img

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অপেক্ষায় বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম

প্রকাশিত :  ০৬:৪৯, ২৪ আগষ্ট ২০২৬

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অপেক্ষায় বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম

এশিয়ার বাজারে সপ্তাহের প্রথম দিনের লেনদেন শুরুতেই তেলের দাম কমেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার আশায় তেলের দামে এই পতন দেখা গেল।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ৪৫ ডলারে নেমে যায়।  একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস মিডিয়েটেরও (ডব্লিউটিআই)  দামও ১ শতাংশের বেশি কমে ৮৬ দশমিক ১৪ ডলারে দাঁড়ায়।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের একটি ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ আসছে।  আজ (সোমবার) বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেবেন বলে জানা গেছে।

বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেলে তেলের বাজারের পরবর্তী গতিপথ আরও পরিষ্কার হবে।

img

৩৫২টি শেয়ারে লাল সংকেত: পুঁজিবাজার কি আবার আস্থার সংকটে?

প্রকাশিত :  ১৫:১৫, ২৪ আগষ্ট ২০২৬

ঢাকার পুঁজিবাজারের সোমবারের চিত্র শুধু একটি খারাপ দিনের বাজারদর নয়, এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থার গভীর সংকটের একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৭৮ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৫৭ পয়েন্টে নেমেছে। সূচকের পতন ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস কমেছে ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং ব্লুচিপ সূচক ডিএস৩০ কমেছে শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ।

কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি সূচকের পতনে নয়, বাজারের ব্যাপক অংশে একসঙ্গে বিক্রির চাপে। দিনের হিসাবে ৩৫২টি কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ১৩টির। ১৭টি কোম্পানির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ বাজারে ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার আধিপত্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট।

এমন পরিস্থিতিকে শুধু স্বাভাবিক বাজার সংশোধন বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সূচকের পতনের সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও দুর্বল হয়েছে। আপনার দেওয়া চার্ট অনুযায়ী দিনের মোট লেনদেনের মূল্য ছিল প্রায় ৬০১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, এটি আগস্ট মাসের এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন দৈনিক লেনদেনের কাছাকাছি এবং আগের দিনের তুলনায় লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কেন এমন হচ্ছে?

পুঁজিবাজারে আস্থা নষ্ট হলে প্রথমে যে জিনিসটি দেখা যায়, তা হলো বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া। তখন ভালো কোম্পানির শেয়ারও বিক্রির চাপ থেকে পুরোপুরি রেহাই পায় না। বর্তমান বাজারচিত্রে সেই প্রবণতাই দৃশ্যমান।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতির বাস্তব কিছু চাপ। সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণে জ্বালানি সংকট, শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন এবং কোম্পানিগুলোর আয় নিয়ে উদ্বেগকে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব শেয়ারবাজারে কেন পড়বে, সেটি বোঝা কঠিন নয়। একটি কারখানা যদি গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমায় বা বন্ধ রাখে, তাহলে তার বিক্রি কমবে, খরচ বাড়বে, মুনাফা কমবে। শেষ পর্যন্ত তার শেয়ারের মূল্যায়নেও চাপ পড়বে। সম্প্রতি একটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কারখানা গ্যাস সংকট ও কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে ছয় মাসের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণার পর শেয়ারের দরে বড় পতন হয়েছে।

অর্থাৎ পুঁজিবাজারের সমস্যা কেবল পুঁজিবাজারের ভেতরে নেই। অর্থনীতির বাস্তব সংকটও এখন সরাসরি শেয়ারের দরে প্রতিফলিত হচ্ছে।

বাজারে ভয় বাড়ছে, নাকি বিশ্বাস কমছে?

এই প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো বাজারে ৩৫২টি শেয়ারের দর কমে গেলে ধরে নিতে হয়, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একজন বিনিয়োগকারী হয়তো একটি কোম্পানির দুর্বল ফলাফলের কারণে শেয়ার বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু যখন বাজারের অধিকাংশ শেয়ার একই দিনে পড়ে যায়, তখন বিষয়টি আর একটি বা দুটি কোম্পানির সমস্যা থাকে না। তখন সেটি হয়ে যায় বাজারব্যাপী আস্থার প্রশ্ন।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, আস্থা। সেই আস্থা দুর্বল হলে ভালো নীতিও বাজারকে দ্রুত ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে পারে না।

সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবশ্য সংস্কারের কথা বলছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বাজার সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিনিয়োগকারী শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, তথ্য প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু বাজারে নীতির ঘোষণা আর বিনিয়োগকারীর আস্থার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য আছে। বিনিয়োগকারী ফলাফল দেখতে চান।

সরকারের করণীয় কোথায়?

এখন সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ হওয়া উচিত বাজারকে কৃত্রিমভাবে ওপরে তোলা নয়, বরং বাজারকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।

প্রথমত, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ায় বা কমায়, গুজব ছড়ায় কিংবা সংঘবদ্ধভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তদন্ত ও শাস্তির প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক তথ্যের মান নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন, অস্পষ্ট মালিকানা কাঠামো, অনিয়মিত তথ্য প্রকাশ কিংবা পরিচালকদের স্বার্থের সংঘাত বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ধ্বংস করে। ভালো কোম্পানি ও দুর্বল কোম্পানিকে একই পাল্লায় রাখলে বাজার কখনো গভীর হবে না।

তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে হবে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা কোম্পানি ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিলকে শক্তিশালী না করলে বাজার বারবার খুচরা বিনিয়োগকারীর আবেগনির্ভর লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। বাংলাদেশি পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার মধ্যে মানসম্মত সিকিউরিটিজের ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের দুর্বলতাকেও সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চতুর্থত, ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে হবে। শুধু আইপিওর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যবসা, স্বচ্ছ আর্থিক হিসাব, ভালো করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা করার সক্ষমতা রয়েছে এমন কোম্পানি। আইপিও বাজারকে কোম্পানির অর্থ সংগ্রহের জায়গা বানাতে হবে, দুর্বল কোম্পানির জন্য বেরিয়ে যাওয়ার দরজা বানানো যাবে না।

পঞ্চমত, করব্যবস্থা বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে করনীতি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়া জরুরি। বারবার নীতির পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

ষষ্ঠত, জ্বালানি ও শিল্পখাতের সমস্যা সমাধান করতে হবে। কারণ পুঁজিবাজার অর্থনীতির আয়না। অর্থনীতির উৎপাদন যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে শেয়ারবাজারকে আলাদা করে সুস্থ রাখা কঠিন। বর্তমান পতনের সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও করপোরেট আয়ের উদ্বেগের যে সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে, সেটি সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

শুধু সূচক নয়, দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন

সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হবে প্রতিদিনের সূচক দেখে পুঁজিবাজারের স্বাস্থ্য বিচার করা। আজ ডিএসইএক্স বাড়ল, কাল কমল, এটিই বাজারের পূর্ণ চিত্র নয়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন কি না। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে কি না। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে কি না। মিউচুয়াল ফান্ড শক্তিশালী হচ্ছে কি না। কোম্পানিগুলো সময়মতো সঠিক তথ্য দিচ্ছে কি না। কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হচ্ছে কি না। সাধারণ বিনিয়োগকারী বাজারে ন্যায়বিচার পাওয়ার বিশ্বাস রাখছেন কি না।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিবাচক না হলে সূচক কয়েকশ পয়েন্ট বাড়িয়েও পুঁজিবাজারকে টেকসই করা যাবে না।

সরকার ইতিমধ্যে পুঁজিবাজারে সংস্কার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও বাজারের স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পণ্য বৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগকারী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

এখন প্রয়োজন সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো।

পুঁজিবাজারকে অবহেলা করার সুযোগ নেই

বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন একটি কার্যকর পুঁজিবাজারের প্রয়োজন আরও বেশি। ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সব ধরনের বিনিয়োগের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বড় শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের বিকল্প উৎস দরকার।

সেই জায়গায় পুঁজিবাজারের ভূমিকা অপরিসীম।

কিন্তু পুঁজিবাজার যদি সাধারণ মানুষের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনির্ভরযোগ্য জায়গা হিসেবে পরিচিত হয়, তাহলে অর্থনীতির জন্যও এটি বড় ক্ষতি। তাই আজকের ৩৫২টি দরপতনকে শুধু লাল দিনের হিসাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাজারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটি সতর্কবার্তা।

বার্তাটি খুব পরিষ্কার।

পুঁজিবাজারকে কৃত্রিমভাবে টেনে তোলার দরকার নেই। দরকার এমন একটি বাজার তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারী জানবেন, ভালো কোম্পানির মূল্য একদিন না একদিন বাজার দেবে, আর অনিয়ম করে কেউ পার পেয়ে যাবে না।

আজ ডিএসইএক্স ৭৮ পয়েন্ট কমেছে। কাল হয়তো আবার বাড়বে। কিন্তু সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত আগামীকালকের সূচক নয়, আগামী দশকের পুঁজিবাজার।

কারণ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগকারীর সম্পদ বাড়ায় না, শিল্পকে মূলধন দেয়, উদ্যোক্তা তৈরি করে, কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ভিত শক্ত করে।

তাই প্রশ্ন এখন আর পুঁজিবাজার কেন পড়ছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার আর কত দিন অপেক্ষা করবে?

অর্থনীতি এর আরও খবর