img

ঈদুল আজহা ও কুরবানির গুরুত্ব ও তাৎপর্য

প্রকাশিত :  ০৫:৩৭, ০১ আগষ্ট ২০২০

 ঈদুল আজহা ও কুরবানির গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মাওলানা আবু ইসহাক

আজ বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলোতে পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে । সর্বোচ্চ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, যথাযোগ্য মর্যাদা, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ত্যাগের মহিমায় মুসলমানরা ঈদ পালন করবেন। ঈদের দিন সকালে মুসলমানরা বিনম্র হৃদয়ে ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। নামাজ শেষে মহান রব আল্লাহতায়ালার উদ্দেশে পশু কোরবানি দেবেন। আল্লাহর জন্য নিজের জান-মাল ও প্রিয়তম জিনিস সন্তুষ্টচিত্তে বিলিয়ে দেওয়ার এক সুমহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর ঈদুল আজহা ফিরে আসে আমাদের মাঝে।

ঈদুল আজহার গুরুত্ব ও আনন্দ অপরিসীম। উৎসব হিসেবে পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন আর ধর্ম একই সূত্রে গাঁথা। তাই ঈদ শুধু আনন্দের উৎস নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের বৈশিষ্ট্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটাই এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

বিষয়টি আমরা এভাবে দেখতে পারি, এলাকার লোকেরা ঈদের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট ঈদগাহে সমবেত হয়। এতে সবার মধ্যে একাত্মতা ও সম্প্রীতি ফুটে ওঠে এবং ইসলামের মহান ভ্রাতৃত্ববোধে সবাই উদ্দীপ্ত হয়। পরস্পর কোলাকুলির মাধ্যমে সব বিভেদ ভুলে গিয়ে পরস্পর ভাই বলে গৃহীত হয়। ধনী-গরিবের ব্যবধান তখন আর প্রাধান্য পায় না। ঈদের আনন্দ সবাই ভাগ করে নেয়। এর ফলে ধনী-গরিব, শত্রু-মিত্র, আত্মীয়স্বজন সবাই পরস্পর ভ্রাতৃত্বের চেতনায় উদ্বুব্ধ হয়ে থাকে। ঈদ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভোলার জন্য, মানুষের মধ্যে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হওয়ার জন্য পরম মিলনের বাণী নিয়ে আসে। ঈদুল আজহায় যে কোরবানি দেওয়া হয়, তার মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কারণ কোরবানির রক্ত-গোশত কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; শুধু দেখা হয় মানুষের হৃদয়। এই ঈদে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। তাই পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন। এটাই ঈদের শিক্ষা ও সার্থকতা।

কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামী নিদর্শন ও অন্যতম ঐতিহ্য। ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয় বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করাই হলো কোরবানির তাৎপর্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরবানির পূর্ণ ফজিলত হাসিল করতে হলে মনের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে সেই আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতাÑযা নিয়ে কোরবানি করেছিলেন আল্লাহর খলিল হজরত ইবরাহিম (আ.)। কেবল গোশত বিলানো ও রক্ত প্রবাহিত করার নাম কোরবানি নয়; বরং আল্লাহর রাস্তায় নিজের সম্পদের একটি অংশ বিলিয়ে দেওয়ার এক দৃপ্ত শপথের নাম কোরবানি। গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। কেননা আল্লাহতায়ালার কাছে গোশত ও রক্তের কোনো মূল্য নেই। মূল্য আছে কেবল তাকওয়া, পরহেজগারি ও ইখলাসের। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর কাছে কখনো জবেহকৃত পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছবে না, পৌঁছবে কেবল তাকওয়া।’Ñসূরা হজ : ০৩

অতএব, আমাদের একান্ত কর্তব্য হলোÑখাঁটি নিয়ত সহকারে কোরবানি করা এবং তা থেকে শিক্ষা অর্জন করা। নিজেদের আনন্দে অন্যদের শরিক করা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর রাস্তায় নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ করার নাম কোরবানি। এটা ব্যক্তিগত কোনো ত্যাগের নাম নয়। এটা সামষ্টিক ত্যাগের প্রতিফলন। যেমন হজরত ইবরাহিম (আ.) একা এই কাজে অগ্রসর হননি। তার সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.) এবং হজরত হাজেরা (আ.)। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মুসলমান শুধু একা আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নিলে হবে না, তার পুরো পরিবারকেও ত্যাগের এ পথে নিয়ে আসতে হবে। এটাই সুন্নতে ইবরাহিম তথা কোরবানির মর্মকথা। কিন্তু আজ মুসলিম সমাজে কোরবানি নিছক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। আমরা ভুলে গেছি কোরবানির আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। লৌকিকতা আর আনুষ্ঠানিকতায় হারিয়ে গেছে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য। কোরবানি এখন হয়ে গেছে কিছু মানুষের গরু প্রদর্শনী, নির্বাচনী প্রচারাভিযান আর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির হাতিয়ার। এক কথায় কোরবানি এখন আর ত্যাগের শিক্ষায় মানুষকে উদ্ভাসিত করছে না, বরং অহমিকা প্রদর্শনীর মাধ্যম বা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিয়ের প্রথম বছর মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে কোরবানি উপলক্ষে বিরাট গরু পাঠাতে না পারায় অনেকের ঘর-সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রমের খবরও পাওয়া যায়। অন্যদিকে ঢোল-বাদ্য সহকারে লাখ টাকায় কেনা উট-গরু প্রদর্শনীর মিছিলের কাছে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে তালবিয়া ও তাকবিরের ধ্বনি। আমরা ভুলেই গেছি যে, আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত, রক্ত কিছুই পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তাকওয়া। সেই তাকওয়ারার চিত্র কি এমন? কী হবে জবাব? মনের মাঝে এসব বিষয়ের অনুসন্ধিৎসা জাগ্রত না হলে, প্রশ্ন উত্থাপিত না হলে কী লাভ বছর বছর কোরবানি করে?

এক শ্রেণির মানুষ আছে যাদের কাছে কোরবানি নিছক ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই নয়। কোরবানি উপলক্ষে মৌসুমি পশু-ব্যবসা খারাপ কিছু নয়, বরং নিয়ত ঠিক থাকলে তা এক বিরাট ইবাদত। কিন্তু কোরবানি উপলক্ষে পশুর চামড়া নিয়ে যা হয় তার সঙ্গে সুন্নতে ইবরাহিমের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। কোরবানির সময় প্রতিবছর আমাদের দেশে চামড়া ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলে। এলাকায় দেখা যায়, একশ্রেণির মাস্তানের আনাগোনা। যাদের সামনে কথা বলার সাহস রাখেন না কোরবানিদাতারা। এরা নিজেরাই চামড়ার দাম ঠিক করে দেয় এবং কোরবানিদাতারা বাধ্য হয় ওই দামে তাদের হাতে চামড়া তুলে দিতে। অথচ কোরবানির চামড়ার হকদার এতিম, মিসকিন, গরিব মানুষরা। যারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দেয়, কিংবা যারা চামড়া নিয়ে মাস্তানি করে তারা গরিবের হক নষ্ট করছে, এতিমের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে। এটা জঘন্য অপরাধ। কিয়ামতের মাঠে তারা ছাড়া পাবে না। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা এতিম আর গরিবের পক্ষে তাদের হক আদায় করে ছাড়বেন।

যারা কোরবানির চামড়া নিয়ে মাস্তানি করে, যেসব ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পশুর মূল্য বাড়ায়, চামড়ার মূল্য ফেলে দেয় কিংবা যারা কোরবানিকে লোক দেখানো খেল তামাশায় পরিণত করে তাদের ভেবে দেখা উচিত, কিয়ামতের মাঠে প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। ত্যাগের বার্তা নিয়ে প্রতিবছর আমাদের কাছে কোরবানি হাজির হয়। শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য, আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য যারা কোরবানি করেন, মাটিতে শোয়ানো পশুর গলায় ছুরি চালানোর পর গলা বেয়ে মাটিতে রক্ত পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। মনে রাখা দরকার, পশু জবাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে অবস্থিত পাশবিকতারও জবাই হয়ে যেতে হবে। তা না হলে গোশত খাওয়া ছাড়া কোরবানি দ্বারা আর কিছু অর্জিত হবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

বস্তুত কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা আমাদের কাছে আত্মশুদ্ধি, আত্মতৃপ্তি ও আত্মত্যাগের এক সুমহান বার্তা নিয়ে প্রতিবছর উপস্থিত হয়। ঈদুল আজহার শিক্ষায় উজ্জীবিত হলে আমরা সব পাপ, বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার, রিপুর তাড়না ও শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হব। তাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকেই কোরবানি দিতে হয়। আর হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়।

আমরা চাই ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সব অনিশ্চয়তা-শঙ্কা দূর হোক। সেই সঙ্গে আমাদের পরস্পরে হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে একসঙ্গে এক কাতারে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে শামিল হয়ে সবার মধ্যে সাম্য ও সহমর্মিতার মনোভাব জাগিয়ে তুলতে হবে। নিজের ভেতরের এই ত্যাগটুকু কীভাবে অর্জন করা যায় সে চেষ্টার পরীক্ষায় আগামীকাল আমরা কতটুকু সফল হই এখন সেটাই দেখার বিষয়।

\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n\r\n

লেখক : প্রবন্ধিক, ধর্মীয় শিক্ষক 

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : বছরের সেরা দশ দিন

প্রকাশিত :  ০৮:৪৮, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৩৭, ২৩ মে ২০২৬

শায়খ রাশিদ খান

এটা আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি বছরের মধ্যে কিছু বিশেষ সময় রেখেছেন। এসব সময়ে ভালো আমলের সওয়াব অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এগুলো এমন সময়, যখন আমরা আগের ঘাটতি পূরণ করতে পারি এবং আল্লাহ আমাদের জন্য রহমত ও নেকির দরজা খুলে দেন।

আল্লাহ আমাদের নামাজ, রোজা ও ভালো কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন । নবী (সা:) শিখিয়েছেন যে, সবসময় আল্লাহর ইবাদত করতে হবে । কিন্তু তিনি এটাও শিখিয়েছেন যে, কিছু বিশেষ সময় আছে যখন আল্লাহর রহমত আরও বেশি নেমে আসে । মুমিনকে বলা হয়েছে, সে যেন এই রহমতের মৌসুমকে কাজে লাগায়।

এমনই এক মহান সময় হলো: জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ফজর-এর শুরুতে শপথ করে বলেন: “শপথ ফজরের, এবং শপথ দশ রাতের।”

আল্লাহ যখন কুরআনে শপথ করেন, তা আমাদের মতো নয়। আমরা সত্য প্রমাণের জন্য শপথ করি, কিন্তু আল্লাহ তো নিজেই পরম সত্য। বরং, আল্লাহর শপথের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—যেন আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝি।

অনেক আলেম বলেছেন, “ফজর” বলতে জিলহজ্জের দশম দিনের ফজর বোঝানো হয়েছে । আবার কেউ বলেছেন, এটি প্রথম দিনের ফজরকে বোঝায়। কারণ, এই দশ দিনের শুরু থেকেই আল্লাহর বরকত নেমে আসতে শুরু করে। তাই আমাদের দশম দিন বা আরাফার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। প্রথম দিন থেকেই এই বিশেষ সময়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এরপর আল্লাহ বলেন, “দশ রাতের শপথ।” অধিকাংশ তাফসিরবিদ বলেছেন, এটি জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকেই বোঝায়। এই দিনগুলোর ফজিলত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির একটি হাদিস রয়েছে। নবী (সা:) বলেছেন: এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর চেয়ে বেশি প্রিয়।

এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা আছে । আলেমরা বলেন, নবী (সা:) বিভিন্ন সময়ে এই দশ দিনের ফজিলত বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন—এগুলো বছরের সেরা দিন, সবচেয়ে প্রিয় দিন, এবং ইবাদতের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়। তাই আলেমরা বলেছেন, এই দশ দিনই পুরো বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন।

অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—তাহলে রমজানের শেষ দশ রাত? আলেমরা বলেন, রমজানের শেষ দশ রাত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাত, আর জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন।

তাহলে প্রশ্ন হলো: আমরা কেন এই দিনগুলোকে রমজানের শেষ দশ রাতের মতো গুরুত্ব দিই না কেন?

রমজানে চারদিকে ইবাদতের পরিবেশ থাকে। মসজিদ ভরা থাকে, পরিবারে সবাই একে অপরকে উৎসাহ দেয়, সামাজিক মাধ্যমেও ইবাদতের কথা চলে । কিন্তু জিলহজ্জের এই দশ দিনে এমন পরিবেশ অনেক সময় দেখা যায় না।

হয়তো এ কারণেই এই দিনগুলো এত মূল্যবান। অনেক মানুষ এসব দিনের গুরুত্ব জানেই না বা অবহেলা করে। আর মানুষের অবহেলার সময়ে আল্লাহর ইবাদত করা বিশেষ মর্যাদার কাজ।

নবী (সা:) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কেন শাবান মাসে এত রোজা রাখতেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে । যেন তিনি বলতে চেয়েছেন: “মানুষ যখন গাফেল থাকে, তখন আমি চাই আল্লাহ আমাকে তাঁর ইবাদতে দেখুন।' এটাই হলো অবহেলার সময়ে ইবাদতের সৌন্দর্য।

তাহাজ্জুদের নামাজ এত বিশেষ কেন? কারণ, তখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে। কেউ গাফেল, কেউ হয়তো গুনাহে লিপ্ত—আর সেই সময় একজন মুমিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়।

সাহাবারা এই বিষয়টি বুঝেছিলেন। তাই তারা এই দশ দিনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। তারা তিনভাবে এই দিনগুলোর মর্যাদা প্রকাশ করতেন: হৃদয়ে, মুখে, এবং কাজে।

প্রথমে হৃদয়ে। আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো অন্তরের তাকওয়ার পরিচয়।” তাকওয়া এভাবেই তৈরি হয়—আল্লাহ যা সম্মান করেন, সেটাকে সম্মান করা; আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেটাকে ভালোবাসা।

যখন হৃদয়ে এই ভালোবাসা আসে, তখন তা কথাতেও প্রকাশ পায় । কারণ, আমরা যাকে ভালোবাসি, তার কথা বলতেই ভালো লাগে।

এরপর আসে কাজ। এই সময়ের সবচেয়ে বড় কদর হলো—এতে বেশি বেশি নেক আমল করা। এগুলো এমন দিন, যখন আল্লাহ সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ জানেন আমরা দুর্বল। তিনি বলেন: মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।”

আমরা ভুল করি, ইবাদতে কমতি করি। তাই আল্লাহ আমাদের জন্য বিশেষ বিশেষ সময় দেন, যেন আমরা ঘাটতি পূরণ করতে পারি। যদি রমজানে কিছু মিস হয়ে যায়, তাহলে এই দিনগুলো আরেকটি সুযোগ।

তবে মনে রাখতে হবে—যেমন নেকির সওয়াব বাড়ে, তেমনি এই সময়ের গুনাহও বেশি গুরুতর হয়। আল্লাহ যে সময়কে সম্মানিত করেছেন, সেই সময়ে গুনাহ করা অকৃতজ্ঞতার মতো।

আল্লাহ শুধু দিনের নয়, রাতের কথাও বলেছেন। জিলহজ্জের রাতগুলোও বরকতময়। রাত হলো নিরিবিলি ইবাদতের সময়—কাজ নেই, কোলাহল নেই, শুধু আপনি আর আল্লাহ। আপনি যদি আল্লাহর কাছাকাছি হতে চান, তাহলে এই রাতগুলোতে ইবাদত করার চেষ্টা করুন।

সবশেষে, হাদিসের একটি শব্দের দিকে খেয়াল করুন। নবী (সা:) বলেছেন, এই দিনগুলোর নেক আমল “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা। আমরা যাকে ভালোবাসি, সে যা পছন্দ করে, আমরাও তা গুরুত্ব দিই। তাই আল্লাহ যদি বলেন, কোনো কিছু তাঁর কাছে প্রিয়, তাহলে সেটি আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেওয়া উচিত।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেন এই মহান দশ দিনকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দেন। তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা ভালোবাসে, যা সম্মান করেন তা সম্মান করে, এবং আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করে। আমীন।

শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । ১৫ মে ২০২৬।