img

বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: প্রত্যেকের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

প্রকাশিত :  ১৭:১২, ১৪ আগষ্ট ২০২৬

বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: প্রত্যেকের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে অন্তত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। শুক্রবার সকাল ৯ টার দিকে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রথম দিকে চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ি, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নিহতরা হলেন- সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মোহাম্মদ মনসুর আলী (৫৫), মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), পাবনার সুজানগরের আব্দুল আলীম সুজন (৩৬), গাইবান্ধার রানা মিয়া (২৩), সীতাকুণ্ডের হাবিবুর রহমান (৫১), পলাশ দাশ (৩৫), সানি দাশ (২৩), গাইবান্ধার খোকন মিয়া (২৩)। শরীফ নামের আরেক শ্রমিক চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন চমেক পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।

ফেরদৌস স্টিল শিপ ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। তবে স্ক্র্যাপ জাহাজের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জাহাজের বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করছিলেন। সকাল ৯ টার দিকে একটি জাহাজের ট্যাংকে গ্যাসের লিকেজ হয়।

ইয়ার্ড ব্যবস্থাপকের ভাষ্য, গ্যাস লিকেজের খবর পেয়ে স্থানীয় কিছু লোক ঘটনাটি দেখতে জাহাজের কাছে যান। সেখানে জমে থাকা গ্যাসে কয়েকজন হতাহত হন। তবে ঘটনার সময় হতাহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা তিনি জানাতে পারেননি।

কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন বলেন, শিপইয়ার্ডে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছিল।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ তাকে আটজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত না করা পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। কমিটির প্রধান করা হয়েছে ক্যাপ্টেন মো. এনামকে। এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, জাহাজে নেভিগেশনসহ বিভিন্ন বিষয় থাকায় সেনাবাহিনীর একটি দলও ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করবে। দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, আহত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও করা হবে।

জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা। সংস্থাটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, গত দুই বছরে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর গত আট বছরে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৬ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকা গ্যাস ও বিপজ্জনক পদার্থ পরীক্ষা করে নিরাপদ ঘোষণা করা গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজে অ্যাসবেস্টস, পিসিবি, তেল, ভারী ধাতু ও ওজোন-ক্ষয়কারী গ্যাসসহ বিপজ্জনক উপাদান কোথায় রয়েছে, তার তালিকা পর্যালোচনা করে সেগুলো অপসারণের কথা।

অনুমোদিত মেরিন সার্ভেয়ার বা বিশেষজ্ঞের পরীক্ষায় ট্যাংকে দাহ্য গ্যাস নেই- এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাটিং করার নিয়ম। এ ছাড়া জাহাজে থাকা ফুয়েল, লুব অয়েল, স্লাজ ও বিলজ ওয়াটারের মতো দূষণকারী পদার্থও অপসারণ করার কথা।

পরিবেশ অধিদপ্তর সরাসরি এসব পদার্থ পরিষ্কারের কাজ করে না। তবে ইয়ার্ডের পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ আইন মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা তদারক করার দায়িত্ব সংস্থাটির।

দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরও কীভাবে এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে গ্যাস জমে ছিল। এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা ইয়ার্ডে গিয়ে ভাঙচুর করেছেন বলে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এ সময় ইয়ার্ডের বিভিন্ন মালামালও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিকেল তিনটার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে চারজন সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে মনসুর আলী ও নাছির উদ্দীন আপন ভাই। তাদের বাবা মো. সেকান্দর। পলাশ দাশ ও সানি দাশও একই এলাকার জেলেপাড়ার বাসিন্দা।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সায়েদ বলেন, মনসুর ও নাছির খুবই দরিদ্র পরিবারের সদস্য ছিলেন। তারা নিয়মিত শিপইয়ার্ডে কাজ করতেন। দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে পরিবারটি আরও অসহায় হয়ে পড়েছে। একই এলাকার পলাশ ও সানির মৃত্যুতে তাদের পরিবারেও নেমে এসেছে শোক ও অনিশ্চয়তা।


বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

মাদ্রাসায় তিন মাস ধরে নিয়মিত শিক্ষকের ধর্ষণের শিকার ছাত্র

প্রকাশিত :  ১৩:৪৯, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ১০ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রকে নিয়মিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক আল আমিনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই ছাত্র নাজেরা বিভাগে পড়াশোনা করত বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়টি জানাজানি হলে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান এবং শিক্ষক আল আমিনকে আটক করে।

ঘটনাটি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযুক্ত আল আমিন মির্জাপুর উপজেলার ভাওড়া ইউনিয়নের শ্বশ্বধরপট্টি গ্রামের আব্দুল মালেক মিয়ার ছেলে। তিনি প্রায় তিন বছর আগে ওই মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলা সদরের বাইপাস বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা ভাড়া নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর আগে ফতেপুর ইউনিয়নের পারদিঘী গ্রামের হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান মারকাজুল উম্মাহ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জামুর্কী ইউনিয়নের পাকুল্যা সদরের ওই শিশুকে নাজেরা বিভাগে ভর্তি করা হয়। পরে সে মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থায় থাকত।

পরিবারের অভিযোগ, গত তিন মাস ধরে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে আসছিলেন শিক্ষক আল আমিন। এতে তার পেটে ব্যথা এবং পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্তপাতসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। অসুস্থতার কথা জানালে তার মা তাকে ছুটিতে বাড়িতে নিয়ে যান।

বাড়িতে থাকার সময় একদিন সকালে শিশুটির নানা আজিজুর রহমান বাড়ির টয়লেটে রক্ত দেখতে পান। বিষয়টি তিনি শিশুটির মাকে জানান। তবে ভয়ে তখনও ধর্ষণের বিষয়টি পরিবারের কাছে প্রকাশ করেনি শিশুটি।

পরে তাকে জামুর্কী, মির্জাপুর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসা শেষে ১১ দিন আগে শিশুটিকে আবার মাদরাসায় রেখে যান তার মা। পরিবারের দাবি, ওই ১১ দিনের মধ্যে আট দিনই তাকে ধর্ষণ করা হয়। একপর্যায়ে শিশুটির প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে সে বিষয়টি মাকে জানায়। পরে মা তাকে আবার বাড়িতে নিয়ে আসেন।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মির্জাপুর সদরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে শিশুটির বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। পরিবারের দাবি, পরীক্ষার পর চিকিৎসক শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে ধর্ষণের বিষয়টি জানান এবং তার স্বজনদের কাছে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন।

এরপর শুক্রবার সকালে শিশুটির মা, নানা ও মামা মাদরাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করেন। এ সময় শিক্ষক ও প্রিন্সিপালের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন মাদরাসায় জড়ো হয়ে শিক্ষক আল আমিনকে মারধর করেন।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল গেট বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠি তুলে নিয়ে জনতার ওপর হামলার নির্দেশ দেন। এ নিয়ে সেখানে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে প্রিন্সিপাল ও অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীর নানা বলেন, এত ছোট একটি শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

ভুক্তভোগী শিশুটিও অভিযোগ করে, গত তিন মাস ধরে শিক্ষক আল আমিন তাকে ভয় দেখিয়ে ও বিভিন্নভাবে ফুসলিয়ে ধর্ষণ করেছেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সে মাকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল বলেও জানায়।

শিশুটির মা অভিযোগ করেন, ছেলে অসুস্থ থাকার কথা জানিয়ে মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে নিতে গেলে শিক্ষক আল আমিন তাকে গ্যাস্ট্রোলিভারের চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দেন। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। তিনি অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

তবে ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক আল আমিন। তিনি বলেন, ‘আমি নির্দোষ। উপরে আল্লাহ আছেন, তিনি বিচার করবেন। ছাত্ররা তো মিথ্যা কথা বলেই, ওই ছাত্রও মিথ্যা বলছে।’

পেটব্যথার কারণে শিশুটিকে গ্যাস্ট্রোলিভারের চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক আল আমিনকে আর প্রতিষ্ঠানে রাখা হবে না। জনতার ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকজন তার গলা চেপে ধরেছিলেন, সে কারণেই তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছেন।

মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুটির মা বাদী হয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ এর আরও খবর