img

শেয়ারবাজারে ধস: সূচক নেমে ৫২০৫-এ, বিনিয়োগকারীদের মনে আতঙ্ক!

প্রকাশিত :  ১৫:৩৮, ০৬ এপ্রিল ২০২৫

শেয়ারবাজারে ধস: সূচক নেমে ৫২০৫-এ, বিনিয়োগকারীদের মনে আতঙ্ক!

আজ রবিবার, ৬ এপ্রিল ২০২৫। সকাল থেকেই ঢাকার মতিঝিলে বিরাজ করছে এক অজানা শঙ্কার ছায়া। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে বিনিয়োগকারীদের মুখে চাপা উদ্বেগ স্পষ্ট। আর দুপুর গড়াতেই সেই উদ্বেগ রূপ নেয় হতাশায়। বাজার বন্ধের সময় দেখা যায়—ডিএসইএক্স সূচক নেমে এসেছে ৫২০৫.১৯ পয়েন্টে। মাত্র একদিনেই পতন হয়েছে ১৩.৯৭ শতাংশ—এ যেন এক প্রবল ধাক্কা।

দিনভর লেনদেন হয়েছে মাত্র ৪১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার, যেখানে গত মাসগুলোতে গড় লেনদেন ছিল এর দ্বিগুণেরও বেশি। বিনিয়োগকারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই পতনের শেষ কোথায়? শেয়ারবাজার কি আবার ২০১০ সালের মতো আরেকটি বিপর্যয়ের পথে হাঁটছে?

সকাল ১০টায় লেনদেন শুরু হতেই সূচকের ওপর চাপ পড়তে থাকে। প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই সূচক নেমে যায় ৫২০০ পয়েন্টের নিচে। দুপুর নাগাদ সেই পতন আরও তীব্র হয়। পুনরায় সূচক নেমে যায় ৫২০০-এর নিচে। যদিও শেষ ঘণ্টায় কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে দিনশেষে সূচক দাঁড়ায় ৫২০৫.১৯-এ।

ব্রোকারেজ হাউসগুলো ছিল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। লেনদেনরত অনেকেই নীরবভাবে কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ গেঁথে বসে ছিলেন। জ‌নৈক ব্রোকার বলেন, \"বড় খেলোয়াড়রা আজ বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য যেভাবে শেয়ার বিক্রি করেছেন, তাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও আতঙ্কে পড়ে গেছেন। সকাল থেকেই প্যানিক সেলিং শুরু হয়েছে।\"

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী আব্দুল হক, যিনি প্রায় এক যুগ ধরে এই বাজারে আছেন, বলেন, \"আমি অনেক উত্থান-পতন দেখেছি, কিন্তু আজকের মতো এতটা আতঙ্ক কখনো অনুভব করিনি। আমার পোর্টফোলিওতে ২০ লাখ টাকা ছিল, যা আজ কমে ১৫ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। কী হবে, বুঝতে পারছি না।\"

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধসের পেছনে একাধিক কারণ একযোগে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়ায় এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছে।

এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, ডলারের ঊর্ধ্বগতি, রপ্তানি আয়ে চাপ এবং শেয়ারবাজারবান্ধব বাজেটের অভাব—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরএমজি সেক্টর । শেয়ারদর ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতও বড় ধাক্কা খেয়েছে।

তবে সবাই এতটা নিরাশ নন। বিশ্লেষক মাহমুদুল হাসান বলেন, \"এই পতন বাজারের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর সংশোধন হতে পারে। অনেক শেয়ারের দাম বাস্তবতার তুলনায় অতি উচ্চে পৌঁছে গিয়েছিল। এখন বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ভাবতে পারবেন।\" তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সরকার ও বিএসইসি যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে বাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব।

লেনদেনের পরিমাণও এখন একটি বড় চিন্তার বিষয়। আজকের লেনদেন ছিল মাত্র ৪১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে আগের তিন মাসে গড় লেনদেন ছিল প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও কমে গেছে। গত মাসে যেখানে প্রায় ৫ হাজার নতুন বিও হিসাব খোলা হয়েছিল, সেখানে এই সপ্তাহে তা নেমে এসেছে ২ হাজারের নিচে।

বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ আজ এক বিবৃতিতে বলেন, \"বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।\" তিনি কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।

তবে বিনিয়োগকারীরা বলছেন—শুধু কথায় নয়, এবার তারা দেখতে চান বাস্তব ফল। কারণ, অতীতে বহু প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

এই ধসের প্রভাব শুধু শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা অর্থনীতিতেই পড়তে পারে। সাধারণ মানুষ যখন বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুঁজিবাজার দুর্বল হয়ে পড়ে।

আশার দিক হলো—বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে, নতুন আইপিও আসছে, যা বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ তৈরি করতে পারে। তবে তার আগে জরুরি আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বাজার বন্ধ হওয়ার পর মতিঝিলের বিভিন্ন সড়কে বিনিয়োগকারীদের গুঞ্জন চলতে থাকে। কেউ হতাশ হয়ে বাসায় ফিরছেন, কেউ আবার নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এক তরুণ বিনিয়োগকারী রাকিব হোসেন বলেন, \"আজ ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়ছি না। বাজার ওঠে, আবার পড়েও। এটা এক ধরনের খেলা—সাহস রাখতে হয়।\"

রাকিবের মতো আশাবাদীরা এখনও বিশ্বাস করেন—আলো একদিন আসবেই। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—সেই আলোর দেখা কবে মিলবে?

শেয়ারবাজারের এই উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন। কেউ টিকে যাবেন, কেউ হয়তো হারিয়ে যাবেন। কিন্তু দিনশেষে প্রত্যাশা একটাই—আস্থা ফিরুক, ঘুরে দাঁড়াক আমাদের শেয়ারবাজার।

img

টেকসই শেয়ারবাজার গঠনে ডিএসই ও সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের চুক্তি

প্রকাশিত :  ১৪:০১, ১৭ মে ২০২৬

দেশের পুঁজিবাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল করতে একজোটে কাজ করবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পিএলসি এবং সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

আজ রোববার (১৭ মে) ডিএসই’র পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সমঝোতা স্মারক অনুষ্ঠানে ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার এবং সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হেলাল হোসেনসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, পারস্পরিক সমন্বয় ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ফলে উদ্যোগটি দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুঁজিবাজারে এসএমই-দের অংশগ্রহণ বাড়াতে সক্ষমতা উন্নয়ন, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স ও কমপ্লায়েন্স বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।

সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হেলাল হোসেন বলেন, এসএমই কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলেও তারা অর্থায়ন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও কমপ্লায়েন্সসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসএমই-দের জন্য বিকল্প অর্থায়ন ও ইকুইটি ভিত্তিক মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। ডিএসই’র সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারমুখী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ডিএসই’র বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় উভয় প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষি খাতসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে একসাথে কাজ করবে। পাশাপাশি পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন, সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, জলবায়ু সহনশীলতা, বাণিজ্য সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠান দুটি যৌথভাবে সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি, সচেতনতামূলক কর্মশালা, ইনকিউবেশন সহায়তা এবং পরামর্শমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে অধিকতর অংশগ্রহণে উত্সাহিত হয়।

একই সঙ্গে গ্রিন বন্ড, সাসটেইনেবিলিটি-লিংকড বন্ড, সুকুক এবং ব্লেন্ডেড-ফাইন্যান্স মডেলসহ বিভিন্ন টেকসই অর্থায়ন পণ্য উন্নয়নেও পারস্পরিক সহযোগিতা করা হবে।


অর্থনীতি এর আরও খবর