img

সিলেটে ছাত্রলীগ কর্মীর রগ কর্তনে নিজেরা জড়িত নয় বলে দাবি ছাত্রশিবিরের

প্রকাশিত :  ০৮:০১, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

 সিলেটে ছাত্রলীগ কর্মীর রগ কর্তনে নিজেরা জড়িত নয় বলে দাবি ছাত্রশিবিরের

সিলেট নগরে ছাত্রলীগের কর্মী রাহাত হোসেন (২৪) এর উপর হামলা চালিয়ে হাত পায়ের রগ কর্তনের ঘটনায় নিজেরা জড়িত নয় বলে দাবি করেছে ছাত্র শিবির।

গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর সভাপতি শাহীন আহমদ এবং মহানগর সেক্রেটারি শহিদুল ইসলাম সাজু এমনটি দাবি করেন। বিবৃতিতে তারা এ হামলার ঘটনায় ছাত্র শিবিরকে অভিযুক্ত করে সংবাদ প্রকাশেরও প্রতিবাদ জানান।

এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে ১০টার দিকে নগরের লাক্কাতুরা এলাকায় রাহাতের উপর হামলা হয়।

আহত রাহাত হোসেন (২৪) নগরের বনকলাপাড়া এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে। তিনি বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আহতের পরিবার হামলা ও রগ কাটার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে।

তবে বৃহস্পতিবার যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর সভাপতি শাহীন আহমদ এবং মহানগর সেক্রেটারি শহিদুল ইসলাম সাজু জানান, সম্প্রতি সিলেটের লাক্কাতুরায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ কর্মী রাহাত হোসেনের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছে।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রলীগ এখন একটি ঘৃণিত নাম। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে, বিশেষ করে গত ১৬ বছরে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তারা ক্যাম্পাসসহ দেশকে অপরাধের এক অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল তারা। এসব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়েই সংগঠনটিকে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, তাদের অপরাধী কর্মকাণ্ডের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া একমাত্র দায়িত্ব প্রশাসনের। ছাত্রশিবির কখনো আইন হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষপাতী নয়।”

নেতৃবৃন্দ বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি যে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির উক্ত ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। কিন্তু কিছু গণমাধ্যম ও ব্যক্তি উক্ত ঘটনায় ছাত্রশিবিরকে জড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ছাত্রশিবির একটি আদর্শিক ছাত্রসংগঠন হিসেবে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, ছাত্র-অধিকার এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের পক্ষে কাজ করে আসছে। অতীতে যেভাবে ছাত্রশিবিরকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অপরাধমূলক ঘটনায় জড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়েছে, এখনও সেই অপপ্রচারের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে।”

নেতৃবৃন্দ বলেন, “আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের নিকট দাবি জানাচ্ছি। সাথে সাথে সকল গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহলকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার থেকে বিরত থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।”

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

বিপুল রঞ্জন চৌধুরী: সিলেটের সাংবাদিকতার এক দৃঢ় নৈতিকতার প্রতীক

প্রকাশিত :  ০৮:১৩, ৩১ মে ২০২৬

শতবর্ষের সাংবাদিকতার ধারায় শ্রীমঙ্গলের এক অবিচল নাম

সংগ্রাম দত্ত: তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে শ্রীমঙ্গল থানার ভীমসি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন বিপুল রঞ্জন চৌধুরী। ব্রিটিশ ভারতের সামাজিক বাস্তবতার ভেতর বেড়ে ওঠা এই মানুষটি পরবর্তীতে সিলেট অঞ্চলের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গভীরভাবে শ্রদ্ধেয় নাম হয়ে ওঠেন।

পারিবারিক দায়িত্বের ভার, শৃঙ্খলা ও নৈতিক অবস্থান—এই তিনটি ভিত্তির ওপর তাঁর ব্যক্তিজীবন গড়ে ওঠে। অল্প বয়সেই পারিবারিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি জীবনের সিদ্ধান্তে পরিণত হন দৃঢ় ও সুসংহত।

চল্লিশের দশকে কলকাতার আনন্দবাজার, স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার এবং আগরতলার সংবাদ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হিসেবে তাঁর সংবাদজগতের সঙ্গে পরিচয়। সেই পাঠাভ্যাসই ধীরে ধীরে তাঁকে সাংবাদিকতার গভীরে নিয়ে যায়।

১৯৬২ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক যুগভেরী–এর মাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে শিলচর, করিমগঞ্জ ও কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখায় ছিল অনুসন্ধানী দৃষ্টি, তথ্যনিষ্ঠতা এবং সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

সাংবাদিকতা তাঁর কাছে ছিল দায়িত্ব, পেশা নয় কেবল। তিনি বিশ্বাস করতেন—সত্যকে আড়াল করা সাংবাদিকতার ব্যর্থতা। তাই কখনোই তিনি সুবিধাবাদী অবস্থান নেননি বা হলুদ সাংবাদিকতার পথে হাঁটেননি।

মৃদুভাষী হলেও তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট। তিনি ছিলেন এমন এক সাংবাদিক, যিনি তোষামোদ বা প্রভাবিত ভাষার বাইরে থেকে সংবাদকে দেখেছেন বিবেকের আলোয়।

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়কাল ছিল এমন এক অধ্যায়, যখন সাংবাদিকতা ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আলোচনাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সহযোগিতার সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা।

সে সময় প্রেসক্লাবের কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন শ্রীমঙ্গলের একদল নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক ও সমাজচিন্তক। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো—

কমলেশ ভট্টাচার্য, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, জহির উদ্দিন আহমেদ, রানা দেবরায়, মো. আলফু মিয়া চৌধুরী, মো. আব্দুল গাফফার, এম এ সালাম চৌধুরী, আব্দুল হাই, বিধু ভূষণ পাল স্বপন, মহিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ মহরম খাঁন, গোপাল দেব চৌধুরী, সৈয়দ নেছার আহমেদসহ আরও অনেকে।

এই প্রজন্মের সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মতভেদকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সংস্কৃতি। নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা বা বিভাজনের পরিবর্তে সহযোগিতাই ছিল মূল শক্তি।

তাঁদের অনেকেই আজ প্রয়াত, কেউ কেউ বয়সজনিত কারণে সক্রিয় জীবন থেকে দূরে। বর্তমানে জীবিতদের মধ্যে রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ও জহির উদ্দিন আহমেদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একইসঙ্গে স্মরণযোগ্য বিষয় হলো—কমলেশ ভট্টাচার্য, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী এবং বিপুল রঞ্জন চৌধুরী ছিলেন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্বশীল অবস্থানে যুক্ত। তবু সাংবাদিকতা জগতে তাঁদের সততা, নিষ্ঠা ও পেশাগত মান নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। বরং তাঁরা একটি সময়ের আদর্শ সাংবাদিকতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

১৯৬০ সালে তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ, ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং ও নির্বাহী কমিটিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

ভূনবীর দশরথ উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং দশরথ উচ্চ বিদ্যালয়ের (বর্তমানে স্কুল অ্যান্ড কলেজ) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর জীবনযাপন ছিল শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নান্দনিক রুচির প্রতিফলন। সাদা পোশাক, শুদ্ধ ভাষা এবং নিখুঁত তথ্য উপস্থাপনা ছিল তাঁর পরিচয়ের অংশ। নিজের কাজ নিজে করা, সময়মতো দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো এবং নিয়মনীতি মেনে চলা ছিল তাঁর স্বভাব।

সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল গভীর—নজরুল সংগীত, শ্যামাসংগীত ও কীর্তন ছিল তাঁর প্রিয়। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ পরিবার নিয়ে রাত জেগে দেখতেন, বিশেষ করে আর্জেন্টিনার প্রতি ছিল তাঁর আবেগ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনে এক গভীর ক্ষতের চিহ্ন রেখে যায়। পারিবারিক সম্পদ, জমিজমা ও গৃহ সম্পূর্ণভাবে লুট হয়। পরে তিনি বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে ন্যায়বিচারের জন্য আবেদন করেন—প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সমাধান আসেনি।

এই অধ্যায় তাঁর জীবনে ব্যক্তিগত সংগ্রামের এক দীর্ঘ ইতিহাস হয়ে আছে।

২০১৫ সালের ৩০ মে, ৯২ বছর বয়সে তিনি শ্রীমঙ্গলের নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির নয়—বরং এক নৈতিক সাংবাদিকতা ঐতিহ্যের নীরব সমাপ্তি।

বিপুল রঞ্জন চৌধুরী রেখে গেছেন এক সাংবাদিকতার ধারা, যেখানে সত্য, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ ছিল মূল ভিত্তি। শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর নাম আজও একটি মানদণ্ড—যা নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সংবাদ কেবল তথ্য নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার।



সিলেটের খবর এর আরও খবর