img

একটি ফোনকলের সূত্রে জট খুলল রুবেল হত্যারহস্যের

প্রকাশিত :  ০৬:১৭, ০৬ আগষ্ট ২০২৬

একটি ফোনকলের সূত্রে জট খুলল রুবেল হত্যারহস্যের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পলাতক এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের মাছের ঘেরের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন তাঁর ভাই রুবেল মণ্ডল। গত বছরের ৭ মে ঢাকার আশুলিয়ার ওই মাছের ঘেরের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে কে বা কারা এবং কী কারণে তাঁকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে তখন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার তদন্তে থানা পুলিশ কাজ করলেও দীর্ঘ সময় ধরে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।

পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে ক্লুলেস মামলাটির রহস্য উদ্ঘাটন হয়। একটি ফোনকলের সূত্র ধরে খোলে এই হত্যারহস্য। প্রধান অভিযুক্তকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দুদিন কাটে অন্ধকারে। শেষ দিনে গিয়ে ঘটনাচক্রে রহস্য সমাধানের সূত্র মেলে। জানা যায়, ঘের দখল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে বাধা দেওয়ার বিরোধে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই সাইদুল হক বলেন, নিহত রুবেল মণ্ডলের স্ত্রী  রিমি আক্তার বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেন। প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে না জানায় তিনি এজাহারে মাছের ঘের নিয়ে শান্ত মণ্ডলের সঙ্গে বিরোধের কথা বলেন। তাঁর মামলায় শান্তসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। এর সূত্র ধরে শান্তকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পিবিআই। কিন্তু দুদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, কিছুই জানেন না। তাঁর অপরাধ সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণও পুলিশের হাতে ছিল না। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নেই। ঘটনার আগে-পরে তিনি কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, অনেক লোকের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু হত্যায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, এমন কাউকে পাওয়া যায় না। রিমান্ডের তৃতীয় দিনে রুবেলের কললিস্টে থাকা জনৈক রবিনকে নিয়ে কিছুটা সন্দেহ দেখা দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে শান্ত দাবি করেন, রবিনকে চেনেন না। কত মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন নানা কারণে কথা হয়; সবাইকে মনে রাখা সম্ভব নয়। 

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, শান্তর কথায় যুক্তি থাকলেও হাল ছাড়েনি তদন্ত দল। সেই রবিনের নম্বরে কল করে কৌশলে মাছ ধরার বিষয়ে কথা বলা হয়। কিন্তু রবিন প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতে চান এবং মাছ ধরেন না বলে জানান। তখন বলা হয়, শান্ত তো বললেন, ‘আপনি মাছ ধরেন।’ এ পর্যায়ে রবিন বলেন, আগে মাছ ধরতেন, এখন আর ধরেন না। তাঁর এড়িয়ে যাওয়ার ধরন, তাড়াতাড়ি ফোন রাখতে চাওয়ায় সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় চাপাচাপিও করা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে বেশ কিছু সময় পর একজন শিক্ষক তদন্ত কর্মকর্তাকে কল করে দেখা করতে চান। দেড় ঘণ্টা পর তিনি রবিনকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তখন রবিন জানান, সেদিন তারা টাকার বিনিময়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে রুবেলের মাছের ঘেরে যান। সেখানে তাদের চোখের সামনেই রুবেলকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন শান্ত। মুহূর্তে তদন্তে নাটকীয় মোড় চলে আসে। শান্তও নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। যদিও তিনি পরে আদালতে জবানবন্দি দিতে সম্মত হননি। তবে মাছ ধরতে যাওয়া চারজনের জবানবন্দিতে পুরো ঘটনা স্পষ্ট হয়ে যায়। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি ও তদন্তে জানা যায়, রুবেল মণ্ডলের ভাই রুহুল মণ্ডল আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। তিনি দেড় দশক ধরে আশুলিয়া মডেল টাউন এলাকার প্লাবিত অঞ্চলের মধ্যে পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষ করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে চলে যান। তখন শান্ত মণ্ডল মাছের ঘেরটি নিয়ন্ত্রণে নেন। গত বছর রুহুল মণ্ডল তাঁর ভাই রুবেলকে ঘের দেখভালের দায়িত্ব দেন। মধ্যবর্তী সময়ে ঘের দেখাশোনার জন্য প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা করে বেতন নিয়েছেন শান্ত। কিন্তু রুবেল ঘেরের দায়িত্ব নিতে গেলে তিনি আরও আট লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে খুন করার হুমকিও দেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সর্বশেষ শান্ত পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে চারজনকে দিনব্যাপী বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে দেন। সেদিন সকালে রুবেল ঘের তদারকি করতে গিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি দেখে তাদের বাধা দেন। তখন সেখানে উপস্থিত শান্তর সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে শান্তর ছুরিকাঘাতে মারা যান রুবেল।  

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, শান্ত মণ্ডল ছাড়া মামলার অপর আসামিদের কারও সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগাসাজশ পাওয়া যায়নি। তবে আব্বাস আলী বেপারী ঘটনা জানার পরও প্রকাশ করেননি এবং আসামিকে পালাতে সহায়তা করেন। এ কারণে অভিযোগপত্রে তাদের দুজনকে আসামি করা হয়েছে। 


বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

মাদ্রাসায় তিন মাস ধরে নিয়মিত শিক্ষকের ধর্ষণের শিকার ছাত্র

প্রকাশিত :  ১৩:৪৯, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ১০ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রকে নিয়মিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক আল আমিনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই ছাত্র নাজেরা বিভাগে পড়াশোনা করত বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়টি জানাজানি হলে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান এবং শিক্ষক আল আমিনকে আটক করে।

ঘটনাটি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযুক্ত আল আমিন মির্জাপুর উপজেলার ভাওড়া ইউনিয়নের শ্বশ্বধরপট্টি গ্রামের আব্দুল মালেক মিয়ার ছেলে। তিনি প্রায় তিন বছর আগে ওই মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলা সদরের বাইপাস বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা ভাড়া নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর আগে ফতেপুর ইউনিয়নের পারদিঘী গ্রামের হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান মারকাজুল উম্মাহ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জামুর্কী ইউনিয়নের পাকুল্যা সদরের ওই শিশুকে নাজেরা বিভাগে ভর্তি করা হয়। পরে সে মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থায় থাকত।

পরিবারের অভিযোগ, গত তিন মাস ধরে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে আসছিলেন শিক্ষক আল আমিন। এতে তার পেটে ব্যথা এবং পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্তপাতসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। অসুস্থতার কথা জানালে তার মা তাকে ছুটিতে বাড়িতে নিয়ে যান।

বাড়িতে থাকার সময় একদিন সকালে শিশুটির নানা আজিজুর রহমান বাড়ির টয়লেটে রক্ত দেখতে পান। বিষয়টি তিনি শিশুটির মাকে জানান। তবে ভয়ে তখনও ধর্ষণের বিষয়টি পরিবারের কাছে প্রকাশ করেনি শিশুটি।

পরে তাকে জামুর্কী, মির্জাপুর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসা শেষে ১১ দিন আগে শিশুটিকে আবার মাদরাসায় রেখে যান তার মা। পরিবারের দাবি, ওই ১১ দিনের মধ্যে আট দিনই তাকে ধর্ষণ করা হয়। একপর্যায়ে শিশুটির প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে সে বিষয়টি মাকে জানায়। পরে মা তাকে আবার বাড়িতে নিয়ে আসেন।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মির্জাপুর সদরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে শিশুটির বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। পরিবারের দাবি, পরীক্ষার পর চিকিৎসক শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে ধর্ষণের বিষয়টি জানান এবং তার স্বজনদের কাছে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন।

এরপর শুক্রবার সকালে শিশুটির মা, নানা ও মামা মাদরাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করেন। এ সময় শিক্ষক ও প্রিন্সিপালের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন মাদরাসায় জড়ো হয়ে শিক্ষক আল আমিনকে মারধর করেন।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল গেট বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠি তুলে নিয়ে জনতার ওপর হামলার নির্দেশ দেন। এ নিয়ে সেখানে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে প্রিন্সিপাল ও অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীর নানা বলেন, এত ছোট একটি শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

ভুক্তভোগী শিশুটিও অভিযোগ করে, গত তিন মাস ধরে শিক্ষক আল আমিন তাকে ভয় দেখিয়ে ও বিভিন্নভাবে ফুসলিয়ে ধর্ষণ করেছেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সে মাকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল বলেও জানায়।

শিশুটির মা অভিযোগ করেন, ছেলে অসুস্থ থাকার কথা জানিয়ে মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে নিতে গেলে শিক্ষক আল আমিন তাকে গ্যাস্ট্রোলিভারের চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দেন। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। তিনি অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

তবে ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক আল আমিন। তিনি বলেন, ‘আমি নির্দোষ। উপরে আল্লাহ আছেন, তিনি বিচার করবেন। ছাত্ররা তো মিথ্যা কথা বলেই, ওই ছাত্রও মিথ্যা বলছে।’

পেটব্যথার কারণে শিশুটিকে গ্যাস্ট্রোলিভারের চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক আল আমিনকে আর প্রতিষ্ঠানে রাখা হবে না। জনতার ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকজন তার গলা চেপে ধরেছিলেন, সে কারণেই তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছেন।

মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুটির মা বাদী হয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ এর আরও খবর