বিদেশি বিনিয়োগের রুদ্ধদ্বার: আমলাতান্ত্রিক মরীচিকা ও স্বার্থান্বেষী বলয় ভাঙবে কে?
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
২০২৬ সালের মে মাস। বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আমাদের নীতিনির্ধারণী মহলের ভূমিকা এখনো মান্ধাতা আমলের ও রক্ষণশীলতায় মোড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী কিংবা পরিকল্পনা মন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি কি এখনো অস্পষ্ট যে, একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ স্রেফ ডলারের প্রবাহ নয়? বরং এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যখন ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তখন বিদেশি বিনিয়োগের পথে এই আমলাতান্ত্রিক বাধা লক্ষ্য অর্জনকে কেবল কঠিনই করবে না, বরং অসম্ভব করে তুলবে।
প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকালে আমাদের দৈন্যদশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া আজ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য 'রেড কার্পেট' বিছিয়ে দিয়েছে। আমিরাত তাদের বাণিজ্যিক আইন সংশোধন করে নির্দিষ্ট কিছু খাত বাদে শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করেছে। সিঙ্গাপুরের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইডিবি) বিনিয়োগকারীদের কেবল লাইসেন্সই দেয় না, বরং তাদের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করে। এমনকি মালয়েশিয়াও চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে 'নিউ ইনসেনটিভ ফ্রেমওয়ার্ক' (এনআইএফ) চালু করেছে, যা বিনিয়োগের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে কর ছাড় দিচ্ছে।
অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে একজন বিদেশি উদ্যোক্তাকে প্রায় ৫০টি দপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য মাসের পর মাস আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের কাছে রাষ্ট্রের নেতিবাচক ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তোলে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পথে দৃশ্যমান বাধার চেয়েও বিপজ্জনক হলো 'অদৃশ্য ছায়া'। একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিদেশি বড় কোম্পানির প্রবেশকে নিজেদের একচেটিয়া ব্যবসার জন্য হুমকি মনে করে। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির ব্যাকরণ বলে—বিদেশি বিনিয়োগ কেবল প্রতিযোগিতা বাড়ায় না, বরং স্থানীয় শিল্পের মানোন্নয়ন এবং 'ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ' শক্তিশালী করার মাধ্যমে পুরো ইকোসিস্টেমকে সমৃদ্ধ করে।
পরিসংখ্যান বলছে, এফডিআই-তে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গুটিকতক ব্যবসায়ীর সংকীর্ণ মুনাফা রক্ষা করতে গিয়ে দেশের কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট করার কোনো নৈতিক অধিকার কারও নেই। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক এই 'অলিগার্কি' বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর প্রভাব বলয় থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু পুঁজি আনেন না, তারা নিয়ে আসেন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, অর্জিত লভ্যাংশ এবং মূলধন নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার (Repatriation) ক্ষেত্রে তাদের এখনো নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। যদিও ২০২৬ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রক্রিয়া সহজ করার কিছু নির্দেশনা দিয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তার সুফল মিলছে না বললেই চলে।
আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, আপনার ঘোষিত "বাংলাদেশ ফার্স্ট" দর্শনের সফল বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা অপরিহার্য। বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখন আর খণ্ড খণ্ড উদ্যোগ নয়, বরং একটি শক্তিশালী 'একক কর্তৃপক্ষ' (Unified Authority) গঠন করা জরুরি; যেখানে একজন বিনিয়োগকারী কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।
মনে রাখতে হবে, বিদেশি বিনিয়োগের বদ্ধ কপাট না খুললে বাংলাদেশের উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।



















