img

উল্লুক ও চশমাপরা হনুমান হারিয়ে যাচ্ছে বন থেকে

প্রকাশিত :  ১৭:৫৭, ২২ আগষ্ট ২০২৬

পাচার, বন দখল ও উজাড়, খাদ্যসংকট, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও সড়ক দুর্ঘটনায় বিপন্ন দুই প্রজাতি; সিলেটের বনাঞ্চলে চশমাপরা হনুমান আছে মাত্র ৪৮৪টি, উল্লুক নেমে এসেছে ৪৬৮টিতে

উল্লুক ও চশমাপরা হনুমান হারিয়ে যাচ্ছে বন থেকে

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের বনাঞ্চল থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে উল্লুক (Western Hoolock Gibbon) ও চশমাপরা হনুমান (Phayre’s Langur)। বন উজাড় ও দখল, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট, পাচার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং সড়কে গাড়িচাপায় প্রাণ হারানো—সব মিলিয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে এই দুই প্রজাতির প্রাইমেট।

বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন প্রাইমেট নিয়ে প্রকাশিত Primates in Peril: The World’s 25 Most Endangered Primates (2023–25) শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উল্লুক ও চশমাপরা হনুমানকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন ২৫টি প্রাইমেটের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিপন্ন প্রজাতির কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশের এই দুই প্রজাতি সেগুলোর মধ্যে রয়েছে।

চশমাপরা হনুমানের বিস্তৃতি এখন বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রজাতিটির সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। তবে প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন প্রজন্মে এর সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে অনেক এলাকায় এ প্রজাতি ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাচার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া ও সড়ক দুর্ঘটনাও এদের টিকে থাকার পথে বড় বাধা। প্রায় দুই দশক ধরে চশমাপরা হনুমান আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় রয়েছে।

সিলেটের বনে চশমাপরা হনুমান ৪৮৪টি

২০২৫ সালে জার্মান প্রাইমেট সেন্টারের এক গবেষণায় সিলেটের বনাঞ্চলে মাত্র ৪৮৪টি চশমাপরা হনুমানের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। হবিগঞ্জের সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, আদমপুর, পাথারিয়া ও সাগরনাল বনে এসব হনুমান টিকে আছে।

বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল, বিশেষ করে লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি, পাবলাখালি ও কাপ্তাইয়ের বনেও চশমাপরা হনুমানের দেখা মেলে। তবে বন ছোট হয়ে যাওয়া এবং ফাঁকা হয়ে পড়ার কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।

চশমাপরা হনুমান (Phayre\'s Leaf Monkey), বৈজ্ঞানিক নাম Trachypithecus phayrei। ফ্যায়র্স ল্যাঙ্গুর (Phayre\'s Langur), কালো হনুমান বা কালা বান্দর নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে এ প্রজাতি মহাবিপন্ন। ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এটি সংরক্ষিত প্রজাতি।

চশমাপরা হনুমানের দেহ তুলনামূলক ছোট, তবে লেজ বড়। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের মাথা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৫৫ থেকে ৬৫ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য ৬৫ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার। গায়ের লোম মেটে বাদামি থেকে কালচে বাদামি। বুক ও পেট সাদাটে। চোখের চারপাশের সাদা লোমের কারণে মনে হয় যেন চোখে চশমা পরে আছে। মুখের রংও সাদা। প্রাপ্তবয়স্ক হনুমানের মাথার লোম বড় হওয়ায় অনেকটা পরচুলা পরা মনে হয়। হাত-পা কালো। বাচ্চাদের গায়ের রং সাদা, গোলাপি ও বাদামির মিশ্রণ।

অন্য অনেক হনুমানের তুলনায় এরা লাজুক। দিনের বেলায় ঘন বনের ছায়াযুক্ত জায়গায় থাকতে পছন্দ করে এবং সহজে মাটিতে নামে না। দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করলেও তাদের সহজে চোখে পড়ে না। সাধারণত একটি পুরুষের নেতৃত্বে বাচ্চাসহ দল চলাফেরা করে।

চশমাপরা হনুমান গাছের কচি পাতা, ফুল, ফল, বীজ, কীটপতঙ্গ ও পাখির ডিম খায়। পানির চাহিদা মেটাতে শিশিরভেজা পাতা চাটে কিংবা পানিবহুল লতাগুল্ম খায়। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল তাদের প্রজননকাল। স্ত্রী হনুমান ১৫০ থেকে ২০০ দিন গর্ভধারণের পর একটি বাচ্চা প্রসব করে। গড়ে প্রতি দুই বছরে একবার বাচ্চা দেয়। চার থেকে পাঁচ মাস বয়স থেকেই বাচ্চারা শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে। পুরুষ পাঁচ থেকে ছয় এবং স্ত্রী তিন থেকে চার বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। এদের আয়ুষ্কাল প্রায় ২০ বছর।

চশমাপরা হনুমান বৃক্ষবাসী। ঘুম, চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ, খেলাধুলা ও বিশ্রাম—সবই গাছে সম্পন্ন করে। সাধারণত একটি শক্তিশালী পুরুষের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫টি হনুমানের দল বিচরণ করে। চিরহরিৎ বনের এই প্রাণী বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।

উল্লুকও কমছে দ্রুত

উল্লুক নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে Primates in Peril প্রতিবেদনে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল—আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম—এবং মিয়ানমারের ইরাবতী ও চিন্দুইন নদীর পশ্চিমাঞ্চলে উল্লুকের বিস্তৃতি রয়েছে।

আবাসস্থল ক্রমাগত ধ্বংস হওয়া, শিকার ও চোরাচালান এ প্রাণীর অস্তিত্বের প্রধান হুমকি। বাংলাদেশ ও ভারতে উল্লুকের সংখ্যা কমছে। তবে মিয়ানমারে এদের সংখ্যা স্থিতিশীল বলে ধরা যায়। প্রজাতিটি আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় রয়েছে। ২০০৮ সালের Primates in Peril তালিকার প্রথম ২৫টি বিপন্ন প্রাইমেটের মধ্যেও উল্লুক ছিল।

২০২০ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে উল্লুকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৬৮টিতে। গবেষণায় আরও বলা হয়, দেশে উল্লুকের বসবাসের উপযোগী বনভূমি আছে মাত্র ২৯৪ বর্গকিলোমিটার।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুন নাহার বলেন, একসময় দেশের ২২টি বনে উল্লুক পাওয়া যেত। এখন ১০টি বন থেকে উল্লুক বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

হাবিবুন নাহারের মতে, আবাসস্থল ধ্বংস, পাচার ও সামাজিক বনায়ন—এই দুই প্রজাতির প্রাইমেটের জন্যই বড় হুমকি। তাঁর ভাষায়, “উল্লুক ও হনুমান গাছের ওপর থাকে। তাদের খাদ্য গাছের পাতা। তাই গাছ না থাকলে তারা টিকে থাকবে না।”

একসময় ২২ বনে, এখন কোথায়?

উল্লুক গিবন (হাইলোবাটিডি) পরিবারের দুটি প্রজাতির প্রাণীর সাধারণ নাম। গিবনজাতীয় প্রাইমেটদের মধ্যে আকারে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম; বৃহত্তম হলো সিয়ামাং। উল্লুকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ থেকে ৯ কেজি।

পুরুষ ও স্ত্রী উল্লুকের আকার প্রায় একই হলেও গায়ের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের গায়ের রং কালো, সঙ্গে রয়েছে সাদা ভ্রু। স্ত্রী উল্লুকের শরীর ধূসর-বাদামি লোমে ঢাকা। গলা ও ঘাড়ের কাছে লোম বেশি কালো। চোখ ও মুখের চারপাশের সাদা লোম অনেকটা মুখোশের মতো দেখায়।

প্রায় ছয় থেকে সাত মাসের গর্ভাবস্থার পর শিশু উল্লুকের জন্ম হয়। জন্মের সময় তাদের গায়ে ঘোলাটে সাদা লোম থাকে। ছয় মাস পর লিঙ্গভেদে সেই লোম কালো অথবা বাদামি-ধূসর রং ধারণ করে। জন্মের আট থেকে নয় বছর পর উল্লুক প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তাদের আয়ুষ্কাল প্রায় ২৫ বছর।

উল্লুক মূলত বিভিন্ন ধরনের ফল ও ডুমুর খায়। পাশাপাশি পতঙ্গ, ফুল ও কচি পাতাও খাদ্যতালিকায় রয়েছে।

এরা সামাজিক প্রাণী এবং পরিবারবদ্ধভাবে বসবাস করে। একটি পরিবারে মা-বাবাসহ তিন-চারটি বা তার বেশি উল্লুক থাকতে পারে। উঁচু গাছের মাথায় থাকতে পছন্দ করে। লম্বা হাত ও পায়ের সাহায্যে এক গাছ থেকে অন্য গাছে চলাচল করে। উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে নিজেদের এলাকা থেকে অন্য উল্লুককে দূরে রাখে এবং পরিবারের সদস্যদের অবস্থান জানান দেয়। নিজেদের এলাকা ও সীমানা রক্ষায় পরিবারগুলোর মধ্যে সীমানা ও খাদ্যের উৎসের অধিকার নিয়ে বিরোধও হয়।

একসময় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের বৃহত্তর সিলেট এবং দক্ষিণ-পূর্বের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনেও উল্লুক দেখা যেত। ভারত, মিয়ানমার ও চীনের কিছু বনাঞ্চলেও এ প্রাণীর বিস্তৃতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখন বিপন্ন উল্লুকের অস্তিত্ব মূলত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া বনাঞ্চলেই টিকে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীজুড়েও এ প্রজাতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। লাউয়াছড়াতেও উল্লুকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।

গত কয়েক বছরে উল্লুকের প্রজাতি শ্রেণিবিন্যাসে বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে।

বন দখলে হারাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আশ্রয়

প্রাইমেট দুটির সংকট শুধু শিকার বা পাচারের কারণে নয়; তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় বনাঞ্চলও ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।

সিলেটের বন বিভাগের প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৪ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার একর বেদখলে রয়েছে। নতুন করেও অনেক জমি বেদখল হচ্ছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জমি বেদখলে থাকলেও তা উদ্ধারে বন বিভাগের তৎপরতা সামান্য—২০২১ সালের ১১ এপ্রিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়।

অবস্থা আরও গুরুতর পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধ দখল ও জনবসতি স্থাপনের কারণে গত অর্ধশত বছরে এ বনাঞ্চলের আয়তন ১ হাজার ১৫২ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে মাত্র ১৩৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। বনভূমির এই সংকোচন বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।

লাউয়াছড়া বনাঞ্চলসহ মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও জুড়ী এবং হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বিভিন্ন সময়ে চশমাপরা হনুমানের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব খবর এসেছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

বন উজাড়, তারপর লোকালয়ে বন্যপ্রাণী

গত পাঁচ দশকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান—যা একসময় ভানুগাছ পাহাড় নামে পরিচিত ছিল—এ একশ্রেণির প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনাঞ্চলে ঢুকে মূল্যবান গাছ ও বাঁশসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ কেটে উজাড় করেছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অনেকে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক এবং পরে জনপ্রতিনিধি ও বড় রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েছেন বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

বন দখল করে বসতি স্থাপন, রিসোর্ট ও চা-বাগান তৈরি এবং বনজ সম্পদ ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীর খাদ্যসংকটও বাড়ছে। খাদ্যের সন্ধানে প্রাণীরা বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে। সেখানে কখনো মানুষের হাতে, আবার কখনো সড়কে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে তারা। অনেক বন্যপ্রাণী মানুষের হাতে ধরাও পড়ছে।

শ্রীমঙ্গল থানার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বাসাবাড়ি, ক্ষেতের ফসল, মাঠ ও ঝোপঝাড়ে বিষাক্ত সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ধরা পড়ার খবর পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন-শ্রীমঙ্গল দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় দুই হাজারের উপর বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে জানা গেছে।

বনের গাছ কমছে, বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে, খাদ্যের উৎস হারাচ্ছে প্রাণীরা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত। উল্লুক ও চশমাপরা হনুমানের বর্তমান পরিস্থিতি সেই সংকটেরই একটি স্পষ্ট চিত্র। যে প্রাণীরা একসময় বাংলাদেশের বিস্তৃত বনাঞ্চলে নিজেদের পরিবার নিয়ে গাছের মগডালে বিচরণ করত, তাদের অস্তিত্ব এখন ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে কয়েকটি বনখণ্ডে। আবাসস্থল রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না হলে এই দুই প্রজাতির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।



বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

ভারতে নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে যারা

প্রকাশিত :  ০৯:০৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছে বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ অর্থ পাঠাতে দুটি পথ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ি ও সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ দুই হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং বেনাপোলের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে। ভারতে অর্থ পৌঁছানোর এই পুরো ব্যবস্থাপনার পেছনে নানকের তিন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি রয়েছেন বলে জানা গেছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিভাবে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যান তা সবিস্তারে বলেছিলেন নানক। সেই বক্তব্য অনুযায়ী ২৪’র ১৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশেই ছিলেন তিনি। ১৬ আগস্ট তামাবিল সীমান্ত হয়ে প্রবেশ করেন ভারতের শিলংয়ে। এরপর মালদা হয়ে চলে যান কলকাতায়। তার পালিয়ে যাওয়ার পুরো পরিকল্পনাটি করেন মেয়ে রাখির স্বামী ডা. নাজমুল। সেই সাক্ষাৎকারে নানক যা তিনি বলেননি তা হলো, কলকাতার অভিজাত তপসিয়া এলাকায় আগে থেকেই ভাড়া করা ছিল বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। কলকাতায় গিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই ওঠেন তিনি। বর্তমানে এই দম্পতিকে মাঝে মধ্যেই দেখা যায় কলকাতার নামিদামি শপিংমলগুলোতে। দেশের মতো বিদেশে পালিয়ে থাকা অবস্থাতেও দামি গাড়িতে চড়া আর বিলাসিতার সবকিছুই ভোগ করছেন তারা। যার জোগান যায় বাংলাদেশ থেকে। প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা বরিশাল আর ঢাকা থেকে নানকের কাছে যায় অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে। 

সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর নানকের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করা এক ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করেন এর সবকিছু। ৫ আগস্টের পর অবশ্য আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। তারপরও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ক্ষমতার সময়ে নানকের কাছ থেকে নানা সুবিধা নেওয়া ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি।

বরিশাল নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সরাসরি ভারতে টাকা যায় নানকের কাছে। এদের একজন হোটেল ব্যবসায়ী। অন্যজন স্বর্ণের ব্যবসার আড়ালে চালান অবৈধ হুন্ডির ব্যবসা। এখানে থাকা বিশাল ভবনসহ অন্যান্য ছোট-বড় বাড়িগুলোর ভাড়া তুলে সরাসরি দিয়ে দেওয়া হয় ওই দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে। তারাই তা পশ্চিমবঙ্গে রুপি আকারে নানকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের একটি বড় অংশও দাপ্তরিক ফাঁক গলে চলে যায় ভারতে। ঢাকায় থাকা ৩টি বাড়িসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আয়ও একইভাবে যায় সেখানে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় বেনাপোল সীমান্তে থাকা একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিককে। ওই মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর যশোরে থাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয় ঢাকা থেকে। এরপর তিনি তার পশ্চিমবঙ্গের এজেন্টের মাধ্যমে রুপি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন নানকের কাছে। ঢাকার আয় পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর বিষয়টি দেখভাল করেন নানকের এক ছোট ভাই।

আওয়ামী শাসনামলের ১৭ বছরে অর্থবিত্তে ফুলেফেঁপে ওঠেন বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর কবির নানক। যদিও তিনি এমপি হয়েছিলেন ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে। ২০০৮’র জাতীয় নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর মিলিয়ে মাত্র ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দেন নানক। ১৬ বছরের ব্যবধানে ২০২৪’র নির্বাচনে হলফনামায় তিনি দুজনের সম্পদের পরিমাণ দেখান ১৯ কোটি টাকা। দুই হলফনামার এই হিসাবে ৩০ গুণ সম্পদ বাড়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি সম্পদ রয়েছে নানক পরিবারের। সেসব সম্পদের মূল্য শত কোটি টাকার বেশি।

বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় নানক দম্পতির মালিকানায় থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’র কথা উল্লেখ করা হয়নি দাখিল করা ওই হলফনামায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যায়ের কোনো হিসাবও দেওয়া হয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। বরিশালের প্রবেশদ্বার দোয়ারিকা সেতু এলাকায় থাকা ৮ একর জমির কথাও কোথাও বলেননি নানক। বরিশাল নগরীতে ২টি বাড়ি ও মাছের খামারসহ ২ একর ২২ শতাংশ ভূ-সম্পত্তির কথা হলফনামায় থাকলেও এসব সম্পত্তির অধিকাংশে যে ছোট-বড় ভবন রয়েছে তার যেমন উল্লেখ নেই, তেমনি এসব ভবন থেকে আসা ভাড়ার কথাও হলফনামা তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বলেননি এই আওয়ামী লীগ নেতা। এর বাইরে ঢাকার কলাবাগান এলাকায় বহুতল ভবনসহ কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে নানকের। 

২৪’র নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় বরিশালে ২টি বাড়ি ছাড়াও রাজধানীর উত্তরায় একটি ৬ তলা ও মোহাম্মদপুরে একটি ৮ তলা বাড়ি থাকার তথ্য দেন নানক। নানকের এসব সম্পদে একটি নখের আঁচড়ও পড়েনি চব্বিশের ৫ আগস্টের পর। বিশেষ করে বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকায় থাকা বাড়িতে একটি ঢিলও ছোড়েনি কেউ। ফলে এসব ভবন যেমন রয়েছে বহাল তবিয়তে, তেমনি ভাড়া বাবদ নিয়মিত আদায় হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। একইভাবে মসৃণ গতিতে চলা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতি মাসে আয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। এর পাশাপাশি বরিশাল নগরীর রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের জমিতে থাকা ছোট-বড় বাসা-বাড়ি থেকেও ভাড়া বাবদ উঠছে মোটা অংকের টাকা। সবমিলিয়ে এই টাকার পরিমাণ প্রতি মাসে কোটিরও বেশি। আর এই পুরো টাকাই হুন্ডি হয়ে চলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে থাকা নানকের কাছে।

পরিচয় না প্রকাশের শর্তে কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মী যুগান্তরকে বলেন, ‘হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া টাকা আনতে বাড়ির বাইরে যেতে হয় না নানককে। নির্ধারিত এজেন্টরা তপসিয়া এলাকার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসেন তা। ৫ আগস্টের পর টানা প্রায় ২ বছর এভাবেই দেখেছি। ওই টাকা দিয়ে রাজকীয় হালে পশ্চিমবঙ্গে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।’ 

এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিচিত সবগুলো ফোন ও মোবাইল নম্বরে ফোন দেওয়া হলে তার সবগুলোই বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি তিনি।



বাংলাদেশ এর আরও খবর