img

শ্রীমঙ্গলে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ে উদ্বেগ: নাগরিক সমাজের প্রতিরোধের ডাক, পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান

প্রকাশিত :  ০৫:৫৬, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:৩০, ২৩ মে ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ে উদ্বেগ: নাগরিক সমাজের প্রতিরোধের ডাক, পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিকে ঘিরে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে ইয়াবাসহ একাধিক আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় নাগরিক সমাজ অভিযোগ করছে—মাদক ব্যবসার মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক হামলা, গ্রেপ্তার অভিযান ও নাগরিক আন্দোলন মিলিয়ে পুরো উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

শ্রমিক নেতার ওপর হামলার পর চাঞ্চল্য

গত ১২ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে শ্রীমঙ্গলের শাপলাবাগ এলাকায় সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি লুৎফুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর আক্রমণ চালায়। তিনি পালানোর চেষ্টা করলে তার চোখে মরিচের গুঁড়া ছুড়ে মারা হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় তাকে।

এই ঘটনার পর শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে শাপলাবাগ, সোনারবাংলা রোড ও রেল কলোনি এলাকা থেকে পাঁচজন চিহ্নিত আসামিকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

পুলিশের অভিযানে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার

শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের পৃথক অভিযানে গত এপ্রিল ও মে মাসে অন্তত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাদক মামলার আসামি, ওয়ারেন্টভুক্ত ব্যক্তি ও ছিনতাই মামলার অভিযুক্তও রয়েছেন।

১৭ এপ্রিল রাতে মির্জাপুর ইউনিয়নের বৌলাশিরা গ্রামে অভিযান চালিয়ে রুবেল মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে ৯৯ পিস ইয়াবা ও একটি মোটরসাইকেলসহ আটক করা হয়। পরে ১৮ এপ্রিল ভোরে ভানুগাছ সড়কের চেকপোস্ট থেকে আরও দুইজনকে ২৭ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ ছাড়া ২১ মে রাতে সিন্দুরখান ইউনিয়নের দক্ষিণ টুক এলাকায় পরিচালিত আরেক অভিযানে ছয়জন কথিত মাদক কারবারিকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ২২৫ পিস ইয়াবা ও মাদক বিক্রির নগদ ২ লাখ ৫ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল ইসলাম মুন্না গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

১৭ মে সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক পরিষদের অভিযোগ

মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে গত ১৭ মে রোববার সকাল ১১টায় শ্রীমঙ্গল শহরের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নাগরিক পরিষদ।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মো. মোসাব্বির আলম মাসুদ সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, শ্রীমঙ্গলে সক্রিয় একটি চক্র স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে শহরের বিভিন্ন সড়ক, দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। তিনি দাবি করেন, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়ে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।

মোসাব্বির আলম মাসুদ বলেন, শহরের একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা এবং একটি মার্কেটের ২০ থেকে ২৫টি দোকান থেকে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন বলেও জানান।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি শ্রীমঙ্গলের মাদকের বিস্তারকে “ভয়াবহ সামাজিক দুর্যোগ” হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, শহরের বিভিন্ন এলাকায় চিহ্নিত মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও মাদকাসক্তদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

মোসাব্বির আলম মাসুদ আরও অভিযোগ করেন, মাদকের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নেওয়ায় তিনি নিজেও হুমকির মুখে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে এবং মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার অন্যদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নিহত পরিবারের আহাজারি

সংবাদ সম্মেলনে মাদকাসক্তদের হাতে নিহত কয়েকজনের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা স্বজন হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। বক্তারা বলেন, মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করছে।

নাগরিকদের করণীয় নিয়ে প্রস্তাব

মোসাব্বির আলম মাসুদ সংবাদ সম্মেলনে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় মাদক নির্মূলে কিছু প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউএনও, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে জরুরি সভা আহ্বানের দাবি জানান।

তার প্রস্তাবের মধ্যে ছিল—

মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া,

আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা,

মাদক ব্যবসা অব্যাহত রাখলে সামাজিক ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও তরুণদের সচেতন করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

বাড়ছে সামাজিক উদ্বেগ

স্থানীয়দের মতে, শ্রীমঙ্গলে মাদক ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুরি, ছিনতাই ও সহিংস ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, তবু সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাটছে না।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, সামাজিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।



সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে ফের দুর্ঘটনা, নিহত ২

প্রকাশিত :  ১৪:৪৮, ২৩ মে ২০২৬

বাস ও লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে একজন নিহত এবং তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

বুধবার (২০মে) দুপুরে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আহসানমারা সেতু এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এরআগে মঙ্গলবার রাতে একই মহাসড়কের পাগলা মাদ্রাসাপাড়া এলাকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরও একজন প্রাণ হারিয়েছেন।

দুর্ঘটনায় আহতদের উদ্ধার করে সিলেট ও সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত জাহের সুনামগঞ্জ সদর থানাধীন নারায়ণপুর গ্রামের আলফা উদ্দিনের ছেলে।

আহতরা হলেন- শান্তিগঞ্জ থানাধীন জয় কলেজ ইউনিয়নের গা আগলে গ্রামের মৃত মুছলেছ মিয়ার ছেলে আব্দুল জাহান(৪০) একই গ্রামের আবদুল জাহানের মেয়ে লুৎফা বেগম (৮) ও ছাতক থানাধীন জাউয়া বাজার ইউনিয়নের গণিপুর গ্রামের কাদির মিয়ার তৌরিজ মিয়া।

আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জমুখী একটি দূরপাল্লার বাসের সঙ্গে সিলেটগামী একটি লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর ঘাতক বাসটি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর যান চলাচল স্বাভাবিক করতে শান্তিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধারকাজ ও সড়ক পরিষ্কারের কাজ করেন।

এদিকে, মঙ্গলবার রাতে একই মহাসড়কের পাগলা মাদ্রাসাপাড়া এলাকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরও একজন প্রাণ হারিয়েছেন।

শান্তিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ অলিউল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আহসানমারা সেতু এলাকায় বাস ও লেগুনার সংঘর্ষে পৃথক স্থানে দুইজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও তিনজন।

উল্লেখ্য, একই মহাসড়কে দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। গত ১৫ এপ্রিল পাগলা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন দুইজন। এছাড়া গতরাতে পাগলা মাদ্রাসাপাড়া এলাকায় আরেক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান একজন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আজ আবারও ঝরল একটি প্রাণ।

স্থানীয়দের দাবি, মহাসড়কে বেপরোয়া যান চলাচল ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর