২০১০ সালে সংঘটিত ইতিহাসের ভয়াবহ শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, বিচারহীন দেড় দশক!
সাইফুল খান (সিনিয়র স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট): বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ঘটে ২০১০ সালের শেষ ভাগে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনার সরকারের প্রথম মেয়াদে। সেই ঘটনায় শুধু কয়েকটি শেয়ার দর পতন হয়নি।ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল লাখো সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, যারা নিজেদের সঞ্চয়, ভিটেমাটি বিক্রি করে বিনিয়োগ করেছিলেন শেয়ারবাজারে। অথচ বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এই কেলেঙ্কারির মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়ে রক্ষা পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০৯ সালের পর শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক উত্থানের সূচনা হয়। তৎকালীন সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক ২ হাজার পয়েন্ট থেকে এক লাফে ৮ হাজার পয়েন্ট ছুঁয়ে ফেলে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে। পেছনে ছিল একদল প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী, যাদের অনেকেই সরকারি দলের ঘনিষ্ঠ। ব্যাংক, বিমা ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলে নেয়া হয় শেয়ারবাজারে পাম্প অ্যান্ড ডাম্প কৌশল প্রয়োগ করে দর কৃত্রিমভাবে বাড়াতে। তখনকার ব্যাংকগুলো হঠাৎ করে শেয়ারবাজারে প্রচুর বিনিয়োগ শুরু করে এবং এতে উৎসাহ দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু এসব ছিল সাজানো খেলা, যার ফলে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ বাজারে ঢুকে পড়ে যখন মূল্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
২০১০ সালের ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে শুরু হয় ভয়াবহ পতন। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বাজারে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ দরপতন ঘটে, এবং বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। পল্টন, মতিঝিল, বিজয়নগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়, পুলিশের লাঠিচার্জ ও গ্রেপ্তারে বহু ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী নির্যাতিত হন। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেন। অথচ বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়া হোতাদের বেশিরভাগকেই রক্ষা করে নেয় রাজনৈতিক ছায়া।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে, যার প্রধান ছিলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ৪২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে শেয়ারবাজার কারসাজিতে জড়িত ছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী কোম্পানি যেমন: ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, প্রিমিয়াম লিজিং, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আরএকে কেমিক্যালসসহ নাম উঠে আসে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর, যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল দৃশ্যমান। এছাড়া রিপোর্টে বিএসইসি, ডিএসই এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার গাফিলতি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখলেও শাস্তির মুখ দেখেনি কেউ। হাইকোর্টে একাধিক রিট হলেও দীর্ঘসূত্রতায় বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ও পরে কৌশলে দায় এড়াতে চুপ করে থাকে। বরং, কয়েক বছর পর দেখা যায় অনেক কারসাজিকারী আবারো নতুন নামে নতুন কোম্পানি নিয়ে বাজারে ফিরেছে।
পরবর্তীতে ২০১৯–২২ সাল পর্যন্ত একই ধরনের কারসাজি চলে এসেছে ঘুরেফিরে। ন্যাশনাল ব্যাংক, ফেয়ার ইলেকট্রনিকস, বেক্সিমকো, আরএন স্পিনিং সহ এমন বহু কোম্পানি শেয়ারের দাম হঠাৎ দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়িয়ে পরে ধ্বস নামায়। বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় বিনিয়োগকারীরা প্রতিনিয়ত ফাঁদে পড়ছে। এর পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, নিরীক্ষক সংস্থা ও কিছু কর্পোরেট মিডিয়ারও হাত রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলো বহুবার তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র বরাবরই নিরুত্তর থেকেছে। ২০১০ সালের কেলেঙ্কারি ছিল একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় ডাকাতি যা ক্ষমতার ছত্রছায়ায় সংগঠিত হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজার সংস্কারের জন্য স্বচ্ছ তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং বাজারে ‘ভ্যালু ইনভেস্টমেন্ট’ সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে এই আহ্বান যে বাস্তবায়ন হবে না এটি বিনিয়োগকারীদের তিক্ত অভিজ্ঞতায় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
প্রফেসর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাইলে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে নিচের আইনগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা সম্ভব। যা একদিকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে উদাহরণ হয়ে থাকবে:
১. বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন
নতুন সরকার একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে, যেখানে সাবেক বিচারপতি, নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদ ও তদন্তকারীরা থাকবেন। তাদের কাজ হবে—
২০১০ ও পরবর্তী কেলেঙ্কারির তথ্য পুনঃতদন্ত করা।
মূল হোতা, প্রতিষ্ঠান, জড়িত সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করা।
অর্থ পাচার ও জালিয়াতির তথ্য উন্মোচন করা।
২. মানিলন্ডারিং ও দুর্নীতি দমন আইনে মামলা
যারা শেয়ারবাজার থেকে হাজার কোটি টাকা তুলে বিদেশে পাচার করেছে বা ভুয়া তথ্য দিয়ে বাজারে কারসাজি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে নিচের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব—
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২,
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪,
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪০৫, ৪০৯, ৪২০ ধারা (বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি, প্রতারণা),
BSEC আইন ও স্টক এক্সচেঞ্জ রুলস অনুযায়ী ফৌজদারি অভিযোগ।
৩. সম্পদ জব্দ ও ক্ষতিপূরণ আদায়
অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের ওপর দুদক ও আদালতের মাধ্যমে জব্দাদেশ দেয়া যেতে পারে।
যেসব কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করেছে, তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব।
৪. নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ও স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে যারা দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুরোপুরি অরাজনৈতিক ও পেশাদার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা।
৫. নতুন আইন ও ট্রাইব্যুনাল
ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করতে।
ইনসাইডার ট্রেডিং, ম্যানিপুলেশন, সিন্ডিকেটিং প্রতিরোধে নতুন আইন ও প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি চালু করা যেতে পারে।
৬. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
যারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে—
মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (MLA) ব্যবহার করে অন্যান্য দেশের সাথে চুক্তি করে তদন্ত ও অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা।
সুইস ব্যাংকসহ অফশোর অ্যাকাউন্টগুলোতে নজরদারি।
৭. ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পুনর্বাসন তহবিল
বাজার থেকে সর্বস্ব হারানো লক্ষাধিক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট তহবিল গঠন করে—
১. ক্ষতিপূরণ,
২. সুদমুক্ত ঋণ,
৩. বিনিয়োগে প্রশিক্ষণ ও সাপোর্ট দেওয়া যেতে পারে।
বর্তমান সরকারের উচিত সময়ের ধুলোর নিচে পড়ে থাকা এই ঐতিহাসিক জালিয়াতির চিত্র সামনে এনে সুরাহা করা।



















