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে নানা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার ওপর।