শেয়ারবাজারে ধস: সূচক নেমে ৫২০৫-এ, বিনিয়োগকারীদের মনে আতঙ্ক!
আজ রবিবার, ৬ এপ্রিল ২০২৫। সকাল থেকেই ঢাকার মতিঝিলে বিরাজ করছে এক অজানা শঙ্কার ছায়া। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে বিনিয়োগকারীদের মুখে চাপা উদ্বেগ স্পষ্ট। আর দুপুর গড়াতেই সেই উদ্বেগ রূপ নেয় হতাশায়। বাজার বন্ধের সময় দেখা যায়—ডিএসইএক্স সূচক নেমে এসেছে ৫২০৫.১৯ পয়েন্টে। মাত্র একদিনেই পতন হয়েছে ১৩.৯৭ শতাংশ—এ যেন এক প্রবল ধাক্কা।
দিনভর লেনদেন হয়েছে মাত্র ৪১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার, যেখানে গত মাসগুলোতে গড় লেনদেন ছিল এর দ্বিগুণেরও বেশি। বিনিয়োগকারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই পতনের শেষ কোথায়? শেয়ারবাজার কি আবার ২০১০ সালের মতো আরেকটি বিপর্যয়ের পথে হাঁটছে?
সকাল ১০টায় লেনদেন শুরু হতেই সূচকের ওপর চাপ পড়তে থাকে। প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই সূচক নেমে যায় ৫২০০ পয়েন্টের নিচে। দুপুর নাগাদ সেই পতন আরও তীব্র হয়। পুনরায় সূচক নেমে যায় ৫২০০-এর নিচে। যদিও শেষ ঘণ্টায় কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে দিনশেষে সূচক দাঁড়ায় ৫২০৫.১৯-এ।
ব্রোকারেজ হাউসগুলো ছিল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। লেনদেনরত অনেকেই নীরবভাবে কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ গেঁথে বসে ছিলেন। জনৈক ব্রোকার বলেন, \"বড় খেলোয়াড়রা আজ বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য যেভাবে শেয়ার বিক্রি করেছেন, তাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও আতঙ্কে পড়ে গেছেন। সকাল থেকেই প্যানিক সেলিং শুরু হয়েছে।\"
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী আব্দুল হক, যিনি প্রায় এক যুগ ধরে এই বাজারে আছেন, বলেন, \"আমি অনেক উত্থান-পতন দেখেছি, কিন্তু আজকের মতো এতটা আতঙ্ক কখনো অনুভব করিনি। আমার পোর্টফোলিওতে ২০ লাখ টাকা ছিল, যা আজ কমে ১৫ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। কী হবে, বুঝতে পারছি না।\"
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধসের পেছনে একাধিক কারণ একযোগে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়ায় এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছে।
এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, ডলারের ঊর্ধ্বগতি, রপ্তানি আয়ে চাপ এবং শেয়ারবাজারবান্ধব বাজেটের অভাব—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরএমজি সেক্টর । শেয়ারদর ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
তবে সবাই এতটা নিরাশ নন। বিশ্লেষক মাহমুদুল হাসান বলেন, \"এই পতন বাজারের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর সংশোধন হতে পারে। অনেক শেয়ারের দাম বাস্তবতার তুলনায় অতি উচ্চে পৌঁছে গিয়েছিল। এখন বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ভাবতে পারবেন।\" তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সরকার ও বিএসইসি যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে বাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব।
লেনদেনের পরিমাণও এখন একটি বড় চিন্তার বিষয়। আজকের লেনদেন ছিল মাত্র ৪১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে আগের তিন মাসে গড় লেনদেন ছিল প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও কমে গেছে। গত মাসে যেখানে প্রায় ৫ হাজার নতুন বিও হিসাব খোলা হয়েছিল, সেখানে এই সপ্তাহে তা নেমে এসেছে ২ হাজারের নিচে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ আজ এক বিবৃতিতে বলেন, \"বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।\" তিনি কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
তবে বিনিয়োগকারীরা বলছেন—শুধু কথায় নয়, এবার তারা দেখতে চান বাস্তব ফল। কারণ, অতীতে বহু প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এই ধসের প্রভাব শুধু শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা অর্থনীতিতেই পড়তে পারে। সাধারণ মানুষ যখন বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুঁজিবাজার দুর্বল হয়ে পড়ে।
আশার দিক হলো—বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে, নতুন আইপিও আসছে, যা বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ তৈরি করতে পারে। তবে তার আগে জরুরি আস্থা ফিরিয়ে আনা।
বাজার বন্ধ হওয়ার পর মতিঝিলের বিভিন্ন সড়কে বিনিয়োগকারীদের গুঞ্জন চলতে থাকে। কেউ হতাশ হয়ে বাসায় ফিরছেন, কেউ আবার নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এক তরুণ বিনিয়োগকারী রাকিব হোসেন বলেন, \"আজ ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়ছি না। বাজার ওঠে, আবার পড়েও। এটা এক ধরনের খেলা—সাহস রাখতে হয়।\"
রাকিবের মতো আশাবাদীরা এখনও বিশ্বাস করেন—আলো একদিন আসবেই। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—সেই আলোর দেখা কবে মিলবে?
শেয়ারবাজারের এই উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন। কেউ টিকে যাবেন, কেউ হয়তো হারিয়ে যাবেন। কিন্তু দিনশেষে প্রত্যাশা একটাই—আস্থা ফিরুক, ঘুরে দাঁড়াক আমাদের শেয়ারবাজার।



















