ইমাম মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশিত :
০৫:৫৪, ১৪ মার্চ ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের সরকারি সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন।
আজ শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে তিনি এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় বলা হয়েছে, ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের পাশাপাশি একই সঙ্গে ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত, ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ এবং ৩৯৬টি গির্জার যাজকসহ উপাসনালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সম্মানী প্রদান করা হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি মসজিদের জন্য ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা থেকে ইমাম ৫ হাজার, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার এবং খাদেম ২ হাজার টাকা করে পাবেন। আর প্রতিটি মন্দিরের জন্য থাকছে ৮ হাজার টাকা, যা থেকে পুরোহিত ৫ হাজার টাকা এবং সেবাইত ৩ হাজার টাকা করে পাবেন।
এ ছাড়া প্রতিটি বৌদ্ধবিহারের জন্য থাকছে ৮ হাজার টাকা, যা বিহার অধ্যক্ষ ৫ হাজার এবং উপাধ্যক্ষ ৩ হাজার টাকা করে পাবেন। প্রতি খ্রিস্টান চার্চের জন্য থাকছে ৮ হাজার টাকা, যা পালক বা যাজক ৫ হাজার টাকা, সহকারী পালক বা যাজক ৩ হাজার টাকা করে পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জাবিউল্লাহ জানান, প্রতি বছর ধর্মীয় উৎসবে মসজিদে কর্মকর্তাদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা করে বছরে দুবার এবং দুর্গাপূজা বা বৌদ্ধপূর্ণিমা বা বড়দিনের ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা করে বোনাস দেওয়া হবে। তবে যেসব মসজিদ সরকারি ও দেশি বা বিদেশি সংস্থার অনুদানপ্রাপ্ত, সেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার বাইরে থাকবে।
তিনি আরও জানান, এ সম্মানী দেওয়ার ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরে মার্চ-জুনে ২৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। প্রতি অর্থবছরে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ৪ বছরে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হবে। এ সম্মানী ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে এটি চালু হবে।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : বছরের সেরা দশ দিন
প্রকাশিত :
০৮:৪৮, ২৩ মে ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৩৭, ২৩ মে ২০২৬
শায়খ রাশিদ খান
এটা আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি বছরের মধ্যে কিছু বিশেষ সময় রেখেছেন। এসব সময়ে ভালো আমলের সওয়াব অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এগুলো এমন সময়, যখন আমরা আগের ঘাটতি পূরণ করতে পারি এবং আল্লাহ আমাদের জন্য রহমত ও নেকির দরজা খুলে দেন।
আল্লাহ আমাদের নামাজ, রোজা ও ভালো কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন । নবী (সা:) শিখিয়েছেন যে, সবসময় আল্লাহর ইবাদত করতে হবে । কিন্তু তিনি এটাও শিখিয়েছেন যে, কিছু বিশেষ সময় আছে যখন আল্লাহর রহমত আরও বেশি নেমে আসে । মুমিনকে বলা হয়েছে, সে যেন এই রহমতের মৌসুমকে কাজে লাগায়।
এমনই এক মহান সময় হলো: জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ফজর-এর শুরুতে শপথ করে বলেন: “শপথ ফজরের, এবং শপথ দশ রাতের।”
আল্লাহ যখন কুরআনে শপথ করেন, তা আমাদের মতো নয়। আমরা সত্য প্রমাণের জন্য শপথ করি, কিন্তু আল্লাহ তো নিজেই পরম সত্য। বরং, আল্লাহর শপথের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—যেন আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝি।
অনেক আলেম বলেছেন, “ফজর” বলতে জিলহজ্জের দশম দিনের ফজর বোঝানো হয়েছে । আবার কেউ বলেছেন, এটি প্রথম দিনের ফজরকে বোঝায়। কারণ, এই দশ দিনের শুরু থেকেই আল্লাহর বরকত নেমে আসতে শুরু করে। তাই আমাদের দশম দিন বা আরাফার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। প্রথম দিন থেকেই এই বিশেষ সময়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এরপর আল্লাহ বলেন, “দশ রাতের শপথ।” অধিকাংশ তাফসিরবিদ বলেছেন, এটি জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকেই বোঝায়। এই দিনগুলোর ফজিলত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির একটি হাদিস রয়েছে। নবী (সা:) বলেছেন: এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর চেয়ে বেশি প্রিয়।
এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা আছে । আলেমরা বলেন, নবী (সা:) বিভিন্ন সময়ে এই দশ দিনের ফজিলত বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন—এগুলো বছরের সেরা দিন, সবচেয়ে প্রিয় দিন, এবং ইবাদতের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়। তাই আলেমরা বলেছেন, এই দশ দিনই পুরো বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—তাহলে রমজানের শেষ দশ রাত? আলেমরা বলেন, রমজানের শেষ দশ রাত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাত, আর জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন।
তাহলে প্রশ্ন হলো: আমরা কেন এই দিনগুলোকে রমজানের শেষ দশ রাতের মতো গুরুত্ব দিই না কেন?
রমজানে চারদিকে ইবাদতের পরিবেশ থাকে। মসজিদ ভরা থাকে, পরিবারে সবাই একে অপরকে উৎসাহ দেয়, সামাজিক মাধ্যমেও ইবাদতের কথা চলে । কিন্তু জিলহজ্জের এই দশ দিনে এমন পরিবেশ অনেক সময় দেখা যায় না।
হয়তো এ কারণেই এই দিনগুলো এত মূল্যবান। অনেক মানুষ এসব দিনের গুরুত্ব জানেই না বা অবহেলা করে। আর মানুষের অবহেলার সময়ে আল্লাহর ইবাদত করা বিশেষ মর্যাদার কাজ।
নবী (সা:) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কেন শাবান মাসে এত রোজা রাখতেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে । যেন তিনি বলতে চেয়েছেন: “মানুষ যখন গাফেল থাকে, তখন আমি চাই আল্লাহ আমাকে তাঁর ইবাদতে দেখুন।' এটাই হলো অবহেলার সময়ে ইবাদতের সৌন্দর্য।
তাহাজ্জুদের নামাজ এত বিশেষ কেন? কারণ, তখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে। কেউ গাফেল, কেউ হয়তো গুনাহে লিপ্ত—আর সেই সময় একজন মুমিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়।
সাহাবারা এই বিষয়টি বুঝেছিলেন। তাই তারা এই দশ দিনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। তারা তিনভাবে এই দিনগুলোর মর্যাদা প্রকাশ করতেন: হৃদয়ে, মুখে, এবং কাজে।
প্রথমে হৃদয়ে। আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো অন্তরের তাকওয়ার পরিচয়।” তাকওয়া এভাবেই তৈরি হয়—আল্লাহ যা সম্মান করেন, সেটাকে সম্মান করা; আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেটাকে ভালোবাসা।
যখন হৃদয়ে এই ভালোবাসা আসে, তখন তা কথাতেও প্রকাশ পায় । কারণ, আমরা যাকে ভালোবাসি, তার কথা বলতেই ভালো লাগে।
এরপর আসে কাজ। এই সময়ের সবচেয়ে বড় কদর হলো—এতে বেশি বেশি নেক আমল করা। এগুলো এমন দিন, যখন আল্লাহ সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ জানেন আমরা দুর্বল। তিনি বলেন: মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
আমরা ভুল করি, ইবাদতে কমতি করি। তাই আল্লাহ আমাদের জন্য বিশেষ বিশেষ সময় দেন, যেন আমরা ঘাটতি পূরণ করতে পারি। যদি রমজানে কিছু মিস হয়ে যায়, তাহলে এই দিনগুলো আরেকটি সুযোগ।
তবে মনে রাখতে হবে—যেমন নেকির সওয়াব বাড়ে, তেমনি এই সময়ের গুনাহও বেশি গুরুতর হয়। আল্লাহ যে সময়কে সম্মানিত করেছেন, সেই সময়ে গুনাহ করা অকৃতজ্ঞতার মতো।
আল্লাহ শুধু দিনের নয়, রাতের কথাও বলেছেন। জিলহজ্জের রাতগুলোও বরকতময়। রাত হলো নিরিবিলি ইবাদতের সময়—কাজ নেই, কোলাহল নেই, শুধু আপনি আর আল্লাহ। আপনি যদি আল্লাহর কাছাকাছি হতে চান, তাহলে এই রাতগুলোতে ইবাদত করার চেষ্টা করুন।
সবশেষে, হাদিসের একটি শব্দের দিকে খেয়াল করুন। নবী (সা:) বলেছেন, এই দিনগুলোর নেক আমল “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা। আমরা যাকে ভালোবাসি, সে যা পছন্দ করে, আমরাও তা গুরুত্ব দিই। তাই আল্লাহ যদি বলেন, কোনো কিছু তাঁর কাছে প্রিয়, তাহলে সেটি আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেওয়া উচিত।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেন এই মহান দশ দিনকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দেন। তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা ভালোবাসে, যা সম্মান করেন তা সম্মান করে, এবং আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করে। আমীন।
শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । ১৫ মে ২০২৬।