img

ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষী লুটপাটের বাজেট : জামায়াত

প্রকাশিত :  ১০:৩৭, ১২ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:১৩, ১২ জুন ২০২৬

ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষী লুটপাটের বাজেট : জামায়াত

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়ন-সক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটি অভিযোগ করেছে, এই বাজেট লুটপাট ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

সরকার কর্তৃক জাতীয় সংসদে পেশ করা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় এসব বলেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। 

বাজেট প্রতিক্রিয়া জানাতে আজ (শুক্রবার) দুপুরে মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে  আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটটি ব্যাংক ও বৈদেশিক বিরাট ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আর্থিক সংস্থান করতে গিয়ে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে, সেই রাজস্ব কিভাবে আদায় করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাজেটের ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা কোথা থেকে পূরণ করা হবে- সেটি স্পষ্ট নয়। যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে সেখানে যে কর কাঠামো, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন, সেগুলোর উল্লেখ নেই। 

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, এবারের বড় ঘাটতি বাজেটের যে ব্যয় সংকুলান, তা ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে। 

তিনি আরও বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি হলো উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি। এর মূল্য বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতির সবখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

দ্বিতীয়ত, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে। 

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

জামায়াতের ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, গতকাল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫৫তম জাতীয় বাজেট। জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়নি।

মিয়া গোলাম পওয়ার বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।  

বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে তিনি বলেন, বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

গোলাম পরওয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে এডিপির আকার বৃদ্ধি করলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। 

জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, জামায়াতের ছায়া বাজেটে আমরা অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দিয়েছি। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছর জুনে শেষ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই আমরা একটি অধিক কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ উন্নয়ন ব্যয় কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছি। 

গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান সরকারের গৃহীত এসব অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত আমাদের পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের নীতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ছাড়াও উচ্চাভিলাষী এই বাজেটের অর্থায়ন করতে গিয়ে সরকারকে অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছে। দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। 

সাবেক এ সংসদ সদস্য বলেন, ন্যূনতম ব্যক্তিগত করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতির কারণে যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, সেখানে অতিরিক্ত করের বোঝা জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে। 

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাজেটে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ব্যয় ও কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি জনজীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনবে। আরএমজি তথা তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের রপ্তানি খাতকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা এই গণবিরোধী বাজেটের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

এই বাজেট প্রণয়নে যে ধরনের হঠকারিতা প্রদর্শন করা হয়েছে, জনগণ তা মেনে নেবে না। তাই অবিলম্বে এই উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটনির্ভর বাজেট সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও জনকল্যাণমূলক বাজেট প্রণয়নের জন্য আমরা জোর দাবি জানাই। 

তিনি বলেন, পরিচালন ব্যয়ের আধিক্য এবং সুদের বোঝায় উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হয়েছে, প্রবৃদ্ধির গতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি এবং ঘাটতি বাজেট আরও বিস্তৃত হয়েছে। জিডিপির অনুপাতে ঘাটতির হার ৩.৫ শতাংশ। কিন্তু এই ঘাটতির অর্থায়ন প্রক্রিয়া মোটেও ঝুঁকিমুক্ত নয়।

এ বাজেটে সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট। প্রথমত, এনবিআরের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে হলে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত কর প্রশাসন প্রয়োজন, যা এখনো গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সরকার কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি। তৃতীয়ত, ঋণ ব্যবস্থাপনা। দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদের চাপ সামাল দেওয়াও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, আর জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকার জামায়াতের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে বলে আমরা মনে করি, বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, বাজেট ঘাটতির ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তাবিত ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ জামায়াতের বাজেটে ঘাটতি অনেক কম, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ; সেখানে সরকারের ঘাটতি ৩.৫ শতাংশ। সরকারি বাজেট ও জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটের মধ্যে পার্থক্য শুধু সংখ্যাগত নয়; অর্থনৈতিক দর্শন, নীতিগত অবস্থান এবং বাস্তবায়ন কৌশলেও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াত আমির অর্থবছর পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন। বর্তমানে জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরভিত্তিক অর্থবছর চালু।

তিনি বলেন, কর আদায় পদ্ধতি সহজ করা এবং করদাতাদের স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রেখেছে। কিন্তু আমরা প্রস্তাব করেছি এই সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার এবং পরবর্তী পর্যায়ে তা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার। ব্যয়ের অগ্রাধিকার, খাতভিত্তিক বরাদ্দ এবং কর কাঠামো সংস্কার নিয়ে আমাদের ছায়া বাজেটে বিস্তারিত প্রস্তাব রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটে মূলত একটি জনকল্যাণমুখী ও সংস্কারপন্থী অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। সরকারের বাজেটের তুলনায় এটি কম ঘাটতিনির্ভর এবং কম বৈদেশিক ঋণনির্ভর। জাতীয় সংসদে বাজেট নিয়ে অর্থবহ আলোচনা, বিরোধী মতামত গ্রহণ এবং বিভিন্ন সংশোধনী বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে বাজেট আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারে, বলেন তিনি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আমরা আশা করি, সরকার গঠনমূলক প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাজেট সংশোধন করবে এবং বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও অনিয়মের লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ব্যাংক রেজোলিউশন আইন করে জনগণের অর্থ লুটপাট, কালো টাকা বিদেশে পাচার এবং ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জনগণের টাকা লুটপাট করে, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হাতে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ যে ফ্যাসিবাদী পথ দেখিয়ে গিয়েছিল, বর্তমান সরকারও যদি সে পথেই হাঁটে, তাহলে পরিস্থিতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমিরে জামায়াত সংসদে তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, যাদের শেয়ার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের শেয়ার যে মূল্যে নেওয়া হয়েছে, সেই মূল্যে ফেরত দেওয়া হোক। একইভাবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পরিবর্তন করে রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতারও আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। ব্যাংকিং খাতে এই নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা অব্যাহত থাকলে শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, গোটা অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়বে। বেকারত্ব কমবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, বিনিয়োগ বাড়বে না। আমরা একটি কঠিন অর্থনৈতিক সংকটের দিকে এগিয়ে যাব।

তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন, এই লুটপাটনির্ভর বাজেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। এটি জনবান্ধব নয়, উন্নয়নবান্ধব নয়; বরং গণবিরোধী বাজেট।

সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে বলেন, বাজেটে যে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবারও রাখা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। বাজেটকে দুর্নীতি ও কালো অর্থের প্রভাবমুক্ত করে একটি জনমুখী ও জনকল্যাণমূলক বাজেটে রূপান্তর করতে হবে। সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ৩০ জুন বাজেট পাস হওয়ার আগে সংসদে যথাযথ আলোচনা, সংশোধনী ও মতামত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সরকার যেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের মতামত উপেক্ষা না করে। যেভাবে গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করা হয়েছে, সেভাবে যেন জনগণের মতামত উপেক্ষা করে এই গণবিরোধী বাজেট চাপিয়ে দেওয়া না হয়। আমিরে জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তিনি। 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন।

জাতীয় এর আরও খবর

img

দিল্লির বৈঠক থেকে বিজিবি-বিএসএফের শান্তির বার্তা, একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার

প্রকাশিত :  ১১:১৬, ১২ জুন ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে নানা চ্যালেঞ্জ ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশ ও ভারত আলোচনার মাধ্যমেই এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। নয়াদিল্লিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে সীমান্ত এলাকায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।

গত ৯ জুন শুরু হয়ে ১১ জুন শেষ হওয়া ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের এই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং ভারতের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। 

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের সীমান্তকে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং অপরাধমুক্ত রাখতে উভয় বাহিনী ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে। সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমিয়ে আনা, পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে। 

বৈঠকে সীমান্ত হত্যা, অনিয়মিত অনুপ্রবেশ, মানবপাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয়পক্ষই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতার মনোভাব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতপার্থক্য দেখা দিলেও দুই দেশের শীর্ষ সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে খোলামেলা আলোচনা হওয়া একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই ধরনের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে সীমান্ত সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। 

যৌথ বিবৃতিতে উভয় বাহিনী সীমান্তে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণের বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে যখন সীমান্ত প্রশ্নে নানা ধরনের উত্তেজনা ও সংঘাত দেখা যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে। দিল্লির এই বৈঠক তাই শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা নয়, বরং দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আস্থা, সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত হলে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

জাতীয় এর আরও খবর