img

তৈরি পোশাক শিল্পে চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশিত :  ০৯:৩৫, ২৮ এপ্রিল ২০২৫

তৈরি পোশাক শিল্পে চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

২৭ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার । মোট রপ্তানি আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আসে ইইউতে পণ্য রপ্তানি থেকে। চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির দিক থেকে প্রতিযোগী সব দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের পোশাক। এ সময় বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭ শতাংশ। ভারতের ২৬, চীনের ২৫ ও ভিয়েতনামের ১৭ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের স্বস্তিকর এ রপ্তানি প্রবাহ আগামীতে ধরে রাখা যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য বিশ্লেষক এবং রপ্তানিকারকদের অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীন-ভিয়েতামের পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছেন। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশ দুটির পণ্য রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে চীনা পণ্য রপ্তানি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এতে বাধ্য হয়ে অন্য বাজারে একটা চাপ তৈরি করবে চীনা পণ্য।

গত ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশহ ৬৫ দেশের পণ্যে অতিরিক্ত বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের নজিরবহীন ঘটনার পর বিভিন্ন আলোচনায় এ উদ্বেগের কথা বলে আসছেন অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্য বিশ্লেষক ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তারা। নতুন ঘোষণা বহাল থাকলে বাংলাদেশের পণ্যে মোট শুল্কভার দাঁড়াবে ৫২ শতাংশ। ভিয়েতনামের পণ্যে ৬১ শতাংশ। চীনের পণ্যে শুল্ক হার হবে ১৪৫ শতাংশ। যদিও গত ৯ এপ্রিল থেকে ৯০ দিনের জন্য বাংলাদেশ, ভিয়েতনামসহ চীন বাদে অন্য সব দেশের পণ্যে বাড়তি শুল্ক স্থগিত রাখা হয়েছে। 

ইইউর বাজারে শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তালিকায় শীর্ষ স্থানে বরাবরের মতো চীন। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্যান্য বাজারের মতো ইইউর বাজারে রপ্তানিতে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় নেই ভিয়েতনাম। দেশটির অবস্থান এখানে ষষ্ঠ। তুরস্ক সেখানে তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ। চতুর্থ এবং পঞ্চম অবস্থানে যথাক্রমে ভারত ও কম্বোডিয়া। শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় পাকিস্তান সপ্তম, মরক্কো অষ্টম, শ্রীলঙ্কা নবম। আর দশম অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। 

ইইউর সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৫৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৩৬৯ কোটি ডলারের কিছু বেশি। তুরস্কের রপ্তানির পরিমাণ ১৬১ কোটি ডলার। ভারতের ৮৭ কোটি ডলারের কিছু কম। কম্বোডিয়ার ৭৮ কোটি ডলার এবং ভিয়েতনামের রপ্তানির পরিমাণ ৭৬ কোটি ডলার। ওই সময়ে মোট ১ হাজার ৬১০ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে ইইউ দেশগুলো। 

তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক  মহিউদ্দিন রুবেল সমকালকে বলেন, অনেকগুলো কারণে ইইউতে রপ্তানিতে এই ইতিবাচক প্রবণতা। ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পর চাহিদা বেড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিতে মূল্য সংযোজিত পণ্যের পরিমাণও কিছুটা বেড়েছে। নিরাপত্তা উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের প্রতি ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। হাতে রপ্তানি আদেশের পরিমাণ বেশ ভালো।  

আগামী বছরের নভেম্বর মাসে এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ হবে বাংলাদেশের। পরবর্তী তিন বছরও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। এর পর আর এ সুবিধা থাকবে না। বাংলাদেশ যে ধরনের পণ্য রপ্তানি করে থাকে, সেগুলোর ওপর তখন গড়ে ৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। অন্যদিকে প্রতিযোগী ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) পুরোপুরি কার্যকর হবে ২০২৭ সালে। অর্থাৎ ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের আজকের অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আশঙ্কা, ইইউ এবং অন্যান্য বাজার মিলে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ রপ্তানি আয় হারাবে বাংলাদেশ। ২০২০ সালে ইইউ-ভিয়েতনাম এফটিএ আংশিকভাবে কার্যকর হয়। এখন পর্যন্ত ভিয়েতনামের ৭১ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা ভোগ করছে। এ তালিকায় তৈরি পোশাক নেই। গড়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ শুল্কারোপ রয়েছে পোশাক পণ্যে। 


অর্থনীতি এর আরও খবর

img

করের পাঁচ বছরের পথরেখা: স্বস্তির বার্তা, নাকি নতুন উদ্বেগের সূচনা?

প্রকাশিত :  ০৫:৫৪, ১৫ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:৫৮, ১৫ জুন ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

বাংলাদেশের করব্যবস্থা নিয়ে করদাতাদের দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব। প্রায় প্রতি বাজেটেই করহার, করমুক্ত আয়সীমা কিংবা কর কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। ফলে ব্যক্তি করদাতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারী—সবার জন্যই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের একটি কর পথরেখা ঘোষণা করেছে। দেশের কর ইতিহাসে এমন উদ্যোগ এই প্রথম।
নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ এর মাধ্যমে করদাতারা অন্তত আগামী কয়েক বছরে তাঁদের করের দায় কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পাবেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পূর্বানুমানযোগ্যতা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি পর্যায়ের সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং পারিবারিক ব্যয় পরিকল্পনায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগের মন্থর গতির মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
কর পথরেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিশেষ শ্রেণির নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত করসুবিধা রাখা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও নতুন কর কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করস্ল্যাবটি বাতিল করেছে। ফলে করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর প্রথম করযোগ্য আয়ের ওপর এখন থেকে সরাসরি ১০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। বিষয়টি কাগজে-কলমে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত করদাতাদের ওপর।
যাঁদের আয় করমুক্ত সীমার সামান্য ওপরে, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই করের পরিমাণ আগের তুলনায় কমবে না; বরং বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির মাধ্যমে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার একটি অংশ উচ্চতর প্রাথমিক করহারের কারণে আবার ফিরে নেওয়া হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। মূল্যস্ফীতির চাপে যখন পরিবারের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তখন অতিরিক্ত করের বোঝা মধ্যবিত্তের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
করব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু রাজস্ব সংগ্রহ নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি কার্যকর কর কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যা নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করবে এবং বিদ্যমান করদাতাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করবে। কিন্তু করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পরপরই তুলনামূলক উচ্চ করহার আরোপ করা হলে অনেকের কাছেই করব্যবস্থাকে নিরুৎসাহব্যঞ্জক মনে হতে পারে।
অবশ্য সরকারের অবস্থানও পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও উদ্বেগজনকভাবে কম। সীমিতসংখ্যক করদাতার ওপরই রাজস্ব আহরণের বড় অংশ নির্ভরশীল। করফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয় এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার কর প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চাপ সরকারের ওপর রয়েছে—এ কথাও সত্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনটি? বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা, নাকি করের আওতা সম্প্রসারণ করে নতুন করদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করা?
এই প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতিবিদেরা বহুবার দিয়েছেন। করহার বৃদ্ধি বা স্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বরং প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন, তথ্যভিত্তিক নজরদারি, করফাঁকি প্রতিরোধ এবং নতুন করদাতাদের করের আওতায় আনার উদ্যোগই হতে পারে আরও টেকসই সমাধান।
পাঁচ বছরের কর পথরেখা একদিকে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের জন্য কিছু নতুন উদ্বেগও সামনে নিয়ে এসেছে। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করস্ল্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিও একেবারে অযৌক্তিক নয়।
রাজস্ব সংগ্রহ রাষ্ট্রের প্রয়োজন। তবে সেই রাজস্ব আহরণের পদ্ধতি ও ভারসাম্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি করব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত টাকা আদায় হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং করদাতারা সেটিকে কতটা ন্যায়সংগত, যুক্তিসংগত এবং গ্রহণযোগ্য মনে করছেন, সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য।