img

লাল কার্ড বিতর্ক: ফের উসকে দিলেন ট্রাম্প, প্রশংসা করলেন ফিফা প্রধানের

প্রকাশিত :  ০৯:৩২, ১৮ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৬, ১৮ জুলাই ২০২৬

লাল কার্ড বিতর্ক: ফের উসকে দিলেন ট্রাম্প, প্রশংসা করলেন ফিফা প্রধানের

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের বিরুদ্ধে দেখানো বিতর্কিত লাল কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘চমৎকার’ বলে অভিহিত করে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এই মন্তব্য ও অবস্থান আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্প ফিফার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আগামীকাল রোববার অনুষ্ঠেয় আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচকে সামনে রেখে নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সম্মানে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়েই ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন।

সপ্তাহব্যাপী চলমান টুর্নামেন্টের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলোরিন বালোগানের লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনাটিকে ‘সম্ভবত সবচেয়ে অবিস্মরণীয় মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন। গত ১ জুলাই বসনিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়ার পর বালোগানকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

নিষেধাজ্ঞার পরপরই ট্রাম্প সরাসরি ফিফা প্রধান ইনফান্তিনোকে ফোনকল করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন, যা পরবর্তীতে ফিফা মেনে নেয়। এই সিদ্ধান্তেরই তীব্র সমালোচনা করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা।

৮০ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘আমি জিয়ান্নিকে ফোন করতে এবং একটি সুপারিশ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, “জিয়ান্নি, আমি একটি সুপারিশ করতে চাই: ওকে খেলায় ফিরিয়ে নাও!”... আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না।’

পরবর্তীতে ৬ জুলাই বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে মাঠে নামেন বালোগান। তবে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের কাছে ১-৪ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়।

ম্যাচে হারলেও নিজের এই হস্তক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন ট্রাম্প। ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এটি যেভাবে শেষ হয়েছে তা অনেক ভালো, কারণ এখানে কোনো বিতর্ক নেই। তারা খেলায় জিতেছে এবং আমাদের দল মাঠে সব খেলোয়াড়কে পেয়েছিল।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন, ‘ভেবে দেখুন, যদি ইনফান্তিনো তাকে অনুমতি না দিতেন এবং তারা হেরে যেত, তবে সবাই বলত আমাদের সেরা খেলোয়াড় থাকলে আমরা জিতে যেতাম। তাই জিয়ান্নি আবারও তার নেওয়া অনেক ভালো সিদ্ধান্তের একটি প্রমাণ দিয়েছেন।’

তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না ফুটবল সংশ্লিষ্টরা।

ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (উয়েফা) ফিফার এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে ‘অভূতপূর্ব এবং অসমর্থনযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন এই সিদ্ধান্তটি হয়তো কোনো কৌতুক ছিল। বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞ সাইরাস জ্যানসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘এটি মার্কিন দলের জন্য একটি উভয়সংকট তৈরি করেছে। আমরা যদি বেলজিয়ামকে হারাতাম, তবে সেই জয় কলঙ্কিত হতো কারণ জয়ের জন্য আমাদের প্রেসিডেন্টের কারচুপির সাহায্য প্রয়োজন হয়েছিল। আর যখন আমরা হেরেছি, তখন প্রমাণ হলো আমাদের প্রেসিডেন্টের অনৈতিক সাহায্যও আমাদের জেতাতে পারেনি।’

তীব্র সমালোচনার মুখে গত ৬ জুলাই ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এক বিবৃতিতে দাবি করেন, ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে। তিনি বলেন, ‘ফিফার বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলো স্বায়ত্তশাসিত। তারা ফিফার শৃঙ্খলা বিধি প্রয়োগ করে এবং নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়।’

তবে এই ঘটনার পর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কাছে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

টুর্নামেন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর খোদ মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলোরিন বালোগানও স্বীকার করেছেন ট্রাম্পের এই ‘অনন্য’ হস্তক্ষেপ দলে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিল।

চলতি সপ্তাহে সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দলে ফিরতে পেরে আমার ভালো লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু পরে যখন আমি ভাবলাম, তখন বুঝতে পারলাম এটি অনেক বিতর্কের জন্ম দিতে যাচ্ছে। আমার সতীর্থদের মধ্যেও আমি কিছুটা নার্ভাসনেস বা উদ্বেগ দেখতে পাচ্ছিলাম, কারণ এই ধরনের ঘটনা সত্যিই নজিরবিহীন।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প তার অন্যান্য নিয়মিত বিষয়েরও অবতারণা করেন।

তিনি ইঙ্গিত দেন, মেক্সিকো এবং কানাডা ছাড়াই ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারে। এ ছাড়া তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের নির্বাচনী জালিয়াতির বিতর্কিত ও ভিত্তিহীন দাবিগুলোও পুনর্ব্যক্ত করেন।


 

img

আসিফ নজরুলের ‘একক সিদ্ধান্তে’ বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যায়নি বাংলাদেশ

প্রকাশিত :  ১৪:৫৫, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। তবে দীর্ঘদিন পর প্রকাশিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

কমিটির দাবি, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি এককভাবে নিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ। এর মধ্যে তিনটি কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইয়ে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়।

আইসিসি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিসিবিও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তিন সদস্যের কমিটি তাদের ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। বরং তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এককভাবে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য কারো মতামত নেওয়ার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রিকেটারদের সঙ্গে মিটিংয়ে আসিফ নজরুল শুধু নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। 

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় নেওয়া উচিত নয়।

সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির নাম জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, ‘যে একজন ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে, তিনি তৎকালীন স্পোর্টসের দায়িত্বে ছিলেন, প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল।’

তবে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্যে ভিন্নতা ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির দুই কোটি টাকা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আসিফ নজরুল বলেছিলেন, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা।

সেদিন তিনি বলেন, ‘কোনো অনুশোচনা বা প্রশ্নের সুযোগ নেই (বিশ্বকাপ খেলতে না পারার কারণে)। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা ও ক্রিকেট বোর্ড। তারা দেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে আত্মত্যাগ করেছে। এটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

অথচ এর আগে, ২২ জানুয়ারি আসিফ নজরুল স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারই ক্রিকেটারদের ভারতে পাঠাচ্ছে না। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি সিদ্ধান্তের দায় বোর্ড ও ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি মনে করে, এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরো সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটাররা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্বকাপ বয়কটের পক্ষে বা বিপক্ষে মত থাকতেই পারে। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

খেলাধূলা এর আরও খবর