‘সারাদিন কাটিয়ে এলাম বনভোজনের আনন্দে’
প্রবাস জাীবনে আমাদের সারাটা বছরই কাটাতে হয় কাজকর্ম, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও অন্যান্য কাজকর্ম ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্তার মধ্য দিয়ে। এরই মধ্যে সবাই চায় বাইরে গিয়ে একটু ঘোরাঘুরি করে মনটাকে পরিষ্কার করতে। এরই মোক্ষম সময় হচ্ছে সামার হলিডে। এ সময় স্কুল কলেজ ৬ সপ্তাহ বন্ধ থাকার কারনে সবাই বাইরে বেড়াতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অনেকেই পরিবার নিয়ে বিভিন্ন দেশসহ দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন পছন্দনীয় জায়গায় বেড়াতে যান। অনেকে আবার বন্ধুবান্ধব মিলে আনন্দ করে সারা বছরের একঘেয়েমি জীবন কাটানো ও অবসন্নতাকে দূর করতে আয়োজন করেন বাইরে যাওয়ার।
এ লক্ষ্যেই ২৮ জুলাই মঙ্গলবার মৌলভী বাজার ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের উদ্যোগে এক বনভোজনের আয়োজন করা হয়। বনভোজন আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন এসোসিয়েশনের সভাপতি জনাব আব্দুল কাদির। অনুষ্ঠান সফল করার লক্ষ্যে কিছুদিন পূর্বে সমিতির উপদেস্টাবৃন্দ এবং এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যদের নিয়ে এক সভার আয়োজন করা হয়। সভাপতি জনাব আব্দুল কাদিরের সভাপতিত্বে এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি জনাব আব্দল কাইয়ুম চৌধুরীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য জনাব মো: কামরুল হাসান (এলিন)-কে সর্বসম্মতিক্রমে বনভোজন করার জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান নির্ধারণের দ্বায়িত্ব দেয়া। পরবর্তী সভায় জনাব কামরুল হাসান তার পছন্দের স্থান ”কষ্টওল্ড কাউন্ট্রি পার্ক এন্ড বীচ” এর কথা উল্লেখ করেন এবং ঐ এলাকার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এখানে রয়েছে চারিদিকে সবুজ গাছপালার সমারোহ, খেলাধূলার ব্যবস্থা, লেকে সাঁতার কাটার সুবিধা, প্যাডেল নৌকা, ইলেকট্রিকের নৌকা চড়ার সুবিধা এবং বারবিবিকিউ’র সুবিধা সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। এসব বর্ণনা শুনে সবাই এই জায়গাটিকে গ্রহণযোগ্য বলে সম্মতি দিলেন্। ঐদিন বনভোজনের তারিখ ঠিক করা হলো ২৮ জুলাই ২০২৬ মঙ্গলবার। অনুষ্ঠান আয়োজনে যাবতীয় কাজকর্ম সুন্দর ভাবে পরিচালনা করার জন্য জনাব এলিনকে সহযোগিতা করার জন্য কায’্রৃকরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আব্দুল ওয়াহিদ (সারোয়ার) সহ আরও কয়েকজনকে নির্বাচিত করা হয়। এ লক্ষ্যে একটি গাড়ি ভাড়া করার প্রস্তাবও করা হয়।
নির্ধারিত ২৮ তারিখে সকাল ৬টায় সোয়ানসী সেন্ট হেলেন্স রোডস্থ ”ব্রাদার্স ক্যাশ এন্ড ক্যারী”র সামনা থেকে বাস ছাড়ে। যাত্রাপথে সম্মানিত সদস্যদের উঠানোর জন্য সকাল ৬-৪৫ মিনিটে প্লাজা পোর্ট টালবট এবং ৭-৪৫ মিনিটে ব্রিজেন্ড অডিয়ন সিনেমা হলের সামনে থেকে সদস্যদের তুলে সোজাসুজি কস্টওল্ডস কাউন্ট্রি পার্ক এন্ড বীচ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
যাত্রা হল শুরু : বাস যাত্রার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন জনাব খন্দকার আব্দুল ওয়াহিদ। ব্রিজেন্ড থেকে বাস ছাড়ার পরপরই পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত এবং তরজমা করেন জনাব আকরম চৌধুরী (তুহিন) । এরপর সকালের নাস্তা পরিবেশন করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন জনাব আব্দুল কাদির ও আনসার মিয়া। নাস্তার মধ্যে ছিল, চিড়ার মধ্যে দই কলা মিশিয়ে কন্টেইনার, ক্রসেন্ট এর সাথে বেকারীতে তৈরী অন্যান্য আইটেম এবং কলা। এরপর পরিবেশন করা হলো মিস্টিমধুর স্পাইসি চা। যাত্রাপথে সকালের এই নাস্তার আয়োজন সবাইকে মুগ্ধ করেছে। নাস্তা শেষে সাধারণ সম্পাদক জনাব খন্দকার আব্দুল ওয়াহিদ মাইকে গাড়ি ভর্তি এসোসিয়েশনের সদস্য এবং অতিথিদের মধ্য থেকে এই বাস যাত্রার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। চলমান গাড়িতে তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে চলমান বক্তব্য রাখেন সর্বজনাব সভাপতি আব্দুল কাদির, উপদেষ্টাদের পরিষদ থেকে সর্বজনাব সৈয়দ আছিয়াদ আলী, খালিক মিয়া, আব্দুল লতিফ (কাওছার), আহমেদুর রহমান পারভেজ, আনসার মিয়া প্রমুখ। বক্তারা তাদের বক্তব্যে অনুষ্ঠান আয়োজনকারীদের কঠোর পরিশ্রম করে এই আনন্দময় যাত্রার বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। এভাবেই বাস ভর্তি সবাই বিভিন্ন ধরণের আনন্দদায়ক আলাপ আলোচনা, রংবেরঙের গল্পগুজবে মুখরিত হয়ে ওঠে বাস যাত্রা। আনন্দঘন পরিবেশে গল্পগুজবের মধ্য দিয়েই বাসটি বিভিন্ন গ্রামের আঁকাবাকা অলিগলি রাস্তা দিয়ে চলছে। রাস্তার দু’দিকে তাকালেই দেখা যায় আমাদের দেশের মতো খোলা মাঠ, মাঠে গবাদি পশুর বিচরণ, ভেড়াভেরির দল হেঁটে হেঁট্ েঘাষ খাচ্ছে। এসব দেখে দেখে ক্ষণিকের জন্য মনটা যেন বাংলাদেশেই চলে গেল। শুধু আমারই নয়, সারোয়ার ভাইও মাইকে এলাকার ধারা বিবরনি দিতে গিয়ে তিনিও এই ধরণের তাঁর অনুভূতির কথাগুলোই বলছিলেন্ ।
সবাই বেশি আনন্দ ভোগ করেছেন জনাব আব্দুল কাদির ভাইর পড়া ”আমাদের ছোট নদী, চলে বাকে বাকে’ কবিতাটি শুনে। আসলে এই কবিতাটি আমরা ছোট বেলায় বইতে পড়েছি। এই কবিতাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে গ্রামের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া আঁকা বাঁক খাল, নদীগুলোর কথা, যেখানে সবাই নৌকা যাতায়ার, বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘোরাফেরা করার আন্দের মূহুর্তগুলো। ওয়েলস এর উপর লেখা আমার বইতে ওয়েলস এর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এবং তার রূপ সৌন্দর্য্য দেখে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে আমি লিখেছি, চারিদিকে সমুদ্র বেষ্টিত উঁচু নীচু পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা ওয়েলস যেন ভিন্ন রঙের শাড়ী পড়া এক ”রূপসী ওয়েলস’। সুন্দরের সূতিকাগার এই ওয়েলসেই যাচ্ছি আমরা বনভোজন করতে। আনন্দ কি আর ধরে রাখা যায় ? কতক্ষণে গিয়ে পৌছবো আমাদের কাঙ্খিত জায়গায় এই চিন্তা, রাস্তা যেন শেষ হয় না। এরই মধ্যে সারোয়ার ভাই মাইকে সকাল ১০টায় ঘোষণা দিলেন, সবার কাঙ্খিত লক্ষ্যস্থল ”কস্টওল্ডস কাউস্ট্রি এন্ড বীচ-এসে গেছি । কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাস এসে থামলো। বাস থেকে সবাই নামলাম। কিছুদূর এগিয়েই দেখা গেল হাতের বাঁদিকে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের খেলা করার জন্য পানির উপর প্লাস্টিকের বিভিন্ন ধরনের বড় বড় নীল রঙের উঁচু নীচু করে বানানো পাহার। ছেলে মেয়েরা সেখানে ইচ্ছে মতো লাফালাফি করছে, আনন্দ ্উপভোগ করছে। আরও কিছুদূর এগুনোর পর চোখে পড়লো ডান দিকে বীচের মধ্যে লোকজন হাঁটাহাটি করছে, পানিতে সাঁতার কাটছে, বীচে কাপড় বিছিয়ে শুয়ে আছে, গল্প করছে, কেউ কেউ প্যাডেল চালিত সোয়ান নৌকা চালাচ্ছে আবার কেউ ইজ্ঞিন চালিত নৌকা, এবং অনেকে প্লাষ্টিকের নৌকা বৈঠা দিয়ে দিব্বি চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশের মাটিতে এসব দেখে চোখের ভেসে ওঠলো দেশে থাকতে এভাবে আমরা কত নৌকা চালিয়ে আনন্দ ফূর্তি করেছি এসব স্মৃতিচারণ করতে করতে গিয়ে পৌছলাম বারবিকিউ বানানোর জায়গায়। সেখানে পৌছে আমাদের সাথে করে নিয়ে যাওয়া বারবিকিউর সব জিনিসপত্র রেখে সবাই ছুটে গেলেন চারিদিকে দল বেঁধে। কেউ সাঁতার কাটলেন, কেউ সোয়ান নৌকা চড়লেন, কেউ বসে বসে আইসক্রিম খেলেন অর্থাৎ যার যা ইচ্ছা তা করলেন্। এক সময়ে আমি, এলিন ভাই, আমার সাথে আসা একজন ছাত্র উদ্দিপ্ত সরকার এবং অন্য একজন লেলিন ভাইর বন্ধু সহ চারজন একটি সোয়ান নৌকায় উঠলাম। উদ্দিপ্ত প্যাডেল মারলো আর এলিন ভাই স্টিয়ারিং ধরে নিশানা ঠিক রাখলেন। এ ভাবেই মনভরা আনন্দ নিয়ে আধঘন্টা চালানোর পর আমাদের সময় শেষ হয়ে গেলে, পাড়ে নৌকা ভিড়িয়ে উঠে আসলাম। আমার সাথে কাজ করে আরেকজন ছাত্র উদিপ্তর বন্ধু যাকে আমি ভাগ্না ডাকি আবু নাঈম বিজয়, সে সাঁতার না জানায় সাহস করে নৌকায় ওঠেনি। এভাবে সবাই বিভিন্ন দিকে ঘুরাঘুরি করে ফিরে আসলাম বারবিকিউ বানানোর জায়গায়। শুরু হলো বারবিকিউ বানানোর প্রস্তুতি। সাথে আনা চিকেন তান্দুরী সসের মধ্যে ভেজানো এবং চিকেন কাবাব এগুলোকে বারবিকিউতে আগুন দিয়ে কুক করে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। লাইন বেধে সবাই দাড়ালেন। কুক হওয়ার পর একে একে পরিবেশন করা হয়।
এখানে আছে খেলাধুলা করার জন্য খোলামেলা জায়গা। শুরু হলো বিভিন্ন ধরণের খেলাধূলা। সভাপতি কাদির মিয়ার পরিচালানায় শুরু হলো ফুটবল খেলা এরপর হাত দিয়ে পাঞ্জা লড়া, চোখ বেঁধে পাতিল ভাঙা ইত্যাদি। সবচেয়ে আনন্দদায়ক হয়েছে যা সবাই উপভোগ করেছেন ”পাতিল ভাঙা”। চোখ বেঁধে দেয়ার পর তিনবার ঘুরানো দিয়ে লাঠি হাতে দিয়ে বলা হয়, যান পাতিল ভাঙ্গেন। কেউ আর পাতিল বরাবর যেতে পারেন না। শর্ত হলো হাতের লাঠি দিয়ে মাত্র ১টা চাপ দিয়ে পাতিল ভাঙতে হবে। চোখ বেঁধে যখন পাতিলের দিকে যাওয়ার কথা, বাস্তবে দেখা গেল কেউ চলে ডানে, কেউবা বাঁয়ে, কেউ যায় উত্তরে, কেউ যায় একেবারে উল্টো দিকে। অর্থাৎ পাতিল ভাঙা আর হয় না। তারা যখন উল্টাপাল্টা করে তখন হাততালি পড়তে থাকে। তাদের চোখে বাঁধা কাপড় যখন খুলে দেয়া হয়, তখন তারা নিজেরাই হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়েন। এভাবেই আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে খেলাধূলার পর্ব শেষ হয়।্ মৌলভী বাজার ডিষ্ট্রিষ্ট এসেসিয়েশনের এই আনন্দময় উৎসবের সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে এসোসিয়েশনের উপদেষ্টামন্ডলীর অন্যতম সদস্য জনাব আব্দুল লতিফ কয়সর এর, যিনি এই বনভোজন আয়োজনের অর্ধেক খরচই বহন করেছেন। এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সবাই তাঁর এই অবদানকে আন্তরিক ভাবে গ্রহণ করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এরপর ধীরে ধীরে সবাই একত্রিত হয়ে আমাদের গন্তব্যস্থলে যেতে বাসের দিকে রওয়ানা দিলাম। তখন বাজে বেলা সাড়ে তিনটা।
উল্লেখ্য যে, মৌলভী জেলা এসোসিয়েশন সোয়ানসীর উক্ত পিকনিক ২০২৬ অনুষ্ঠানে সম্মানিত উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ আছিয়াদ আলী, খালিক মিয়া, আব্দুল লতিফ (কাওছার), আহমেদুর রহমান পারভেজ।
কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আব্দুল কাদির -সভাপতি, মিশপাক মিয়া -সহ সভাপতি, হাবিবুর রহমান (মকবুল) সহ সভাপতি, সিনিয়র সহ সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী , সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আব্দুল ওয়াহিদ (সারোয়ার), সহ-সাধারণ সম্পাদক সমছু মিয়া , কোষাধ্যক্ষ- আনছার মিয়া, সহকারী কোষাধ্যক্ষ -মো. কামরুল হাসান (এলিন), সহকারী সাধারণ কোষাধ্যক্ষ- সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (শাহেদ), সাংগঠনিক সম্পাদক- মাতাব আহমদ।
অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দেওয়ান ফয়সল, আব্দুল মোমিন, আবুল কালাম, কবির আহমদ, মো: নুর মিয়া, আকরাম চৌধুরী (তুহিন), আব্দুর রউফ, কফিল উদ্দিন চৌধুরী (রাজন) প্রমুখ।
উক্ত বনভোজন অনুষ্ঠান সফল ও আনন্দময় করে তোলার জন্য সমিতির সভাপতি জনাব আব্দুল কাদির উপদেষ্টা মন্ডলী, এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যবৃন্দ, সাধারণ সদস্যবৃন্দ এবং অতিথিদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন।



















