img

সিলেটে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা পুলিশের

প্রকাশিত :  ১৮:৫১, ০৯ এপ্রিল ২০২৬

 সিলেটে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা পুলিশের

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। প্রকাশ্যে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে চলছে সমালোচনা।

এ অবস্থায় ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তথ্যদাতাদের জন্য পুরষ্কার ঘোষণা করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)।

শুক্রবার সন্ধ্যায় এসএমপির ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

এতে বলা হয়- ‘সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন।

এই লক্ষ্যে পুলিশের নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি জনসাধারণকে অপরাধ দমনে সম্পৃক্ত ও উৎসাহিত করতে তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করা হয়েছে’।

পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘নাগরিকদের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোনো অপরাধী গ্রেপ্তার হলে, তথ্যদাতাকে উপযুক্ত পুরস্কার প্রদান করা হবে এবং তথ্যদাতার নাম ও পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।

তথ্য প্রদানের মাধ্যম হিসেবে মহানগর পুলিশের চালু করা GenieA App , এসএমপির হটলাইন নাম্বার: ০১৩৩৯৯১১৭৪২ এবং অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া & আইসিটি) এর মোবাইল নাম্বা ০১৩২০০৬৭০৩৮ উল্লেখ করা হয়।

ফেসবুক পোস্টের সবশেষে লেখা হয়- ‘আপনার একটি তথ্যই পারে অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। নিরাপদ সমাজ গঠনে এগিয়ে আসুন।’

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

বিপুল রঞ্জন চৌধুরী: সিলেটের সাংবাদিকতার এক দৃঢ় নৈতিকতার প্রতীক

প্রকাশিত :  ০৮:১৩, ৩১ মে ২০২৬

শতবর্ষের সাংবাদিকতার ধারায় শ্রীমঙ্গলের এক অবিচল নাম

সংগ্রাম দত্ত: তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে শ্রীমঙ্গল থানার ভীমসি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন বিপুল রঞ্জন চৌধুরী। ব্রিটিশ ভারতের সামাজিক বাস্তবতার ভেতর বেড়ে ওঠা এই মানুষটি পরবর্তীতে সিলেট অঞ্চলের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গভীরভাবে শ্রদ্ধেয় নাম হয়ে ওঠেন।

পারিবারিক দায়িত্বের ভার, শৃঙ্খলা ও নৈতিক অবস্থান—এই তিনটি ভিত্তির ওপর তাঁর ব্যক্তিজীবন গড়ে ওঠে। অল্প বয়সেই পারিবারিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি জীবনের সিদ্ধান্তে পরিণত হন দৃঢ় ও সুসংহত।

চল্লিশের দশকে কলকাতার আনন্দবাজার, স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার এবং আগরতলার সংবাদ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হিসেবে তাঁর সংবাদজগতের সঙ্গে পরিচয়। সেই পাঠাভ্যাসই ধীরে ধীরে তাঁকে সাংবাদিকতার গভীরে নিয়ে যায়।

১৯৬২ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক যুগভেরী–এর মাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে শিলচর, করিমগঞ্জ ও কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখায় ছিল অনুসন্ধানী দৃষ্টি, তথ্যনিষ্ঠতা এবং সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

সাংবাদিকতা তাঁর কাছে ছিল দায়িত্ব, পেশা নয় কেবল। তিনি বিশ্বাস করতেন—সত্যকে আড়াল করা সাংবাদিকতার ব্যর্থতা। তাই কখনোই তিনি সুবিধাবাদী অবস্থান নেননি বা হলুদ সাংবাদিকতার পথে হাঁটেননি।

মৃদুভাষী হলেও তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট। তিনি ছিলেন এমন এক সাংবাদিক, যিনি তোষামোদ বা প্রভাবিত ভাষার বাইরে থেকে সংবাদকে দেখেছেন বিবেকের আলোয়।

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়কাল ছিল এমন এক অধ্যায়, যখন সাংবাদিকতা ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আলোচনাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সহযোগিতার সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা।

সে সময় প্রেসক্লাবের কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন শ্রীমঙ্গলের একদল নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক ও সমাজচিন্তক। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো—

কমলেশ ভট্টাচার্য, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, জহির উদ্দিন আহমেদ, রানা দেবরায়, মো. আলফু মিয়া চৌধুরী, মো. আব্দুল গাফফার, এম এ সালাম চৌধুরী, আব্দুল হাই, বিধু ভূষণ পাল স্বপন, মহিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ মহরম খাঁন, গোপাল দেব চৌধুরী, সৈয়দ নেছার আহমেদসহ আরও অনেকে।

এই প্রজন্মের সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মতভেদকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সংস্কৃতি। নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা বা বিভাজনের পরিবর্তে সহযোগিতাই ছিল মূল শক্তি।

তাঁদের অনেকেই আজ প্রয়াত, কেউ কেউ বয়সজনিত কারণে সক্রিয় জীবন থেকে দূরে। বর্তমানে জীবিতদের মধ্যে রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ও জহির উদ্দিন আহমেদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একইসঙ্গে স্মরণযোগ্য বিষয় হলো—কমলেশ ভট্টাচার্য, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী এবং বিপুল রঞ্জন চৌধুরী ছিলেন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্বশীল অবস্থানে যুক্ত। তবু সাংবাদিকতা জগতে তাঁদের সততা, নিষ্ঠা ও পেশাগত মান নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। বরং তাঁরা একটি সময়ের আদর্শ সাংবাদিকতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

১৯৬০ সালে তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ, ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং ও নির্বাহী কমিটিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

ভূনবীর দশরথ উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং দশরথ উচ্চ বিদ্যালয়ের (বর্তমানে স্কুল অ্যান্ড কলেজ) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর জীবনযাপন ছিল শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নান্দনিক রুচির প্রতিফলন। সাদা পোশাক, শুদ্ধ ভাষা এবং নিখুঁত তথ্য উপস্থাপনা ছিল তাঁর পরিচয়ের অংশ। নিজের কাজ নিজে করা, সময়মতো দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো এবং নিয়মনীতি মেনে চলা ছিল তাঁর স্বভাব।

সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল গভীর—নজরুল সংগীত, শ্যামাসংগীত ও কীর্তন ছিল তাঁর প্রিয়। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ পরিবার নিয়ে রাত জেগে দেখতেন, বিশেষ করে আর্জেন্টিনার প্রতি ছিল তাঁর আবেগ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনে এক গভীর ক্ষতের চিহ্ন রেখে যায়। পারিবারিক সম্পদ, জমিজমা ও গৃহ সম্পূর্ণভাবে লুট হয়। পরে তিনি বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে ন্যায়বিচারের জন্য আবেদন করেন—প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সমাধান আসেনি।

এই অধ্যায় তাঁর জীবনে ব্যক্তিগত সংগ্রামের এক দীর্ঘ ইতিহাস হয়ে আছে।

২০১৫ সালের ৩০ মে, ৯২ বছর বয়সে তিনি শ্রীমঙ্গলের নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির নয়—বরং এক নৈতিক সাংবাদিকতা ঐতিহ্যের নীরব সমাপ্তি।

বিপুল রঞ্জন চৌধুরী রেখে গেছেন এক সাংবাদিকতার ধারা, যেখানে সত্য, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ ছিল মূল ভিত্তি। শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর নাম আজও একটি মানদণ্ড—যা নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সংবাদ কেবল তথ্য নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার।



সিলেটের খবর এর আরও খবর