ইসলামী ব্যাংককে আরো ২৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
প্রকাশিত :
১০:০২, ১৫ জুন ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্যসংকট কমাতে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংককে আরো ২৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার দিয়েছে। আজ সোমবার (১৫ জুন) ইসলামী ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে রবিবার ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়ার কথা জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ হাজার কোটি টাকা চাওয়ার বিপরীতে প্রাথমিকভাবে এই অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে ব্যাংকটিকে। চলতি মাসে প্রথম ১০ দিনে আমানতকারীদের নগদ টাকা উত্তোলনের চাপ সামাল দিতেই মূলত এই বিশেষ ধার দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে গভর্নর প্রয়োজনে নগদ সহায়তার বিষয়ে নিশ্চিত করেন।
একই সঙ্গে প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে আরো সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ৯ দিনে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। এ ছাড়া ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা।
পরবর্তী দুই দিনে আরো প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়। এতে কয়েকটি শাখা ও এটিএম বুথে নগদ অর্থের চাপ তৈরি হয়।
এরপর বিকেলে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), দুইজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
পরে রাতে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব নিয়োগ বাতিল করে বোর্ডের সার্বিক দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেনকে নিযুক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
করের পাঁচ বছরের পথরেখা: স্বস্তির বার্তা, নাকি নতুন উদ্বেগের সূচনা?
প্রকাশিত :
০৫:৫৪, ১৫ জুন ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ০৫:৫৮, ১৫ জুন ২০২৬
রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের করব্যবস্থা নিয়ে করদাতাদের দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব। প্রায় প্রতি বাজেটেই করহার, করমুক্ত আয়সীমা কিংবা কর কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। ফলে ব্যক্তি করদাতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারী—সবার জন্যই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের একটি কর পথরেখা ঘোষণা করেছে। দেশের কর ইতিহাসে এমন উদ্যোগ এই প্রথম।
নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ এর মাধ্যমে করদাতারা অন্তত আগামী কয়েক বছরে তাঁদের করের দায় কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পাবেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পূর্বানুমানযোগ্যতা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি পর্যায়ের সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং পারিবারিক ব্যয় পরিকল্পনায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগের মন্থর গতির মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
কর পথরেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিশেষ শ্রেণির নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত করসুবিধা রাখা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও নতুন কর কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করস্ল্যাবটি বাতিল করেছে। ফলে করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর প্রথম করযোগ্য আয়ের ওপর এখন থেকে সরাসরি ১০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। বিষয়টি কাগজে-কলমে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত করদাতাদের ওপর।
যাঁদের আয় করমুক্ত সীমার সামান্য ওপরে, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই করের পরিমাণ আগের তুলনায় কমবে না; বরং বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির মাধ্যমে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার একটি অংশ উচ্চতর প্রাথমিক করহারের কারণে আবার ফিরে নেওয়া হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। মূল্যস্ফীতির চাপে যখন পরিবারের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তখন অতিরিক্ত করের বোঝা মধ্যবিত্তের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
করব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু রাজস্ব সংগ্রহ নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি কার্যকর কর কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যা নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করবে এবং বিদ্যমান করদাতাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করবে। কিন্তু করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পরপরই তুলনামূলক উচ্চ করহার আরোপ করা হলে অনেকের কাছেই করব্যবস্থাকে নিরুৎসাহব্যঞ্জক মনে হতে পারে।
অবশ্য সরকারের অবস্থানও পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও উদ্বেগজনকভাবে কম। সীমিতসংখ্যক করদাতার ওপরই রাজস্ব আহরণের বড় অংশ নির্ভরশীল। করফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয় এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার কর প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চাপ সরকারের ওপর রয়েছে—এ কথাও সত্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনটি? বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা, নাকি করের আওতা সম্প্রসারণ করে নতুন করদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করা?
এই প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতিবিদেরা বহুবার দিয়েছেন। করহার বৃদ্ধি বা স্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বরং প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন, তথ্যভিত্তিক নজরদারি, করফাঁকি প্রতিরোধ এবং নতুন করদাতাদের করের আওতায় আনার উদ্যোগই হতে পারে আরও টেকসই সমাধান।
পাঁচ বছরের কর পথরেখা একদিকে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের জন্য কিছু নতুন উদ্বেগও সামনে নিয়ে এসেছে। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করস্ল্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিও একেবারে অযৌক্তিক নয়।
রাজস্ব সংগ্রহ রাষ্ট্রের প্রয়োজন। তবে সেই রাজস্ব আহরণের পদ্ধতি ও ভারসাম্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি করব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত টাকা আদায় হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং করদাতারা সেটিকে কতটা ন্যায়সংগত, যুক্তিসংগত এবং গ্রহণযোগ্য মনে করছেন, সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য।