img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : রমজানে আমাদের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে

প্রকাশিত :  ০৫:৫৫, ০৭ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৩৩, ০৭ মার্চ ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : রমজানে আমাদের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে

শায়খ আব্দুল কাইয়ুম

আল-হামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই বছরও রোজা রাখার তাওফিক দিয়েছেন । এই মাস শুরু হওয়ার আগে আমাদের সাথে অনেক মানুষ ছিলেন । আমরা তাদেরকে মসজিদে দেখেছি, তাদের সাথে নামাজ পড়েছি। কিন্তু আজ তাদের অনেকেই আমাদের মাঝে নেই। এটি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা—জীবন খুবই অস্থায়ী।

আমরা ইতিমধ্যে এই বরকতময় মাসের মাঝামাঝি এসে পৌঁছেছি। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাওফিক দেন এই মাসকে সুন্দরভাবে শেষ করতে এবং আমাদের আমল কবুল করেন।

অনেক মানুষ মনে করে রোজা মানে শুধু না খাওয়া, না পান করা এবং দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা। ফিকহের দৃষ্টিতে এটি রোজাকে সহিহ করে, কিন্তু এটিই রোজার মূল উদ্দেশ্য নয় ।

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যার ওপর আমল করা ছেড়ে দেয় না, আল্লাহর কাছে তার খাবার ও পানীয় ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন নেই।

অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদের ক্ষুধা চান না। রোজার আসল উদ্দেশ্য হলো গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং তাকওয়া অর্জন করা।

আজকের সময়ে বড় একটি সমস্যা হলো জিহ্বা। আগে যদি কেউ কারো বিরুদ্ধে অপবাদ দিত, তা হয়তো কয়েকজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত । কিন্তু আজ একটি মেসেজ, একটি ফেসবুক পোস্ট বা একটি মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

মানুষ বিষয়টাকে হালকাভাবে নেয়। কেউ বলে “আমি শুধু মজা করছিলাম”, কেউ বলে “আমি শুধু ফরওয়ার্ড করেছি”।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা:) স্বীয় জিহ্বা মোবারক মুখ থেকে বের করে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে হযরত মু'আয (রা.)কে বলেছিলেন, “এটাকে নিয়ন্ত্রণ করো।” তারপর তিনি বলেন, অনেক মানুষ তাদের জিহ্বার কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার পাশে একজন পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য। অর্থাৎ প্রতিটি কথা লেখা হচ্ছে। (সূরা ক্বাফ: ১৮) ।

রাসূল (সা:) আরও সতর্ক করেছেন, অনেক রোজাদার আছে যারা তাদের রোজা থেকে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া কিছুই পায় না। কারণ রোজা শুধু পেটের রোজা নয়। এটি চোখের রোজা, কানের রোজা এবং জিহ্বার রোজাও। আমরা আল্লাহর জন্য হালাল খাবার ছেড়ে দিই, কিন্তু হারাম কথা বলা ছাড়তে পারি না—এটি আমাদের চিন্তা করা উচিত।

রমজান আমাদেরকে আত্মসংযম শেখায়। কেউ যদি ঝগড়া করতে চায়, রাসূল (সা:) বলতে শিখিয়েছেন ওই ব্যক্তিকে বলতে, “আমি রোজাদার।” অর্থাৎ আমি আমার রোজা রক্ষা করছি।

তাহলে আসুন, এই রমজানে আমরা একটি দৃঢ় নিয়ত করি। আমরা আমাদের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করব। আমরা গীবত করব না। আমরা অপবাদ দেব না।

আমরা যাচাই-বাছাই না করে কোনো খবর ছড়াব না।

যদি আমরা জিহ্বাকে রক্ষা করি, তাহলে আমরা আমাদের রোজাকেও রক্ষা করতে পারব। আর তখনই আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারব।

রমজান খুব দ্রুত চলে যায়। তাই এই সময়টাকে আমাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি। হে আল্লাহ, আমাদের জিহ্বাকে মিথ্যা থেকে পবিত্র করুন। হে আল্লাহ, আমাদের গীবত ও অপবাদ থেকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ, আমাদের রোজাকে কবুল করুন এবং আমাদেরকে সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত করুন যাদের রোজা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য। হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাকওয়া দান করুন এবং এই বরকতময় মাসের সম্পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তাওফিক দিন। আমিন।


(শায়খ আব্দুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।)
img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : বছরের সেরা দশ দিন

প্রকাশিত :  ০৮:৪৮, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৩৭, ২৩ মে ২০২৬

শায়খ রাশিদ খান

এটা আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি বছরের মধ্যে কিছু বিশেষ সময় রেখেছেন। এসব সময়ে ভালো আমলের সওয়াব অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এগুলো এমন সময়, যখন আমরা আগের ঘাটতি পূরণ করতে পারি এবং আল্লাহ আমাদের জন্য রহমত ও নেকির দরজা খুলে দেন।

আল্লাহ আমাদের নামাজ, রোজা ও ভালো কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন । নবী (সা:) শিখিয়েছেন যে, সবসময় আল্লাহর ইবাদত করতে হবে । কিন্তু তিনি এটাও শিখিয়েছেন যে, কিছু বিশেষ সময় আছে যখন আল্লাহর রহমত আরও বেশি নেমে আসে । মুমিনকে বলা হয়েছে, সে যেন এই রহমতের মৌসুমকে কাজে লাগায়।

এমনই এক মহান সময় হলো: জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ফজর-এর শুরুতে শপথ করে বলেন: “শপথ ফজরের, এবং শপথ দশ রাতের।”

আল্লাহ যখন কুরআনে শপথ করেন, তা আমাদের মতো নয়। আমরা সত্য প্রমাণের জন্য শপথ করি, কিন্তু আল্লাহ তো নিজেই পরম সত্য। বরং, আল্লাহর শপথের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—যেন আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝি।

অনেক আলেম বলেছেন, “ফজর” বলতে জিলহজ্জের দশম দিনের ফজর বোঝানো হয়েছে । আবার কেউ বলেছেন, এটি প্রথম দিনের ফজরকে বোঝায়। কারণ, এই দশ দিনের শুরু থেকেই আল্লাহর বরকত নেমে আসতে শুরু করে। তাই আমাদের দশম দিন বা আরাফার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। প্রথম দিন থেকেই এই বিশেষ সময়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এরপর আল্লাহ বলেন, “দশ রাতের শপথ।” অধিকাংশ তাফসিরবিদ বলেছেন, এটি জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকেই বোঝায়। এই দিনগুলোর ফজিলত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির একটি হাদিস রয়েছে। নবী (সা:) বলেছেন: এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর চেয়ে বেশি প্রিয়।

এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা আছে । আলেমরা বলেন, নবী (সা:) বিভিন্ন সময়ে এই দশ দিনের ফজিলত বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন—এগুলো বছরের সেরা দিন, সবচেয়ে প্রিয় দিন, এবং ইবাদতের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়। তাই আলেমরা বলেছেন, এই দশ দিনই পুরো বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন।

অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—তাহলে রমজানের শেষ দশ রাত? আলেমরা বলেন, রমজানের শেষ দশ রাত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাত, আর জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন।

তাহলে প্রশ্ন হলো: আমরা কেন এই দিনগুলোকে রমজানের শেষ দশ রাতের মতো গুরুত্ব দিই না কেন?

রমজানে চারদিকে ইবাদতের পরিবেশ থাকে। মসজিদ ভরা থাকে, পরিবারে সবাই একে অপরকে উৎসাহ দেয়, সামাজিক মাধ্যমেও ইবাদতের কথা চলে । কিন্তু জিলহজ্জের এই দশ দিনে এমন পরিবেশ অনেক সময় দেখা যায় না।

হয়তো এ কারণেই এই দিনগুলো এত মূল্যবান। অনেক মানুষ এসব দিনের গুরুত্ব জানেই না বা অবহেলা করে। আর মানুষের অবহেলার সময়ে আল্লাহর ইবাদত করা বিশেষ মর্যাদার কাজ।

নবী (সা:) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কেন শাবান মাসে এত রোজা রাখতেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে । যেন তিনি বলতে চেয়েছেন: “মানুষ যখন গাফেল থাকে, তখন আমি চাই আল্লাহ আমাকে তাঁর ইবাদতে দেখুন।' এটাই হলো অবহেলার সময়ে ইবাদতের সৌন্দর্য।

তাহাজ্জুদের নামাজ এত বিশেষ কেন? কারণ, তখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে। কেউ গাফেল, কেউ হয়তো গুনাহে লিপ্ত—আর সেই সময় একজন মুমিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়।

সাহাবারা এই বিষয়টি বুঝেছিলেন। তাই তারা এই দশ দিনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। তারা তিনভাবে এই দিনগুলোর মর্যাদা প্রকাশ করতেন: হৃদয়ে, মুখে, এবং কাজে।

প্রথমে হৃদয়ে। আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো অন্তরের তাকওয়ার পরিচয়।” তাকওয়া এভাবেই তৈরি হয়—আল্লাহ যা সম্মান করেন, সেটাকে সম্মান করা; আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেটাকে ভালোবাসা।

যখন হৃদয়ে এই ভালোবাসা আসে, তখন তা কথাতেও প্রকাশ পায় । কারণ, আমরা যাকে ভালোবাসি, তার কথা বলতেই ভালো লাগে।

এরপর আসে কাজ। এই সময়ের সবচেয়ে বড় কদর হলো—এতে বেশি বেশি নেক আমল করা। এগুলো এমন দিন, যখন আল্লাহ সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ জানেন আমরা দুর্বল। তিনি বলেন: মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।”

আমরা ভুল করি, ইবাদতে কমতি করি। তাই আল্লাহ আমাদের জন্য বিশেষ বিশেষ সময় দেন, যেন আমরা ঘাটতি পূরণ করতে পারি। যদি রমজানে কিছু মিস হয়ে যায়, তাহলে এই দিনগুলো আরেকটি সুযোগ।

তবে মনে রাখতে হবে—যেমন নেকির সওয়াব বাড়ে, তেমনি এই সময়ের গুনাহও বেশি গুরুতর হয়। আল্লাহ যে সময়কে সম্মানিত করেছেন, সেই সময়ে গুনাহ করা অকৃতজ্ঞতার মতো।

আল্লাহ শুধু দিনের নয়, রাতের কথাও বলেছেন। জিলহজ্জের রাতগুলোও বরকতময়। রাত হলো নিরিবিলি ইবাদতের সময়—কাজ নেই, কোলাহল নেই, শুধু আপনি আর আল্লাহ। আপনি যদি আল্লাহর কাছাকাছি হতে চান, তাহলে এই রাতগুলোতে ইবাদত করার চেষ্টা করুন।

সবশেষে, হাদিসের একটি শব্দের দিকে খেয়াল করুন। নবী (সা:) বলেছেন, এই দিনগুলোর নেক আমল “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা। আমরা যাকে ভালোবাসি, সে যা পছন্দ করে, আমরাও তা গুরুত্ব দিই। তাই আল্লাহ যদি বলেন, কোনো কিছু তাঁর কাছে প্রিয়, তাহলে সেটি আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেওয়া উচিত।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেন এই মহান দশ দিনকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দেন। তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা ভালোবাসে, যা সম্মান করেন তা সম্মান করে, এবং আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করে। আমীন।

শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । ১৫ মে ২০২৬।