img

পুঁজিবাজারকে বাদ দিয়ে অর্থনীতির চাকা ঘোরে না

প্রকাশিত :  ১৬:০৬, ২৩ আগষ্ট ২০২৬

✍️ সম্পাদকীয় কলাম

পুঁজিবাজারকে বাদ দিয়ে অর্থনীতির চাকা ঘোরে না
অর্থনীতি চাঙা করার কথা উঠলেই আমাদের আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকে ব্যাংক, ঋণ, সুদহার, আমদানি, রপ্তানি আর সরকারি ব্যয়। এসবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই আলোচনার বাইরে যদি পুঁজিবাজারকে রেখে দেওয়া হয়, তাহলে অর্থনীতির পুরো ছবিটা আর দেখা হয় না।

একটি দেশের অর্থনীতি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। ব্যাংক তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, পুঁজিবাজার আরেকটি। একটিকে শক্তিশালী করে অন্যটিকে দুর্বল রেখে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। বরং পুঁজিবাজারকে বাদ দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা অনেকটা একটি চাকা খুলে রেখে গাড়ি চালানোর মতো। কিছুটা পথ হয়তো এগোনো যাবে, কিন্তু সেই যাত্রা কতটা স্থায়ী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

অর্থনীতির মূল শক্তি বিনিয়োগ। আর বিনিয়োগের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান আস্থা। যেখানে বিনিয়োগকারীর আস্থা নেই, সেখানে নতুন মূলধন আসে না। উদ্যোক্তা ঝুঁকি নিতে চান না। ব্যবসা সম্প্রসারণের সাহস কমে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

পুঁজিবাজার সেই বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে শুধু শেয়ার কেনাবেচা হয় না। একটি কোম্পানি যখন বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে, তখন সেই অর্থ দিয়ে কারখানা বাড়াতে পারে, নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে। অর্থাৎ একটি সক্রিয় পুঁজিবাজারের সঙ্গে দেশের বাস্তব অর্থনীতির সম্পর্ক অনেক গভীর।

ব্যাংকের ভূমিকা অবশ্যই অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি অর্থনীতিতে ব্যাংক অপরিহার্য। কিন্তু শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা ও শিল্পকে দীর্ঘদিন এগিয়ে নেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। ঋণের সঙ্গে থাকে সুদ ও কিস্তির দায়। অন্যদিকে পুঁজিবাজার উদ্যোক্তাকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ দেয়। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সম্ভাবনাময় কোম্পানি পর্যন্ত অনেক ব্যবসার জন্য এই বিকল্প অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণেই এখনো সময় আছে। সরকারকে পুঁজিবাজারের দিকে নতুন করে তাকাতে হবে। শুধু সূচক কত বাড়ল বা কমল, সেই হিসাব দিয়ে বাজারের গুরুত্ব নির্ধারণ করলে চলবে না। বাজারের পেছনে আছে মানুষের সঞ্চয়, পরিবারের স্বপ্ন, উদ্যোক্তার পরিকল্পনা এবং বহু মানুষের জীবিকা।

পুঁজিবাজারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক পরিবার জড়িত। সংশ্লিষ্ট মহলে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ পরিবার কোনো না কোনোভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। একটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা গড়ে চারজন ধরে হিসাব করলে এই খাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা কয়েক দশক লাখে পৌঁছে যায়। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি সংসার, একটি প্রত্যাশা।

একজন ছোট বিনিয়োগকারী যখন নিজের জমানো টাকা বাজারে বিনিয়োগ করেন, তখন তাঁর কাছে সেটি শুধু একটি শেয়ার নয়। সেটি হয়তো সন্তানের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ। হয়তো অবসরের নিরাপত্তা। হয়তো একটি ছোট ব্যবসা শুরু করার পুঁজি। কিংবা কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর শেষ ভরসা।

তাই বাজারে দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সংকট তৈরি হলে ক্ষতিটা শুধু হিসাবের খাতায় থাকে না। তার অভিঘাত পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে।

পুঁজিবাজারের সঙ্গে শুধু বিনিয়োগকারীরাই যুক্ত নন। ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা বিভাগ, অডিট, আইন, তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যমসহ নানা পেশার মানুষের কর্মসংস্থানও এই বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাজারের কর্মকাণ্ড যখন সংকুচিত হয়, তখন এর প্রভাব ধীরে ধীরে এসব ক্ষেত্রেও পড়ে।

অথচ পুঁজিবাজার নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনো এক ধরনের সংকীর্ণতা আছে। বাজার মানেই যেন শেয়ার কেনাবেচা, সূচকের ওঠানামা আর মুনাফার হিসাব। বাস্তবতা আরও বড়। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দেশের শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।

তবে সেই বাজার শক্তিশালী করতে হলে শুধু প্রণোদনা দিলেই হবে না। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীকে বিশ্বাস করতে হবে, বাজারে নিয়ম সবার জন্য সমান। কারসাজি করে কেউ পার পেয়ে যাবে না। গোপন তথ্য ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে এবং দুর্বল কোম্পানির দায়ও যথাযথভাবে নির্ধারিত হবে।

এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদনকে নির্ভরযোগ্য করতে হবে। করপোরেট সুশাসন শক্তিশালী করতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীর অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে বাজারে ভালো কোম্পানি আনার উদ্যোগও জরুরি। দেশের বড় বড় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ যদি পুঁজিবাজারে আসে, তাহলে বাজারের গভীরতা বাড়বে। বিনিয়োগকারীর সামনে ভালো বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। কোম্পানিগুলোও ব্যাংকঋণের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে।

সরকারের দেওয়া প্রণোদনাও তাই হতে হবে বাজারের ভিত্তি শক্ত করার জন্য। কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়িয়ে সাময়িক স্বস্তি তৈরি করলে কোনো লাভ নেই। বাজারকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখারও কোনো কারণ নেই। বরং তাদের পাশাপাশি এগোতে হবে। ব্যাংক অর্থনীতির স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, পুঁজিবাজার দেবে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের সুযোগ। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারলে অর্থনীতির ভিত আরও শক্ত হবে।

কোনো ব্যবসা যদি বছরের পর বছর শুধু ব্যাংকঋণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার ওপর ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। সুদ ও কিস্তির চাপ অনেক সময় ব্যবসার সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত করে। বিশেষ করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রয়োজন হয়। সেই জায়গায় একটি কার্যকর পুঁজিবাজার উদ্যোক্তার জন্য বড় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

তাই ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করার যে কোনো জাতীয় পরিকল্পনায় পুঁজিবাজারকে পাশে রাখতে হবে। পুঁজিবাজারকে অবহেলা করে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করলে সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুপস্থিত থেকে যাবে।

আমাদের মনে রাখা দরকার, অর্থনীতির শক্তি শুধু বড় বাজেট, বড় ঋণ বা বড় সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতির আসল শক্তি মানুষের আস্থা এবং বিনিয়োগের সাহসে। একজন মানুষ যখন নিজের সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে ভয় পান, তখন সেটি শুধু একজন বিনিয়োগকারীর সমস্যা নয়। এটি অর্থনীতির জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট তাই হয়তো টাকার নয়, বিশ্বাসের। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থের প্রবাহও ফিরবে। নতুন বিনিয়োগকারী আসবেন। উদ্যোক্তা সাহস পাবেন। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মধ্যে অর্থের প্রবাহও বাড়বে।

এখনো দেরি হয়ে যায়নি। সরকার চাইলে নীতিগত উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কার্যকর প্রণোদনার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে সেই উদ্যোগ হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক। এক দিনের সিদ্ধান্ত দিয়ে বহু বছরের আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব নয়।

অর্থনীতির একটি চাকা শক্তিশালী আর অন্যটি দুর্বল রেখে অনেক দূর যাওয়া যায় না। ব্যাংককে শক্তিশালী করতে হবে, একই সঙ্গে পুঁজিবাজারকেও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তার অর্থায়নের পথগুলো বহুমুখী হয় এবং বিনিয়োগের জন্য মানুষের আস্থা থাকে।

পুঁজিবাজারকে তাই আর অবহেলার জায়গায় রাখা উচিত নয়। এখানে শুধু টাকা ঘোরে না, মানুষের স্বপ্নও ঘোরে। এখানে শুধু কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা হয় না, উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎও তৈরি হয়। একটি বিনিয়োগের সঙ্গে একটি পরিবারের আশা জড়িয়ে থাকে। একটি কোম্পানির সম্প্রসারণের সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে থাকে।

অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে চাঙা করতে হলে সেই স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের হাতও শক্ত করে ধরতে হবে। কারণ অর্থনীতির চাকা দুটোই নিয়ে ঘোরে। একটি দুর্বল থাকলে অন্যটির শক্তিও একসময় সীমিত হয়ে পড়ে।

এখনো সময় আছে। প্রশ্ন শুধু, আমরা সেই সময়টাকে কাজে লাগাতে পারব কি না।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারে ধস: বিনিয়োগকারীরা কি সরকারের কাছে অপ্রয়োজনীয়?

প্রকাশিত :  ১৪:২১, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯৭ পয়েন্টের পতন শুধু সূচকের হিসাব নয়, এটি আস্থার সংকেত। নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের, এখন সেই প্রত্যাশার জায়গায় জমছে হতাশা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দিকে তাকালে এখন একটি দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সংখ্যাগুলো নিচের দিকে যাচ্ছে, আর মানুষের আস্থা তার চেয়েও দ্রুত কমছে।

ডিএসইএক্সের প্রায় ৯৭ পয়েন্ট পতন হয়তো বাজারের এক দিনের হিসাব। কিন্তু এই পতনের অভিঘাত কেবল একটি সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পোর্টফোলিও, লাখো মানুষের সঞ্চয় এবং বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

পুঁজিবাজারকে তাই শুধু শেয়ারের দামের ওঠানামার জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যে অর্থ প্রবাহিত হয়, তার সঙ্গে মানুষের শ্রম, সঞ্চয়, স্বপ্ন এবং নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে।

এই জায়গাতেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে।

সরকার কি সত্যিই পুঁজিবাজারের সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে?

প্রশ্নটি রাজনৈতিকও, অর্থনৈতিকও। কারণ বাজারের প্রতিটি দিনের পতনের জন্য সরকারকে দায়ী করা যায় না। শেয়ারের দাম বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ, কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাসহ বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু একটি বাজার দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়লে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে রাষ্ট্র তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সূচক কৃত্রিমভাবে ওপরে তুলে রাখা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে নিয়ম কার্যকর, আইন সবার জন্য সমান এবং বিনিয়োগকারীরা জানেন যে তাঁদের অর্থের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সংকট সবচেয়ে গভীর।

প্রত্যাশা ছিল, হতাশা কেন?

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নতুন আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনীতিতে গতি আসবে। ব্যবসা বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং তার প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারেও।

এই প্রত্যাশা অমূলক ছিল না।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য কার্যকর পুঁজিবাজার প্রয়োজন। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে, সাধারণ মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে, এটাই একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক কাঠামো।

কিন্তু বাস্তবতা এখন বিনিয়োগকারীদের অনেককে হতাশ করছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুঁজিবাজার রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

এই ধারণা সত্য কি না, সেটি সরকারেরই পরিষ্কার করা উচিত।

কারণ নীরবতা অনেক সময় সন্দেহকে আরও বড় করে তোলে।

৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের প্রশ্ন

বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও পুঁজিবাজারের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই মানুষগুলো কেবল বিনিয়োগকারী নন। তাঁরা বাবা, মা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং তরুণ প্রজন্মের সদস্য।

কারও বিনিয়োগ সন্তানের শিক্ষার জন্য। কারও অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য। কেউ ব্যবসার লাভের অর্থ বাজারে রেখেছেন। কেউ হয়তো চাকরির পাশাপাশি বছরের পর বছর সামান্য করে সঞ্চয় করেছেন।

একটি শেয়ারের দাম যখন ১০ টাকা কমে যায়, তখন বাজারের পর্দায় সেটি শুধু একটি সংখ্যা।

কিন্তু কোনো পরিবারের কাছে সেই ১০ টাকার পতন হয়তো কয়েক মাসের সঞ্চয়ের সমান।

এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন

পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে কি এই বাজারের জন্য একটি সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগ নিতে পারেন না?

অবশ্যই পারেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নিয়ে একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। বাজার কারসাজি প্রতিরোধ, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নত করা, মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারের জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।

প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটিও গঠন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, উদ্যোগটি কোথায়?

একটি নির্বাচিত সরকারকে প্রতিটি বাজার পতনের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। কিন্তু বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট নিয়ে একটি নীতিগত অবস্থান জানানো তার দায়িত্ব।

বিনিয়োগকারীরা অন্তত জানতে চান, সরকার সমস্যাটি দেখছে কি না এবং দেখলে কী করতে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর সামনে বড় পরীক্ষা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজারের সঙ্গে অপরিচিত নন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ইতিহাস রয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর প্রতি প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর সামনে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির হিসাব নেই। রয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও।

এখন প্রয়োজন একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ।

কোন সংস্কার আগে হবে? কোনটি পরে? বাজার কারসাজি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে কী প্রণোদনা থাকবে? সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্যে নয়, কার্যকর নীতির মাধ্যমে দিতে হবে।

অর্থনীতি পরিচালনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। আর আস্থা তৈরি হয় কথায় নয়, ধারাবাহিক ফলাফলে।

বিএসইসির সাফল্যের মাপকাঠি কী?

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এর দায়িত্ব শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের সুযোগই সীমিত হয়ে আসে।

বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, বাজারের সুশাসন শক্তিশালী করা এবং মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে।

কিন্তু বাজার শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের মূল্যায়ন করে ফল দিয়ে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কারসাজি কি কমেছে? বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কি দ্রুত হচ্ছে? দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি দৃশ্যমান? তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন কি উন্নত হচ্ছে? বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা কি বেড়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তরই বিএসইসির কার্যকারিতার প্রকৃত মাপকাঠি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে। দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হবে না।

প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত বিচার এবং আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ।

সূচক নয়, আস্থা বাঁচাতে হবে

সরকারের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন।

পুঁজিবাজারের সূচক কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের নয়।

সূচক কমবে, বাড়বে। বাজারে ঝুঁকি থাকবে। বিনিয়োগে লাভ যেমন থাকবে, ক্ষতিও থাকবে।

সরকারের দায়িত্ব হলো ন্যায্য খেলার মাঠ তৈরি করা।

কেউ বাজার কারসাজি করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

কোনো কোম্পানি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে তার পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহি করতে হবে।

কেউ অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নিলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কোনো দুর্বল কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেললে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো না থাকলে কোনো বাজার দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না।

সরকার বিনিয়োগকারীদের লাভের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কিন্তু ন্যায্য বাজারের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সংখ্যার পেছনের মানুষগুলো কোথায়?

বাজারের দৈনিক প্রতিবেদনে আমরা বলি, সূচক এত পয়েন্ট কমেছে। বাজার মূলধন এত কোটি টাকা কমেছে। লেনদেন হয়েছে এত টাকা।

কিন্তু সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষটির গল্প কোথায়?

একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়তো জীবনের শেষ সঞ্চয় নিয়ে বাজারে এসেছেন।

একজন তরুণ হয়তো ভেবেছেন, বেতনের সামান্য অংশ বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়তো ব্যবসার মুনাফা বাজারে রেখেছেন।

তাঁদের প্রত্যেকের কাছে পুঁজিবাজারের অর্থ আলাদা।

কারও কাছে এটি স্বপ্ন। কারও কাছে নিরাপত্তা। কারও কাছে শেষ আশ্রয়।

তাই বাজারের পতনকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে অর্থনীতির মানবিক বাস্তবতাটি হারিয়ে যায়।

এখনই সংস্কারের সময়

সরকার চাইলে বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগে পরিণত করতে পারে।

একটি সময়বদ্ধ পুঁজিবাজার সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করা যেতে পারে। বিএসইসির নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যেতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে কঠোরতা আনা যেতে পারে।

বাজার কারসাজির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।

ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য নীতিগত প্রণোদনা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দরকার।

আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ শুরু করা জরুরি।

কারণ যে বাজারে বিনিয়োগকারীরা কথা বলার সুযোগ পান না, সেই বাজারে আস্থা স্থায়ী হয় না।

দায় কার?

আজকের পুঁজিবাজারের সব সমস্যার দায় কোনো একজন ব্যক্তির নয়। বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের।

দুর্বল সুশাসন, নীতিগত অসঙ্গতি, বাজার কারসাজির অভিযোগ, মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান সরকার দায়মুক্ত।

কারণ সরকার পুরোনো সমস্যার উত্তরাধিকার গ্রহণ করার পাশাপাশি সেগুলো সমাধানের দায়িত্বও গ্রহণ করে।

একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তাই খুব বেশি কিছু নয়।

তাঁরা লাভের নিশ্চয়তা চান না।

তাঁরা শুধু চান, আইন যেন সবার জন্য সমান হয়।

তাঁরা চান, কারসাজি যেন শাস্তি পায়।

তাঁরা চান, ভালো কোম্পানি যেন বাজারে আসে।

তাঁরা চান, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান যেন কার্যকর হয়।

তাঁরা চান, তাঁদের সঞ্চয় যেন নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পায়।

এখন উত্তর দেওয়ার সময়

ডিএসইএক্সের ৯৭ পয়েন্ট পতন একটি দিনের ঘটনা হতে পারে।

কিন্তু আস্থার পতন এক দিনের নয়।

আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে। ভাঙতে লাগে খুব অল্প সময়। একটি বাজারে মানুষ একবার বিশ্বাস হারালে তা ফিরিয়ে আনা শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয় থাকে না, এটি হয়ে ওঠে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সরকার চাইলে এখনো পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিষয়টিকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে আনতে পারেন। অর্থমন্ত্রী চাইলে একটি স্পষ্ট সংস্কার রোডম্যাপ দিতে পারেন। বিএসইসি চাইলে কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত।

প্রয়োজন সমন্বয়।

প্রয়োজন জবাবদিহি।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধু সূচকের দিকে তাকিয়ে নেই। তাঁরা তাকিয়ে আছেন রাষ্ট্রের দিকে।

তাঁদের প্রশ্ন, এই বাজার কি সরকারের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?

তাঁদের আরেকটি প্রশ্ন, তাঁদের সঞ্চয়, তাঁদের উদ্বেগ, তাঁদের ক্ষতি এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে কোনো বাস্তব মূল্য বহন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি বিবৃতি দিয়ে দেওয়া যাবে না।

উত্তর দিতে হবে কার্যকর সংস্কারে।

উত্তর দিতে হবে আইনের প্রয়োগে।

উত্তর দিতে হবে দৃশ্যমান জবাবদিহিতে।

কারণ পুঁজিবাজারের সূচক আবার উঠবে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভালো কোম্পানি নতুন করে বাজারে আসতে পারে।

কিন্তু মানুষের আস্থা যদি একবার পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তখন শুধু সূচক বাড়িয়ে সেই ক্ষত পূরণ করা যায় না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় লড়াই পতন ঠেকানোর নয়।

আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই।

আর সেই লড়াইয়ে সরকার যদি নীরব থাকে, ইতিহাসের প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে উঠবে:

যখন বিনিয়োগকারীরা রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্র তাঁদের জন্য কী করেছিল?