একটি ফোনকলের সূত্রে জট খুলল রুবেল হত্যারহস্যের
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পলাতক এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের মাছের ঘেরের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন তাঁর ভাই রুবেল মণ্ডল। গত বছরের ৭ মে ঢাকার আশুলিয়ার ওই মাছের ঘেরের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে কে বা কারা এবং কী কারণে তাঁকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে তখন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার তদন্তে থানা পুলিশ কাজ করলেও দীর্ঘ সময় ধরে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে ক্লুলেস মামলাটির রহস্য উদ্ঘাটন হয়। একটি ফোনকলের সূত্র ধরে খোলে এই হত্যারহস্য। প্রধান অভিযুক্তকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দুদিন কাটে অন্ধকারে। শেষ দিনে গিয়ে ঘটনাচক্রে রহস্য সমাধানের সূত্র মেলে। জানা যায়, ঘের দখল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে বাধা দেওয়ার বিরোধে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই সাইদুল হক বলেন, নিহত রুবেল মণ্ডলের স্ত্রী রিমি আক্তার বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেন। প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে না জানায় তিনি এজাহারে মাছের ঘের নিয়ে শান্ত মণ্ডলের সঙ্গে বিরোধের কথা বলেন। তাঁর মামলায় শান্তসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। এর সূত্র ধরে শান্তকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পিবিআই। কিন্তু দুদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, কিছুই জানেন না। তাঁর অপরাধ সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণও পুলিশের হাতে ছিল না। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নেই। ঘটনার আগে-পরে তিনি কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, অনেক লোকের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু হত্যায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, এমন কাউকে পাওয়া যায় না। রিমান্ডের তৃতীয় দিনে রুবেলের কললিস্টে থাকা জনৈক রবিনকে নিয়ে কিছুটা সন্দেহ দেখা দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে শান্ত দাবি করেন, রবিনকে চেনেন না। কত মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন নানা কারণে কথা হয়; সবাইকে মনে রাখা সম্ভব নয়।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, শান্তর কথায় যুক্তি থাকলেও হাল ছাড়েনি তদন্ত দল। সেই রবিনের নম্বরে কল করে কৌশলে মাছ ধরার বিষয়ে কথা বলা হয়। কিন্তু রবিন প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতে চান এবং মাছ ধরেন না বলে জানান। তখন বলা হয়, শান্ত তো বললেন, ‘আপনি মাছ ধরেন।’ এ পর্যায়ে রবিন বলেন, আগে মাছ ধরতেন, এখন আর ধরেন না। তাঁর এড়িয়ে যাওয়ার ধরন, তাড়াতাড়ি ফোন রাখতে চাওয়ায় সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় চাপাচাপিও করা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে বেশ কিছু সময় পর একজন শিক্ষক তদন্ত কর্মকর্তাকে কল করে দেখা করতে চান। দেড় ঘণ্টা পর তিনি রবিনকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তখন রবিন জানান, সেদিন তারা টাকার বিনিময়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে রুবেলের মাছের ঘেরে যান। সেখানে তাদের চোখের সামনেই রুবেলকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন শান্ত। মুহূর্তে তদন্তে নাটকীয় মোড় চলে আসে। শান্তও নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। যদিও তিনি পরে আদালতে জবানবন্দি দিতে সম্মত হননি। তবে মাছ ধরতে যাওয়া চারজনের জবানবন্দিতে পুরো ঘটনা স্পষ্ট হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি ও তদন্তে জানা যায়, রুবেল মণ্ডলের ভাই রুহুল মণ্ডল আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। তিনি দেড় দশক ধরে আশুলিয়া মডেল টাউন এলাকার প্লাবিত অঞ্চলের মধ্যে পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষ করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে চলে যান। তখন শান্ত মণ্ডল মাছের ঘেরটি নিয়ন্ত্রণে নেন। গত বছর রুহুল মণ্ডল তাঁর ভাই রুবেলকে ঘের দেখভালের দায়িত্ব দেন। মধ্যবর্তী সময়ে ঘের দেখাশোনার জন্য প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা করে বেতন নিয়েছেন শান্ত। কিন্তু রুবেল ঘেরের দায়িত্ব নিতে গেলে তিনি আরও আট লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে খুন করার হুমকিও দেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সর্বশেষ শান্ত পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে চারজনকে দিনব্যাপী বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে দেন। সেদিন সকালে রুবেল ঘের তদারকি করতে গিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি দেখে তাদের বাধা দেন। তখন সেখানে উপস্থিত শান্তর সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে শান্তর ছুরিকাঘাতে মারা যান রুবেল।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, শান্ত মণ্ডল ছাড়া মামলার অপর আসামিদের কারও সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগাসাজশ পাওয়া যায়নি। তবে আব্বাস আলী বেপারী ঘটনা জানার পরও প্রকাশ করেননি এবং আসামিকে পালাতে সহায়তা করেন। এ কারণে অভিযোগপত্রে তাদের দুজনকে আসামি করা হয়েছে।



















