img

পবিত্র হজ আজ, লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফা

প্রকাশিত :  ০৫:৪৯, ০৫ জুন ২০২৫

 পবিত্র হজ আজ, লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফা

আজ সউদী আরবের আরাফায় পবিত্র হজ পালিত হবে। এ বছর হিজরি ১৪৪৬ সনের হজ পালিত হচ্ছে। হাজিরা আজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করবেন। সন্ধ্যায় রওয়ানা হবেন মুজদালিফার উদ্দেশ্যে। সেখানে রাত যাপন করবেন এবং সেখান থেকে শয়তানকে পাথর মারার জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন।

আজ বৃহস্পতিবার (৯ জিলহজ) ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে হজযাত্রীরা হজের প্রধান রোকন- আরাফায় অবস্থানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর আগে তারা মিনায় রাত কাটিয়েছেন, মিনায় অবস্থানের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল হজের আনুষ্ঠানিকতা।

আরাফার ময়দান মিনা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্ব দিকে অবস্থিত। হজযাত্রীরা এখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করবেন, এরপর তারা প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন।

হজযাত্রীরা আরাফার ময়দানে মসজিদে নামিরা থেকে প্রদত্ত হজের খুতবা শুনবেন। সেখানে তারা জোহর ও আসর একসঙ্গে পড়বেন।

সউদী কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ হজযাত্রী বিদেশ থেকে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন।

সউদী কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োজিত করেছে এবং ৪০টিরও বেশি সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির হজমন্ত্রী তৌফিক রাবিয়া।

এই ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে—৫০ হাজার বর্গমিটার অতিরিক্ত ছায়াযুক্ত জায়গা তৈরি, হাজার হাজার চিকিৎসা কর্মীর মোতায়েন এবং ৪০০টির বেশি শীতলীকরণ ইউনিটের ব্যবস্থা।

আনাদোলু বার্তার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত হিজরি বছর (১৪৪৫ হিজরি / ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে) হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ১৬৪ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ২১ হাজার ৮৫৪ জন ছিলেন সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ হজযাত্রী। হজমন্ত্রী জানান, ওই বছর হজে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশের মানুষ।

এ বছর ১২ বছরের নিচের শিশুদের হজে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়েছে এবং যেসব হজযাত্রী অনুমতিপত্র ছাড়া হজ পালনের চেষ্টা করবেন, তাদেরকে ৫ হাজার ডলার (৩,৬৮৫ পাউন্ড) জরিমানা ও ১০ বছরের জন্য সৌদি আরবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

তারা আরও জানান, গত বছর যারা মারা গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশই ছিলেন অবৈধ বা নিবন্ধনবিহীন। ফলে তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবাসন, পরিবহন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, যখন তাপমাত্রা ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। মৃতদের মধ্যে শত শত মিশরীয় ও ইন্দোনেশীয়ও ছিলেন।

হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি এবং এটি হিজরি চন্দ্রপঞ্জিকার ১২তম মাসে অনুষ্ঠিত হয়।

প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা ফরজ।

হজের প্রথম দিনে পুরুষ হজযাত্রীরা নিজেদের পোশাক বদলে সাদা রঙের দুই টুকরা কাপড় (ইহরাম) পরে ইহরামের অবস্থায় প্রবেশ করেন। নারীরা শালীন পোশাক পরিধান করে মাথা ঢেকে নেন।

এরপর হজযাত্রীরা ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থান কাবা শরিফ ঘিরে তাওয়াফ (তিনবার চক্কর) দেন। পাশাপাশি তারা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার হাঁটেন, যাকে সাঈ বলা হয়।

পরে তারা মক্কা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরের মিনায় গমন করেন, যেখানে তাঁবুর শহরে তারা রাত কাটান। বৃহস্পতিবার তারা আরাফাত ময়দানে যাবেন, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বিদায় হজের খুতবা দিয়েছিলেন। সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি


img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : বছরের সেরা দশ দিন

প্রকাশিত :  ০৮:৪৮, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৩৭, ২৩ মে ২০২৬

শায়খ রাশিদ খান

এটা আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি বছরের মধ্যে কিছু বিশেষ সময় রেখেছেন। এসব সময়ে ভালো আমলের সওয়াব অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এগুলো এমন সময়, যখন আমরা আগের ঘাটতি পূরণ করতে পারি এবং আল্লাহ আমাদের জন্য রহমত ও নেকির দরজা খুলে দেন।

আল্লাহ আমাদের নামাজ, রোজা ও ভালো কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন । নবী (সা:) শিখিয়েছেন যে, সবসময় আল্লাহর ইবাদত করতে হবে । কিন্তু তিনি এটাও শিখিয়েছেন যে, কিছু বিশেষ সময় আছে যখন আল্লাহর রহমত আরও বেশি নেমে আসে । মুমিনকে বলা হয়েছে, সে যেন এই রহমতের মৌসুমকে কাজে লাগায়।

এমনই এক মহান সময় হলো: জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ফজর-এর শুরুতে শপথ করে বলেন: “শপথ ফজরের, এবং শপথ দশ রাতের।”

আল্লাহ যখন কুরআনে শপথ করেন, তা আমাদের মতো নয়। আমরা সত্য প্রমাণের জন্য শপথ করি, কিন্তু আল্লাহ তো নিজেই পরম সত্য। বরং, আল্লাহর শপথের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—যেন আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝি।

অনেক আলেম বলেছেন, “ফজর” বলতে জিলহজ্জের দশম দিনের ফজর বোঝানো হয়েছে । আবার কেউ বলেছেন, এটি প্রথম দিনের ফজরকে বোঝায়। কারণ, এই দশ দিনের শুরু থেকেই আল্লাহর বরকত নেমে আসতে শুরু করে। তাই আমাদের দশম দিন বা আরাফার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। প্রথম দিন থেকেই এই বিশেষ সময়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এরপর আল্লাহ বলেন, “দশ রাতের শপথ।” অধিকাংশ তাফসিরবিদ বলেছেন, এটি জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকেই বোঝায়। এই দিনগুলোর ফজিলত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির একটি হাদিস রয়েছে। নবী (সা:) বলেছেন: এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর চেয়ে বেশি প্রিয়।

এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা আছে । আলেমরা বলেন, নবী (সা:) বিভিন্ন সময়ে এই দশ দিনের ফজিলত বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন—এগুলো বছরের সেরা দিন, সবচেয়ে প্রিয় দিন, এবং ইবাদতের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়। তাই আলেমরা বলেছেন, এই দশ দিনই পুরো বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন।

অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—তাহলে রমজানের শেষ দশ রাত? আলেমরা বলেন, রমজানের শেষ দশ রাত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাত, আর জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন।

তাহলে প্রশ্ন হলো: আমরা কেন এই দিনগুলোকে রমজানের শেষ দশ রাতের মতো গুরুত্ব দিই না কেন?

রমজানে চারদিকে ইবাদতের পরিবেশ থাকে। মসজিদ ভরা থাকে, পরিবারে সবাই একে অপরকে উৎসাহ দেয়, সামাজিক মাধ্যমেও ইবাদতের কথা চলে । কিন্তু জিলহজ্জের এই দশ দিনে এমন পরিবেশ অনেক সময় দেখা যায় না।

হয়তো এ কারণেই এই দিনগুলো এত মূল্যবান। অনেক মানুষ এসব দিনের গুরুত্ব জানেই না বা অবহেলা করে। আর মানুষের অবহেলার সময়ে আল্লাহর ইবাদত করা বিশেষ মর্যাদার কাজ।

নবী (সা:) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কেন শাবান মাসে এত রোজা রাখতেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে । যেন তিনি বলতে চেয়েছেন: “মানুষ যখন গাফেল থাকে, তখন আমি চাই আল্লাহ আমাকে তাঁর ইবাদতে দেখুন।' এটাই হলো অবহেলার সময়ে ইবাদতের সৌন্দর্য।

তাহাজ্জুদের নামাজ এত বিশেষ কেন? কারণ, তখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে। কেউ গাফেল, কেউ হয়তো গুনাহে লিপ্ত—আর সেই সময় একজন মুমিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়।

সাহাবারা এই বিষয়টি বুঝেছিলেন। তাই তারা এই দশ দিনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। তারা তিনভাবে এই দিনগুলোর মর্যাদা প্রকাশ করতেন: হৃদয়ে, মুখে, এবং কাজে।

প্রথমে হৃদয়ে। আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো অন্তরের তাকওয়ার পরিচয়।” তাকওয়া এভাবেই তৈরি হয়—আল্লাহ যা সম্মান করেন, সেটাকে সম্মান করা; আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেটাকে ভালোবাসা।

যখন হৃদয়ে এই ভালোবাসা আসে, তখন তা কথাতেও প্রকাশ পায় । কারণ, আমরা যাকে ভালোবাসি, তার কথা বলতেই ভালো লাগে।

এরপর আসে কাজ। এই সময়ের সবচেয়ে বড় কদর হলো—এতে বেশি বেশি নেক আমল করা। এগুলো এমন দিন, যখন আল্লাহ সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ জানেন আমরা দুর্বল। তিনি বলেন: মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।”

আমরা ভুল করি, ইবাদতে কমতি করি। তাই আল্লাহ আমাদের জন্য বিশেষ বিশেষ সময় দেন, যেন আমরা ঘাটতি পূরণ করতে পারি। যদি রমজানে কিছু মিস হয়ে যায়, তাহলে এই দিনগুলো আরেকটি সুযোগ।

তবে মনে রাখতে হবে—যেমন নেকির সওয়াব বাড়ে, তেমনি এই সময়ের গুনাহও বেশি গুরুতর হয়। আল্লাহ যে সময়কে সম্মানিত করেছেন, সেই সময়ে গুনাহ করা অকৃতজ্ঞতার মতো।

আল্লাহ শুধু দিনের নয়, রাতের কথাও বলেছেন। জিলহজ্জের রাতগুলোও বরকতময়। রাত হলো নিরিবিলি ইবাদতের সময়—কাজ নেই, কোলাহল নেই, শুধু আপনি আর আল্লাহ। আপনি যদি আল্লাহর কাছাকাছি হতে চান, তাহলে এই রাতগুলোতে ইবাদত করার চেষ্টা করুন।

সবশেষে, হাদিসের একটি শব্দের দিকে খেয়াল করুন। নবী (সা:) বলেছেন, এই দিনগুলোর নেক আমল “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা। আমরা যাকে ভালোবাসি, সে যা পছন্দ করে, আমরাও তা গুরুত্ব দিই। তাই আল্লাহ যদি বলেন, কোনো কিছু তাঁর কাছে প্রিয়, তাহলে সেটি আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেওয়া উচিত।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেন এই মহান দশ দিনকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দেন। তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা ভালোবাসে, যা সম্মান করেন তা সম্মান করে, এবং আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করে। আমীন।

শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । ১৫ মে ২০২৬।