img

ব্যাংকের বাইরে তাকাতে হবে, পুঁজিবাজারকে আর অবহেলা নয়

প্রকাশিত :  ১৩:০৫, ২৩ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৪৯, ২৩ আগষ্ট ২০২৬

ব্যাংকের বাইরে তাকাতে হবে, পুঁজিবাজারকে আর অবহেলা নয়

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকার পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক চিত্র দেখে আশাবাদী হওয়ার চেয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণই বেশি। একটি দিনের বাজারচিত্র কখনো পুরো অর্থনীতির চূড়ান্ত ছবি নয়। কিন্তু বাজারের ভেতরের যে সংকেতগুলো একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। ডিএসইএক্স ৫,৭২২.২১ পয়েন্টে নেমেছে। এক দিনেই সূচক কমেছে ৬৩.৮৭ পয়েন্ট বা ১.১০ শতাংশ। ডিএসইএস কমেছে ১.৩৭ শতাংশ এবং ডিএস৩০ কমেছে ০.৭৯ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৩২২টি কোম্পানির দর কমেছে, বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ৩২টির। অর্থাৎ বাজারের প্রায় প্রতিটি অংশেই বিক্রির চাপ ছিল। বাজারের মোট লেনদেনের মূল্য ছিল প্রায় ৭১১ কোটি টাকা।

এটি শুধু কয়েকটি শেয়ারের দরপতনের গল্প নয়। এটি বিনিয়োগকারীর আস্থা, তারল্য, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ, কোম্পানির মূলধন সংগ্রহ এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলার মতো একটি সংকেত।

প্রশ্নটি তাই খুব সরল। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যদি সত্যিই বিনিয়োগনির্ভর, কর্মসংস্থাননির্ভর এবং বেসরকারি খাতনির্ভর করতে হয়, তাহলে আমরা কি শুধু ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকব?

আমাদের উত্তর হওয়া উচিত, না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। জনসংখ্যা বড়, ভোক্তা বাজার বড়, শিল্পের সম্ভাবনা বড়, উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে এবং অবকাঠামোর প্রয়োজন বাড়ছে। আগামী দিনের বাংলাদেশকে আরও বড় শিল্প, প্রযুক্তি, আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, পরিবহন, রপ্তানি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ প্রয়োজন। সেই অর্থের বড় অংশ যদি কেবল ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে জোগান দিতে হয়, তাহলে একসময় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বেই।

ব্যাংক অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ব্যাংকই পুরো অর্থনীতির একমাত্র অর্থায়নব্যবস্থা হতে পারে না।

পুঁজিবাজারকে সেই জায়গাটিই পূরণ করতে হবে।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে পুঁজিবাজার নিয়ে আলোচনা হলেই অনেক সময় সূচক কত উঠল, কত নামল, কোন শেয়ার কত বাড়ল বা কমল, সেদিকেই দৃষ্টি আটকে যায়। অথচ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারের আসল গুরুত্ব আরও গভীরে। এটি উদ্যোক্তাকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন দেয়, বিনিয়োগকারীর জন্য সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে, ব্যাংকের ওপর ঋণের চাপ কমাতে পারে, করপোরেট গভর্ন্যান্সের মান উন্নত করতে পারে এবং অর্থনীতির সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে নিয়ে যেতে পারে।

সুতরাং পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে বলেছেন, সরকার পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সময়ে সরকার বাজার সংস্কার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও বাজারের দক্ষতা বাড়ানো, মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।

এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাজারে এর প্রতিফলন কতটা দৃশ্যমান?

কারণ বাজার শেষ পর্যন্ত ঘোষণার ভাষা বোঝে না, বাজার ফলাফল বোঝে।

বিনিয়োগকারীও বক্তৃতা শুনে সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি দেখেন, বাজারে কারসাজি হচ্ছে কি না, ভালো কোম্পানি ভালো মূল্যায়ন পাচ্ছে কি না, নিয়ম সবার জন্য সমান কি না, তথ্য প্রকাশ যথাযথ হচ্ছে কি না, অপরাধ করলে শাস্তি হচ্ছে কি না, তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছে কি না এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না।

এই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ পুঁজিবাজারে টাকা আসে আস্থার ওপর। আস্থা চলে গেলে টাকা বসে থাকে। টাকা বসে থাকলে লেনদেন কমে। লেনদেন কমলে তারল্য কমে। তারল্য কমলে ভালো কোম্পানিও বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে অনাগ্রহী হয়। তখন আবার বাজারে ভালো কোম্পানি কম আসে। ফলে বাজার দুর্বল হয়। এটি একটি দুষ্টচক্র।

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে এই দুষ্টচক্রের সঙ্গে লড়ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই চক্র ভাঙবে কীভাবে?

শুধু সূচক বাড়িয়ে নয়।

সূচককে কৃত্রিমভাবে ওপরে তোলা কোনো সমাধান নয়। বাজারকে টেকসইভাবে শক্তিশালী করতে হলে এর ভিত্তি শক্ত করতে হবে। বাজারে ভালো কোম্পানি আনতে হবে। বিনিয়োগকারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। নিরীক্ষার মান বাড়াতে হবে। করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বন্ড মার্কেটকে কার্যকর করতে হবে। মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশি ও দেশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

এগুলো ছাড়া বাজারে সাময়িক উত্থান এলেও সেটি স্থায়ী হবে না।

বর্তমান চার্টের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ৩২২টি কোম্পানির দর কমে যাওয়া এবং মাত্র ৩২টি কোম্পানির দর বাড়া বাজারের বিস্তৃত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। এটি শুধু একটি বা দুটি খাতের সমস্যা নয়। চার্টে ব্যাংক, বিমা, বস্ত্র, ওষুধ ও রসায়ন, প্রকৌশল, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে লাল রঙের আধিক্য দেখা যাচ্ছে।

অর্থাৎ বাজারে ভয় ও অনিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করছে।

এই জায়গায় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীকে তাই পুঁজিবাজারের দিকে আরও বেশি সুনজর দিতে হবে। তবে সেই সুনজর মানে কোনো শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দেওয়া নয়, কোনো সূচককে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী মনে করবেন, তাঁর টাকা একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক বাজারে আছে।

সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হওয়া উচিত, পুঁজিবাজারকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের বাজার না বানিয়ে একটি পেশাদার আর্থিক বাজার হিসেবে গড়ে তোলা।

এখানে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও কম নয়।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২২ মে পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতে সংস্কারের কথা বলেছিলেন এবং দুই মাসের মধ্যে পরিবর্তন দৃশ্যমান হওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সংসদে বলেছেন, সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পুনর্গঠন এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে।

কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানেই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাজারে এখন আর কেবল কথা নয়, কাজের প্রমাণ দরকার।

অর্থমন্ত্রী যদি বলেন পুঁজিবাজার সংস্কার হবে, তাহলে বিনিয়োগকারী জানতে চান, সেই সংস্কারের সময়সীমা কী, কোন কোন আইন পরিবর্তন হবে, কোন প্রতিষ্ঠান কী দায়িত্ব নেবে, কারসাজির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জবাবদিহি কীভাবে বাড়বে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কীভাবে বাজারে আনা হবে, মিউচুয়াল ফান্ড কেন দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না, বন্ড মার্কেট কেন এখনো শক্তিশালী হয়নি, ভালো কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী নয়।

এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর প্রয়োজন।

শুধু বক্তব্য দিয়ে বাজারের আস্থা ফেরানো যায় না।

বাজারে আস্থা ফেরাতে হলে বিনিয়োগকারীকে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে হবে।

এখানে সরকারের জন্য একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারকেও শক্তিশালী করতে হবে। দুটি খাতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির দুটি পরস্পরসম্পূরক স্তম্ভ হিসেবে দেখতে হবে।

ব্যাংক স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের বড় উৎস হবে। উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী শেয়ার বা বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করবেন। এতে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর একক অর্থায়নব্যবস্থার চাপ কমবে।

বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।

কারণ আমাদের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থা প্রধান হয়ে আছে। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোক্তারা ব্যাংকের দিকে তাকান। শিল্প স্থাপনের জন্য ব্যাংকের ঋণ প্রয়োজন। অবকাঠামোর জন্য ব্যাংকের অর্থ প্রয়োজন। ফলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

এর সঙ্গে যদি খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, তারল্য সংকট এবং আমানতকারীর আস্থার প্রশ্ন যুক্ত হয়, তাহলে ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে তাই অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করা ছাড়া বিকল্প নেই।

এখানেই পুঁজিবাজারের গুরুত্ব।

বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ সঞ্চয় করেন। কিন্তু সেই সঞ্চয়ের বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না যায়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত হয়। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

একজন সাধারণ মানুষ তাঁর সঞ্চয় দিয়ে একটি ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনলেন। সেই কোম্পানি নতুন কারখানা করল। কারখানায় শ্রমিক নিয়োগ হলো। উৎপাদন বাড়ল। কর রাজস্ব বাড়ল। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাজ পেল। পরিবহন খাত কাজ পেল। ব্যাংক লেনদেন বাড়ল। ভোক্তার আয় বাড়ল। বাজারে চাহিদা বাড়ল।

অর্থনীতির চাকা এভাবেই ঘোরে।

তাই পুঁজিবাজারকে কেবল বিনিয়োগকারীর লাভক্ষতির জায়গা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এটি কর্মসংস্থানের সঙ্গেও যুক্ত, শিল্পায়নের সঙ্গেও যুক্ত, রাজস্বের সঙ্গেও যুক্ত, উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গেও যুক্ত, দেশের মধ্যবিত্তের সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গেও যুক্ত এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও যুক্ত।

তাহলে প্রশ্ন হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার কেন বারবার আস্থার সংকটে পড়ে?

এর উত্তর এক কথায় দেওয়া যাবে না। তবে বাজারের ইতিহাসে কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, অপর্যাপ্ত জবাবদিহি, তথ্যের অসমতা, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং নীতির অনিশ্চয়তা বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

এই সমস্যাগুলো দূর না করলে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে পারবে না।

বর্তমান সরকার যদি সত্যিই বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে চায়, তাহলে এখনই একটি সুস্পষ্ট জাতীয় পুঁজিবাজার কৌশল ঘোষণা করা প্রয়োজন।

প্রথম কাজ হতে পারে বাজারের আস্থার সংকট দূর করা।

যারা অতীতে কারসাজি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, দ্রুত ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সেটি যেন প্রতিহিংসা বা নির্বাচিত কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি না হয়। তদন্ত হতে হবে প্রমাণভিত্তিক। আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। বাজারের বড় খেলোয়াড় এবং ছোট বিনিয়োগকারী, উভয়ের জন্য একই নিয়ম থাকতে হবে।

দ্বিতীয় কাজ হলো, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির পথ সহজ করা।

আজকের বাংলাদেশের বড় বড় কোম্পানির অনেকগুলোরই পুঁজিবাজারের বাইরে। তারা ব্যাংক, বিদেশি অর্থায়ন বা নিজস্ব মূলধনের ওপর নির্ভর করে। কেন তারা বাজারে আসতে চায় না, সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে খুঁজতে হবে।

শুধু কোম্পানিকে বলা যথেষ্ট নয় যে, পুঁজিবাজারে আসুন; কেন আসবে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয় কাজ হলো, বন্ড মার্কেটকে কার্যকর করা।

শুধু শেয়ারবাজার দিয়ে একটি আধুনিক অর্থনীতি চলে না। দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো, শিল্প ও করপোরেট অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এই বাজারের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখনো সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

চতুর্থ কাজ হলো, মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করা।

সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে প্রতিটি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসায়িক মডেল, নগদ প্রবাহ, মূল্যায়ন ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। একটি শক্তিশালী মিউচুয়াল ফান্ড খাত সেই কাজটি করতে পারে। কিন্তু এ জন্য ফান্ড ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পঞ্চম কাজ হলো, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো।

বাংলাদেশের বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, বিমা কোম্পানি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়লে বাজারের গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়নের মানও বাড়বে।

ষষ্ঠ কাজ হলো, করব্যবস্থাকে পুঁজিবাজারবান্ধব করা।

এখানে সরকারের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন। কর সুবিধা দিয়ে বাজারকে কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে তোলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অতিরিক্ত করভার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

সপ্তম কাজ হলো, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো।

আধুনিক পুঁজিবাজারে বাজার কারসাজি শনাক্ত করার জন্য উন্নত ডেটা অ্যানালিটিকস, অ্যালগরিদমিক নজরদারি এবং রিয়েলটাইম মনিটরিং প্রয়োজন। কোনো একটি শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে কি না, একই ধরনের হিসাব থেকে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে কি না, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমন্বিতভাবে লেনদেন করছে কি না, এসব বিষয় দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। বাংলাদেশকেও সেই পথে যেতে হবে।

অষ্টম কাজ হলো, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করা।

বিনিয়োগকারী যদি কোম্পানির আর্থিক তথ্য বিশ্বাস না করেন, তাহলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তৈরি হবে না। তাই নিরীক্ষা, তথ্য প্রকাশ, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি এবং সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোরতা দরকার।

নবম কাজ হলো, বিনিয়োগকারীদের আর্থিকভাবে শিক্ষিত করা।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ মানেই দ্রুত ধনী হয়ে যাওয়া নয়; এটি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও বিনিয়োগকারীদের জেনে ও বুঝে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিচ্ছে।

সরকারকে বিনিয়োগকারীর আর্থিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টিপস এবং কৃত্রিম প্রচারণার ওপর নির্ভর না করে কোম্পানির মৌলভিত্তি দেখে বিনিয়োগ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

দশম কাজ হলো, পুঁজিবাজারকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় আনা।

এখানেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নেতৃত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

কারণ পুঁজিবাজার কেবল বিএসইসির বিষয় নয়; এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিষয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিষয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতির বিষয়।

একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হলে সরকারের সব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় দরকার।

প্রধানমন্ত্রী যদি একটি উচ্চপর্যায়ের পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটি গঠন করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজের অগ্রগতি প্রকাশ করেন, তাহলে বাজারে ইতিবাচক সংকেত যেতে পারে। সেই কমিটিতে বাজারের অভিজ্ঞ পেশাজীবী, অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, স্টক এক্সচেঞ্জ, বিএসইসি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের রাখা যেতে পারে।

তবে কমিটি করলেই হবে না; কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।

এখানেই অতীতের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

বাংলাদেশে কমিটির অভাব নেই, রিপোর্টের অভাব নেই, সংস্কারের ঘোষণারও অভাব নেই। সমস্যা হলো বাস্তবায়নে।

অর্থমন্ত্রী নিজেই পুঁজিবাজার সংস্কারের সময়সীমা নিয়ে কথা বলেছেন। এখন সেই সময়সীমার বাস্তব ফল বাজার দেখতে চায়।

অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি কোম্পানি অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন।

সুতরাং তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশাও বেশি।

এই প্রত্যাশা ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রীয়।

কারণ একজন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে বাজারের প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু প্রত্যাশা তৈরি হওয়ার পর যদি বাস্তব পরিবর্তন দৃশ্যমান না হয়, তাহলে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

তাই এখন আর কথার সময় নয়, কাজের সময়।

একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আমাদের প্রত্যাশা পরিষ্কার।

পুঁজিবাজারে সুনজর দেওয়া মানে কোনো শেয়ারের দাম বাড়ানো নয়, কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়া নয়, কোনো সূচককে প্রশাসনিকভাবে ধরে রাখা নয়; বরং সুনজর দেওয়ার অর্থ হলো, বাজারকে স্বাধীন, স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও আইনভিত্তিক করা।

একজন ছোট বিনিয়োগকারী যেন মনে করেন, তাঁর সঙ্গে অন্যায় হলে তিনি প্রতিকার পাবেন।

একজন ভালো উদ্যোক্তা যেন মনে করেন, বাজারে এলে তিনি ন্যায্য মূল্যায়ন পাবেন।

একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যেন মনে করেন, বাংলাদেশে তাঁর বিনিয়োগের জন্য নিয়ম পূর্বানুমানযোগ্য।

একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি যেন জানে, তার পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে।

একজন কারসাজিকারী যেন জানেন, বাজারে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

এই পাঁচটি নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারলেই পুঁজিবাজারের ভিত্তি শক্ত হবে।

আর তখনই বাজারের সূচকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বাজারের মান।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এখন একটি নতুন পর্যায়ে যেতে হবে। আমরা শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি নিয়ে সামনে এগোতে পারব না। একটি আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির জন্য ব্যাংক, পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট, বিমা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং অন্যান্য অর্থায়নব্যবস্থাকে একসঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে।

বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশও সেই পথ থেকে বাইরে থাকতে পারে না; বরং এখন সময় এসেছে পুঁজিবাজারকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ করার।

আজকের চার্ট তাই কেবল একটি লাল দিনের ছবি নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা।

৩২২টি কোম্পানির দর কমে যাওয়া এবং মাত্র ৩২টির দর বাড়া আমাদের বলে দেয়, বাজারে ব্যাপক বিক্রির চাপ আছে। সূচকের ১.১০ শতাংশ পতন আমাদের বলে দেয়, বিনিয়োগকারীর আস্থায় চাপ আছে। প্রায় ৭১১ কোটি টাকার লেনদেন দেখায়, বাজার পুরোপুরি নিস্তব্ধ নয়; তবে তারল্যের পরিমাণ ও বাজারের বিস্তৃত দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই সংকেতকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই; বরং সংকেতটি কাজে লাগাতে হবে।

সরকারের এখন উচিত বাজারকে ভয় না দেখিয়ে বাজারের ভয় দূর করা, বিনিয়োগকারীকে শুধু আশ্বাস দিয়ে নয়, তাঁর অধিকার নিশ্চিত করে, কোম্পানিকে চাপ দিয়ে নয়, ভালো কোম্পানির জন্য বাজারকে আকর্ষণীয় করে, সূচককে ধরে রেখে নয়, বাজারের ভিত শক্ত করে।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় শত্রু পতন নয়; সবচেয়ে বড় শত্রু হলো আস্থার অভাব।

আবার বাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি সূচকের উচ্চতা নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সামনে তাই একটি বড় সুযোগ রয়েছে। সরকার যদি ব্যাংক খাত সংস্কারের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের গভীর সংস্কার করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির অর্থায়ন কাঠামোই বদলে যেতে পারে।

ব্যাংক থাকবে, কিন্তু ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকবে না।

পুঁজিবাজার থাকবে, কিন্তু সেটি হবে কারসাজির ক্ষেত্র নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্র।

বন্ড মার্কেট থাকবে, কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের নতুন পথ পাবে।

মিউচুয়াল ফান্ড শক্তিশালী হবে, সাধারণ মানুষ পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে, বাজারে স্থিতিশীলতা বাড়বে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, দেশের সঞ্চয় দেশের উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।

এটাই অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর পথ।

শুধু ব্যাংক দিয়ে একটি বড় অর্থনীতিকে টেকসইভাবে চালানো সম্ভব নয়। ব্যাংক প্রয়োজন, কিন্তু ব্যাংকের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারও প্রয়োজন। একটি অর্থনীতির গভীরতা মাপতে শুধু ব্যাংকের ঋণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সক্ষমতাও দেখতে হয়।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা পুরোনো ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কাঠামোতেই আটকে থাকব, নাকি বহুমাত্রিক অর্থায়নব্যবস্থার দিকে এগোব।

আমাদের বিশ্বাস, দ্বিতীয় পথই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

প্রধানমন্ত্রীকে তাই পুঁজিবাজারের দিকে আরও গভীরভাবে তাকাতে হবে।

অর্থমন্ত্রীকে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের দূরত্ব কমাতে হবে।

বিএসইসিকে আরও পেশাদার, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।

স্টক এক্সচেঞ্জকে প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর করতে হবে।

কোম্পানিগুলোকে সুশাসনের মধ্যে আনতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

আর যারা বাজারকে ব্যক্তিগত লাভের ক্ষেত্র বানিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাজারকে বাঁচাতে কৃত্রিম অক্সিজেনের দরকার নেই; দরকার আস্থা, দরকার শাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, দরকার নিয়মের প্রয়োগ, দরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি, দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সবচেয়ে বেশি দরকার বাস্তবায়ন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন স্থবির হয়ে থাকার মতো অবস্থায় নেই। তরুণ জনগোষ্ঠী কাজ চায়, উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে চান, শিল্পপতি ব্যবসা বাড়াতে চান, মধ্যবিত্ত সঞ্চয়ের নিরাপদ ও উৎপাদনশীল জায়গা খুঁজছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারী নীতির স্থিতিশীলতা চান। এই সব চাহিদাকে একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার এক জায়গায় নিয়ে আসতে পারে।

তাই পুঁজিবাজারকে আর অর্থনীতির প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অবকাঠামোর একটি অংশ।

আজ ডিএসইর পর্দায় লাল রঙের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই লাল রঙকে যদি সরকার সতর্কবার্তা হিসেবে নেয়, তাহলে এখান থেকেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ডিএসইএক্সকে আবার ওপরে তোলা নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাজার তৈরি করা, যেখানে ডিএসইএক্স বাড়লে তার পেছনে থাকবে কোম্পানির আয়, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, মুনাফা, করপোরেট সুশাসন এবং অর্থনীতির বাস্তব শক্তি।

সেই বাজারই টেকসই বাজার, সেই বাজারই বিনিয়োগকারীর বাজার, সেই বাজারই শিল্পের বাজার, সেই বাজারই কর্মসংস্থানের বাজার এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাজারই বাংলাদেশের অর্থনীতির বাজার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি এই জায়গাটিতে একটি দৃঢ় রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেন, অর্থমন্ত্রী যদি কথার সঙ্গে বাস্তব সংস্কারের গতি বাড়ান এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কঠোর কিন্তু ন্যায়সংগতভাবে আইন প্রয়োগ করে, তাহলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নতুন আস্থার ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে।

অর্থনীতির চাকা তখন শুধু ব্যাংকের ঋণে নয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, পুঁজিবাজার ও উদ্যোক্তার সম্মিলিত শক্তিতে ঘুরবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন সেই পথেই হাঁটার সময়।

কারণ পুঁজিবাজারকে বাঁচানো মানে শুধু শেয়ারবাজারকে বাঁচানো নয়; পুঁজিবাজারকে সচল করা মানে দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দরজা খুলে দেওয়া।

আর সেই দরজা যত দ্রুত খুলবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তত দ্রুত নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি হবে।

এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজ, ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন, সূচকের চেয়ে আস্থা। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে পুঁজিবাজারকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়া।

img

পুঁজিবাজারকে বাদ দিয়ে অর্থনীতির চাকা ঘোরে না

প্রকাশিত :  ১৬:০৬, ২৩ আগষ্ট ২০২৬

✍️ সম্পাদকীয় কলাম

অর্থনীতি চাঙা করার কথা উঠলেই আমাদের আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকে ব্যাংক, ঋণ, সুদহার, আমদানি, রপ্তানি আর সরকারি ব্যয়। এসবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই আলোচনার বাইরে যদি পুঁজিবাজারকে রেখে দেওয়া হয়, তাহলে অর্থনীতির পুরো ছবিটা আর দেখা হয় না।

একটি দেশের অর্থনীতি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। ব্যাংক তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, পুঁজিবাজার আরেকটি। একটিকে শক্তিশালী করে অন্যটিকে দুর্বল রেখে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। বরং পুঁজিবাজারকে বাদ দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা অনেকটা একটি চাকা খুলে রেখে গাড়ি চালানোর মতো। কিছুটা পথ হয়তো এগোনো যাবে, কিন্তু সেই যাত্রা কতটা স্থায়ী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

অর্থনীতির মূল শক্তি বিনিয়োগ। আর বিনিয়োগের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান আস্থা। যেখানে বিনিয়োগকারীর আস্থা নেই, সেখানে নতুন মূলধন আসে না। উদ্যোক্তা ঝুঁকি নিতে চান না। ব্যবসা সম্প্রসারণের সাহস কমে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

পুঁজিবাজার সেই বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে শুধু শেয়ার কেনাবেচা হয় না। একটি কোম্পানি যখন বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে, তখন সেই অর্থ দিয়ে কারখানা বাড়াতে পারে, নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে। অর্থাৎ একটি সক্রিয় পুঁজিবাজারের সঙ্গে দেশের বাস্তব অর্থনীতির সম্পর্ক অনেক গভীর।

ব্যাংকের ভূমিকা অবশ্যই অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি অর্থনীতিতে ব্যাংক অপরিহার্য। কিন্তু শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা ও শিল্পকে দীর্ঘদিন এগিয়ে নেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। ঋণের সঙ্গে থাকে সুদ ও কিস্তির দায়। অন্যদিকে পুঁজিবাজার উদ্যোক্তাকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ দেয়। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সম্ভাবনাময় কোম্পানি পর্যন্ত অনেক ব্যবসার জন্য এই বিকল্প অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণেই এখনো সময় আছে। সরকারকে পুঁজিবাজারের দিকে নতুন করে তাকাতে হবে। শুধু সূচক কত বাড়ল বা কমল, সেই হিসাব দিয়ে বাজারের গুরুত্ব নির্ধারণ করলে চলবে না। বাজারের পেছনে আছে মানুষের সঞ্চয়, পরিবারের স্বপ্ন, উদ্যোক্তার পরিকল্পনা এবং বহু মানুষের জীবিকা।

পুঁজিবাজারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক পরিবার জড়িত। সংশ্লিষ্ট মহলে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ পরিবার কোনো না কোনোভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। একটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা গড়ে চারজন ধরে হিসাব করলে এই খাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা কয়েক দশক লাখে পৌঁছে যায়। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি সংসার, একটি প্রত্যাশা।

একজন ছোট বিনিয়োগকারী যখন নিজের জমানো টাকা বাজারে বিনিয়োগ করেন, তখন তাঁর কাছে সেটি শুধু একটি শেয়ার নয়। সেটি হয়তো সন্তানের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ। হয়তো অবসরের নিরাপত্তা। হয়তো একটি ছোট ব্যবসা শুরু করার পুঁজি। কিংবা কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর শেষ ভরসা।

তাই বাজারে দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সংকট তৈরি হলে ক্ষতিটা শুধু হিসাবের খাতায় থাকে না। তার অভিঘাত পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে।

পুঁজিবাজারের সঙ্গে শুধু বিনিয়োগকারীরাই যুক্ত নন। ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা বিভাগ, অডিট, আইন, তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যমসহ নানা পেশার মানুষের কর্মসংস্থানও এই বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাজারের কর্মকাণ্ড যখন সংকুচিত হয়, তখন এর প্রভাব ধীরে ধীরে এসব ক্ষেত্রেও পড়ে।

অথচ পুঁজিবাজার নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনো এক ধরনের সংকীর্ণতা আছে। বাজার মানেই যেন শেয়ার কেনাবেচা, সূচকের ওঠানামা আর মুনাফার হিসাব। বাস্তবতা আরও বড়। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দেশের শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।

তবে সেই বাজার শক্তিশালী করতে হলে শুধু প্রণোদনা দিলেই হবে না। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীকে বিশ্বাস করতে হবে, বাজারে নিয়ম সবার জন্য সমান। কারসাজি করে কেউ পার পেয়ে যাবে না। গোপন তথ্য ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে এবং দুর্বল কোম্পানির দায়ও যথাযথভাবে নির্ধারিত হবে।

এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদনকে নির্ভরযোগ্য করতে হবে। করপোরেট সুশাসন শক্তিশালী করতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীর অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে বাজারে ভালো কোম্পানি আনার উদ্যোগও জরুরি। দেশের বড় বড় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ যদি পুঁজিবাজারে আসে, তাহলে বাজারের গভীরতা বাড়বে। বিনিয়োগকারীর সামনে ভালো বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। কোম্পানিগুলোও ব্যাংকঋণের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে।

সরকারের দেওয়া প্রণোদনাও তাই হতে হবে বাজারের ভিত্তি শক্ত করার জন্য। কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়িয়ে সাময়িক স্বস্তি তৈরি করলে কোনো লাভ নেই। বাজারকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখারও কোনো কারণ নেই। বরং তাদের পাশাপাশি এগোতে হবে। ব্যাংক অর্থনীতির স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, পুঁজিবাজার দেবে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের সুযোগ। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারলে অর্থনীতির ভিত আরও শক্ত হবে।

কোনো ব্যবসা যদি বছরের পর বছর শুধু ব্যাংকঋণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার ওপর ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। সুদ ও কিস্তির চাপ অনেক সময় ব্যবসার সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত করে। বিশেষ করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রয়োজন হয়। সেই জায়গায় একটি কার্যকর পুঁজিবাজার উদ্যোক্তার জন্য বড় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

তাই ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করার যে কোনো জাতীয় পরিকল্পনায় পুঁজিবাজারকে পাশে রাখতে হবে। পুঁজিবাজারকে অবহেলা করে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করলে সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুপস্থিত থেকে যাবে।

আমাদের মনে রাখা দরকার, অর্থনীতির শক্তি শুধু বড় বাজেট, বড় ঋণ বা বড় সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতির আসল শক্তি মানুষের আস্থা এবং বিনিয়োগের সাহসে। একজন মানুষ যখন নিজের সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে ভয় পান, তখন সেটি শুধু একজন বিনিয়োগকারীর সমস্যা নয়। এটি অর্থনীতির জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট তাই হয়তো টাকার নয়, বিশ্বাসের। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থের প্রবাহও ফিরবে। নতুন বিনিয়োগকারী আসবেন। উদ্যোক্তা সাহস পাবেন। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মধ্যে অর্থের প্রবাহও বাড়বে।

এখনো দেরি হয়ে যায়নি। সরকার চাইলে নীতিগত উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কার্যকর প্রণোদনার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে সেই উদ্যোগ হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক। এক দিনের সিদ্ধান্ত দিয়ে বহু বছরের আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব নয়।

অর্থনীতির একটি চাকা শক্তিশালী আর অন্যটি দুর্বল রেখে অনেক দূর যাওয়া যায় না। ব্যাংককে শক্তিশালী করতে হবে, একই সঙ্গে পুঁজিবাজারকেও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তার অর্থায়নের পথগুলো বহুমুখী হয় এবং বিনিয়োগের জন্য মানুষের আস্থা থাকে।

পুঁজিবাজারকে তাই আর অবহেলার জায়গায় রাখা উচিত নয়। এখানে শুধু টাকা ঘোরে না, মানুষের স্বপ্নও ঘোরে। এখানে শুধু কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা হয় না, উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎও তৈরি হয়। একটি বিনিয়োগের সঙ্গে একটি পরিবারের আশা জড়িয়ে থাকে। একটি কোম্পানির সম্প্রসারণের সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে থাকে।

অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে চাঙা করতে হলে সেই স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের হাতও শক্ত করে ধরতে হবে। কারণ অর্থনীতির চাকা দুটোই নিয়ে ঘোরে। একটি দুর্বল থাকলে অন্যটির শক্তিও একসময় সীমিত হয়ে পড়ে।

এখনো সময় আছে। প্রশ্ন শুধু, আমরা সেই সময়টাকে কাজে লাগাতে পারব কি না।

অর্থনীতি এর আরও খবর