img

অভিবাসী বৈচিত্র্যময় এক বিশ্বকাপ: দ্য গার্ডিয়ান

প্রকাশিত :  ০৪:৫৪, ২৩ জুলাই ২০২৬

অভিবাসী বৈচিত্র্যময় এক বিশ্বকাপ: দ্য গার্ডিয়ান

বিশ্বকাপে রেকর্ড সাতটি গোলে অ্যাসিস্ট করে এক আসরে পেলের গড়া রেকর্ড ভেঙেছেন ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার মাইকেল ওলিসি। তবে ফ্রান্সের হয়ে খেললেও দেশটি তার জন্মভূমি নয়।

\r\n

নিজের বহুজাতিক পরিচয় নিয়ে ওলিসি বলেন, “জাতীয়তা বলে দেয় আপনি কোথা থেকে এসেছেন। সত্য বলতে, আমি চারটি দেশ থেকে এসেছি—ফ্রান্স, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া ও গ্রেট ব্রিটেন। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। কারণ আমার মধ্যে ভিন্ন চারটি সংস্কৃতি রয়েছে, যা আমাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে।”

খোলা চোখে তাকালে, এবারের বিশ্বকাপে অভিবাসী খেলোয়াড়দের অর্জন অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে নিবন্ধিত ফুটবলারদের মধ্যে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ নিজের জন্মভূমির বাইরে অর্থাৎ অন্যদেশের হয়ে খেলেন। সংখ্যাটি ২০১৮ সালের চেয়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আর এবার বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া ৪৮টি দলের ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩.৬%) তাদের জন্মভূমির বাইরের দেশের জার্সিতে মাঠে নামেন। ৪৮ দল ও ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল টুর্নামেন্টে এটি অবশ্যই লক্ষণীয় দিক।

জন্মভূমির বাইরের দেশের জার্সি গায়ে চাপানো ফুটবলারদের পা থেকে এবার গোল ও অ্যাসিস্ট এসেছে ৭০টি, যার মধ্যে ১৯টি গোল ছিল এমন- যেখানে পাস দেওয়া ও গোলদাতা—উভয়ই জন্মসূত্রে অন্য দেশের। অথচ, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আটটি আসরের মধ্যে ছয়টিতে মোট গোল ছিল ৮৯টির কম। 

তবে সব গোলের গুরুত্ব এক নয়, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে। বিশ্বকাপের একেকটি মুহূর্ত যেন জাতীয় চেতনার গভীরে গেঁথে যায়। 

২০২৬ বিশ্বকাপ আসরের তিন আয়োজক দেশের হয়ে অভিবাসী খেলোয়াড়রা অসামান্য অবদান রেখেছেন। কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া হুলিয়ান কিনিয়োনেস মেক্সিকোর হয়ে টুর্নামেন্টের প্রথম গোল করেন। ওই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ ব্যবধানে হারায় মেক্সিকো। পরে নকআউট পর্বের দুটিসহ আরও তিনটি ম্যাচে জাল খুঁজে নেন এই স্ট্রাইকার।

যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে মালেক তিলমান করেন দুই গোল ও এক অ্যাসিস্ট। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে এক গোলের কারিগর হয়ে তিলমান যখন মাঠ ছাড়েন, তখন বদলি হিসেবে মাঠে নামেন জিও রেইনা (গোলও করেন)। অর্থাৎ ওই ম্যাচে জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এক খেলোয়াড়ের জায়গায় মাঠে নামেন এমন একজন, যিনি বেড়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডে। 

উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। জোনাথন ডেভিড তার জীবনের প্রথম কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্রে কাটালেও পরে কানাডা ফুটবলের নায়ক হয়ে ওঠেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কানাডার প্রথম জয়ে তিনি অসাধারণ হ্যাটট্রিক উপহার দেন। সব মিলিয়ে ১২ জন ফুটবলার তিন আয়োজক দেশের কোনো একটিতে জন্ম নিলেও এবারের বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করেছেন অন্য দেশের।

তবে উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে ছিল ফ্রান্স। কোচ দিদিয়ে দেশমের ফরাসি স্কোয়াডে সুযোগ না পেয়ে অন্য দেশের জার্সিতে এবার বিশ্বকাপে খেলেছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ৭৪ ফুটবলার। কুরাসাও দলটি এক্ষেত্রে একেবারে ব্যতিক্রম, তাদের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ২৫ জনই নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণকারী। 

স্পেনের হয়ে ফাইনালে জয়সূচক গোলের পেছনে অবদান রেখেছেন নিকো উইলিয়ামস।  বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামসের চেয়ে এই টুর্নামেন্ট তার জন্য ছিল অনেক বেশি রঙিন। ইনিয়াকির দেশ ঘানা কেবল শেষ ৩২ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আবার ইনিয়াকির দল ঘানাকে আলো দেখান আমস্টারডামে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার ডেরিক লুকাসেন, যার সৎ ভাই ব্রায়ান ব্রোবি আবার নেদারল্যান্ডসের হয়ে যৌথভাবে সর্বাধিক গোলদাতা।

দুই ভাই দেসিরে দুয়ে ও গুয়েলা দুয়ের জন্ম ফ্রান্সের অঁজের শহরে। দেসিরে খেলেছেন ফ্রান্সের হয়ে, আর গুয়েলা ছিলেন আইভরি কোস্ট স্কোয়াডে। একাই কাহিনি স্কটল্যান্ডের সটার পরিবারের প্রযোজ্য। এই পরিবারের দুই ভাই- হ্যারি খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে, আর জন ছিলেন স্কটল্যান্ড টিমে। আসলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সীমানার প্রাচীর এখন একেবারে অর্থহীন।

বিশ্বকাপের এই বহুমাত্রিকতাকে যদি একজন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে হয়, তবে তিনি ২০ বছর বয়সী নেস্টোরি ইরানকুন্ডা। তানজানিয়ায় জন্ম নেওয়া এই তরুণের বর্তমান ক্লাব ওয়াটফোর্ড। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করে কানাডার মাঠে তুরস্কের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করেন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে খেলার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান সিয়াটলে। তার অনবদ্য পারফরম্যান্স পর্তুগিজ ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। হয়ত তার পরবর্তী ঠিকানা হতে যাচ্ছে পর্তুগাল।

ফুটবলে জাতীয়তার সংজ্ঞা আর কখনোই এতটা জটিল বা বৈচিত্র্যময় ছিল না। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জাতীয়তা আর কখনো এমন সহজভাবে মিলেমিশে এক হয়েও যায়নি।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক



img

আসিফ নজরুলের ‘একক সিদ্ধান্তে’ বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যায়নি বাংলাদেশ

প্রকাশিত :  ১৪:৫৫, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। তবে দীর্ঘদিন পর প্রকাশিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

কমিটির দাবি, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি এককভাবে নিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ। এর মধ্যে তিনটি কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইয়ে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়।

আইসিসি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিসিবিও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তিন সদস্যের কমিটি তাদের ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। বরং তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এককভাবে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য কারো মতামত নেওয়ার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রিকেটারদের সঙ্গে মিটিংয়ে আসিফ নজরুল শুধু নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। 

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় নেওয়া উচিত নয়।

সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির নাম জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, ‘যে একজন ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে, তিনি তৎকালীন স্পোর্টসের দায়িত্বে ছিলেন, প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল।’

তবে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্যে ভিন্নতা ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির দুই কোটি টাকা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আসিফ নজরুল বলেছিলেন, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা।

সেদিন তিনি বলেন, ‘কোনো অনুশোচনা বা প্রশ্নের সুযোগ নেই (বিশ্বকাপ খেলতে না পারার কারণে)। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা ও ক্রিকেট বোর্ড। তারা দেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে আত্মত্যাগ করেছে। এটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

অথচ এর আগে, ২২ জানুয়ারি আসিফ নজরুল স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারই ক্রিকেটারদের ভারতে পাঠাচ্ছে না। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি সিদ্ধান্তের দায় বোর্ড ও ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি মনে করে, এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরো সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটাররা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্বকাপ বয়কটের পক্ষে বা বিপক্ষে মত থাকতেই পারে। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

খেলাধূলা এর আরও খবর