img

নেপালের সেনাবাহিনীর জেনারেল হলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান

প্রকাশিত :  ০৭:৫৩, ১৮ আগষ্ট ২০২৬

নেপালের সেনাবাহিনীর জেনারেল হলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান

ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠকে নেপাল সেনাবাহিনীর সম্মানসূচক জেনারেল পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) কাঠমান্ডুর শীতল নিবাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল তাকে এই সম্মানসূচক পদমর্যাদা প্রদান করেন। 

১৯৫০ সালে শুরু হওয়া একটি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এই সম্মাননা দেওয়া হলো। ওই ঐতিহ্য অনুযায়ী, নেপাল ও ভারত পরস্পরের সেনাপ্রধানকে সম্মানসূচক জেনারেল পদমর্যাদা দিয়ে থাকে।

চার দিনের সফরে নেপালে থাকা জেনারেল শেঠ নেপাল সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেলের সঙ্গেও বৈঠক করেন। তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রেসিডেন্ট পৌডেলের সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে নেপালের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাম সাহায় প্রসাদ যাদব, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল, নেপালে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তব এবং নেপাল সেনাবাহিনী ও সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জেনারেল শেঠ রোববার নেপালে পৌঁছান।

ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, ভারতীয় সেনাপ্রধানের নেপাল সফর দুই দেশের অনন্য ও দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে পুনর্ব্যক্ত করে। এই সম্পর্ক অভিন্ন মূল্যবোধ, পারস্পরিক আস্থা এবং দীর্ঘদিনের সেনাবাহিনী-টু-সেনাবাহিনী সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। জেনারেল শেঠ ভারতীয় দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তবের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। সেখানে নয়াদিল্লি ও কাঠমান্ডুর মধ্যকার সার্বিক সম্পর্ক আরও জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয় বলে দূতাবাস জানিয়েছে।

সোমবার জেনারেল শেঠ নেপাল সেনাবাহিনীর কাছে সামরিক ও চিকিৎসা সরঞ্জামও হস্তান্তর করেন। নেপাল সেনাবাহিনীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তিনি সেনা সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং গার্ড অব অনার গ্রহণ ও পরিদর্শন করেন।

নেপাল সেনাবাহিনী বলেছে, জেনারেল শেঠের এই সফর নেপাল ও ভারতের সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা আরও জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

অরুণাচলে ভারতীয় ভূখণ্ড দখল: চীন-ভারত সীমান্তে নতুন করে বাড়ছে উত্তেজনা

প্রকাশিত :  ১০:৩৭, ১৮ আগষ্ট ২০২৬

চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি ভারতের সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশের কিছু ভূখণ্ডও চীন দখল করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। 

২০২১ সালের ২০ অক্টোবর, ভারতের অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের তাওয়াং এবং চীন সংলগ্ন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার (এলএসি) কাছাকাছি অবস্থিত পেঙ্গা টেং সো-তে একটি বোফোর্স কামান বসাচ্ছেন ভারতীয় সৈন্যরা। ছবি: এএফপি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের মিত্র আঞ্চলিক রাজনীতিবিদদের একটি অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, চীন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না এবং ভারতের সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশের কিছু ভূখণ্ড দখল করেছে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় চীনের কথিত ভূখণ্ড দখলের বিষয়ে নীরব থাকার জন্য মোদি সরকারের সমালোচনা করেছে।

নতুন এসব অভিযোগ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম পার্বত্য জেলা আপার সুবানসিরিকে ঘিরে।

এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ভারত ও চীনের সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নতির ধারাকে ভেঙে দিতে পারে। দুই দেশ দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ১৯৬২ সালে তাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ নয়াদিল্লি ও বেইজিং—উভয়কেই লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এ ছাড়া আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনার কয়েক সপ্তাহ আগে এই ঘটনা সামনে এলো।

চীনের সঙ্গে ভারতের ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তজুড়ে জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশের মতো অঞ্চল দিয়ে বিস্তৃত।

সীমান্তের বড় একটি অংশই বিতর্কিত।

এমনকি তথাকথিত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা কোথায়—তা নিয়েও ভারত ও চীনের মধ্যে মতৈক্য নেই। এই রেখাটিকে দুই দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডের মধ্যে ধারণাগত বিভাজনরখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

উত্তর-পূর্ব ভারতে চীনের কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো।

অনুসন্ধানী দল কী পেয়েছে?

চীনের কথিত ভূখণ্ড দখলের বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টি অব অরুণাচল চার সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দলকে ওই প্রত্যন্ত এলাকায় পাঠায় বলে দলটির সহসভাপতি কালিং জেরাং আল জাজিরাকে জানিয়েছেন।

পিপলস পার্টি অব অরুণাচল ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক জোট নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশ।

অরুণাচল প্রদেশেও ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার রয়েছে।

ওই এলাকা পরিদর্শনের পর অনুসন্ধানী দলটি জানায়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যের তাসিং এলাকায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী টহল দিতে পারে না।

এই সময়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, বর্ষার আগের ও বর্ষাকালের প্রবল বৃষ্টিপাত এবং এর ফলে সৃষ্ট ভূমিধস পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।

অন্যদিকে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়জুড়ে সীমান্ত এলাকায় চীনা বাহিনী \'সক্রিয় থাকে\'।

এর ফলে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে ভারতীয় পক্ষের অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেরাংয়ের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দারা অনুসন্ধানী দলকে জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী সীমান্তের একটি টহল পয়েন্ট শেরা-৫ ছেড়ে দেয়।

জেরাং আল জাজিরাকে আরও বলেন, পূর্বপুরুষদের সময় থেকে ব্যবহার করে আসা শিকারের জমি হারানোর ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ।

\'মাঠপর্যায়ের এসব অনুপ্রবেশের ঘটনা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই,\' তিনি বলেন।

তিনি বলেন, \'এসব ভূখণ্ড দখল নতুন বা হঠাৎ করে ঘটেনি; বরং বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটেছে।\'

তিনি আরও বলেন, \'কেন্দ্র ও রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারগুলো সীমান্ত এলাকার মানুষের প্রতি পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছে।\'

গত মাসে স্থানীয় একটি উপজাতীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি দেয়।

চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, চীনের ভূখণ্ড দখল \'বহুগুণ বেড়েছে এবং যতটা সম্ভব বেশি জমি দখলের উদ্দেশ্যেই\' তা করা হচ্ছে।

ভারত ও চীন যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে

ভারতীয় সেনাবাহিনী বলেছে, চীনা বাহিনীর কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো \'ভুল এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন\'। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ নাকচ করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, নয়াদিল্লি \'সবসময় চীনা পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় জোর দিয়ে এসেছে যে, সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করি এবং এসব এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি\'।

তিনি আরও বলেন, \'আমরা এটিও বলেছি যে, সীমান্ত পরিস্থিতি আমাদের বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলবে।\'

নয়াদিল্লির মতো বেইজিংও সতর্কতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। নতুন করে সীমান্তে কোনো উত্তেজনার বিষয়টি তারা স্বীকারও করেনি, আবার অস্বীকারও করেনি।

বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, \'এই মুহূর্তে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল।\'

তিনি আরও জানান, গত সপ্তাহে দুই দেশ চীন-ভারত সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে।

গুও বলেন, \'দুই পক্ষ কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা যৌথভাবে রক্ষা করতে সম্মত হয়েছে।\'

ভারত ও চীনের মধ্যে কি সীমান্ত বিরোধ রয়েছে?

হ্যাঁ, রয়েছে। আর এই বিরোধই দুই দেশের বৃহত্তর মতপার্থক্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ সীমান্ত বিরোধের মতো এই বিরোধের পেছনেও ব্রিটিশদের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।

১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বত—যা সে সময় চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না—সিমলা কনভেনশন নামে পরিচিত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তিতে ম্যাকমোহন রেখা নামে পরিচিত একটি সীমারেখার মাধ্যমে তাদের সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হেনরি ম্যাকমোহন ওই চুক্তির প্রধান আলোচক ছিলেন।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে ভারত ম্যাকমোহন রেখাকেই চীনের সঙ্গে নিজের সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে আসা চীন এই রেখাকে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হিসেবে স্বীকার করে না। বেইজিংয়ের যুক্তি হলো, সিমলা কনভেনশনের আলোচনায় চীন অংশ নেয়নি।

চীন পুরো অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে \'দক্ষিণ তিব্বত\' বা \'জাংনান\' নামে অভিহিত করে।

এ ছাড়া ভারত ও পাকিস্তান উভয়ে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের বলে দাবি করা বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলের একটি অংশ আকসাই চিনও চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

১৯৬২ সালে ভারত ও চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে—যার উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেওয়া—তাদের বৃহত্তর সীমান্ত বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কার্যত সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে সম্মত হয়।

কিন্তু দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়নবিষয়ক অধ্যাপক বি আর দীপক বলেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাটি আসলে কোথায়—সে বিষয়েও দুই দেশ এখনো একমত হতে পারেনি।

তিনি বলেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা কোথায় অবস্থিত, তা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় দুই দেশের দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এর ফলে উভয় পক্ষের টহলদল এমন এলাকায় প্রবেশ করতে পারে, যেগুলো অন্য পক্ষ নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার পশ্চিমাঞ্চলীয় অংশে পার্বত্য লাদাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক এলাকায় নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান ও উত্তেজনা চলছে।

২০২০ সালের জুনে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে হাতাহাতির পর্যায়ের সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন।

সীমান্তের পূর্বাঞ্চলীয় অংশেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এই অঞ্চলের মধ্যে ভারতের সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ রয়েছে। সিকিমের নাকু লা এলাকায় ২০২০ সালের মে মাসে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরপর ২০২১ সালের জানুয়ারিতেও সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে।

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার মধ্যাঞ্চলেও চীন ও ভারতের মধ্যে ছোটখাটো সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরাখণ্ডের বারাহোতি এবং হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা অঞ্চল।

আর চীন, ভারত ও ভুটানের ত্রিদেশীয় সীমান্তে অবস্থিত মালভূমি ডোকলামে ২০১৭ সালে বেইজিং সামরিক সড়ক দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণের জন্য ভারী সড়ক নির্মাণের সরঞ্জাম নিয়ে আসে।

এর ফলে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে চীনা বাহিনীর ৭৩ দিনব্যাপী উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপক বলেন, \'এসব সমস্যা একটির পর একটি বড় আকার ধারণ করার সম্ভাবনা সবসময়ই রয়েছে।\'

তিনি বলেন, \'একটি ছোট অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ব্যাপক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে, যেমন ২০২০ সালের জুনে গালওয়ানে ঘটেছিল।\'

ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, ট্রাম্পের শুল্ক ভারত ও চীনকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে বাধ্য করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোর সীমান্ত উত্তেজনা কাটিয়ে উঠতে তারা এখনো \'সতর্কভাবে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনের\' পর্যায়ে রয়েছে।

দোন্থি আল জাজিরাকে বলেন, \'চীন সীমান্ত বিরোধকে চাপ প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং পরস্পরবিরোধী সংকেত পাঠায়, যেমনটি তারা অতীতেও করেছে। এর ফলে ভারতকে বুঝে নিতে হয়, স্থানীয় সামরিক কমান্ডাররা নিজেদের সিদ্ধান্তে কাজ করছেন, নাকি সামরিক নেতৃত্বের নির্দেশে।\'

সীমান্ত সম্পর্ক এখনো উত্তেজনাপূর্ণ থাকলেও গত এক দশকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

বেইজিংয়ে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ে তা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

এই বাণিজ্যের সিংহভাগই ভারতের চীন থেকে আমদানিনির্ভর।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানির পরিমাণ ছিল ৬১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

অন্যদিকে, একই সময়ে ভারতের চীনে রপ্তানি ১০ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে প্রথম স্তরের এমন একটি দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যারা চীনের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক এড়িয়ে যেতে সহায়তা করার জন্য একটি \'গোপন পুনঃরপ্তানি নেটওয়ার্কের\' অংশ বলে তারা অভিযোগ করেছে।

মুম্বাইয়ের সোমাইয়া বিদ্যাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সাহেলি চট্টরাজ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, সীমান্ত বিরোধের মুখেও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতি—এই দ্বৈত অবস্থাই চীন-ভারত সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, \'মৌলিক কৌশলগত বিরোধের সমাধান না করেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়তে পারে। সীমান্ত কেবল দুই দেশের মধ্যকার একটি বিরক্তিকর বিষয় নয়।\'

তিনি আরও বলেন, \'চীন-ভারত সম্পর্ককে প্রকৃত স্বাভাবিকীকরণের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করাই সবচেয়ে যথাযথ।\'

তিনি বলেন, \'বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় শক্তির ভারসাম্যে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার এবং ভারতকে মনে করিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে চীনের আচরণকে দেখা যেতে পারে—দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হলেও এর ফলে বিদ্যমান কৌশলগত ভারসাম্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।\'

দোন্থিও তার সঙ্গে একমত।

তিনি বলেন, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে \'ভারত ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বী হতে বাধ্য। অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ দুই দেশের সম্পর্ককে ততদিন পর্যন্ত তাড়া করে বেড়াবে, যতদিন না এর সমাধান হয়।\'


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর