img

শ্রীমঙ্গলে বালুর নীরব সাম্রাজ্য: অভিযানেও থামছে না অবৈধ উত্তোলন, আড়ালে প্রভাবশালী চক্র

প্রকাশিত :  ১০:৩৮, ০৫ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪১, ০৫ মার্চ ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে বালুর নীরব সাম্রাজ্য: অভিযানেও থামছে না অবৈধ উত্তোলন, আড়ালে প্রভাবশালী চক্র

সংগ্রাম দত্ত: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা বাগান ও বনাঞ্চলের জন্য পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা। পাহাড়, টিলা, ছড়া ও সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা এই পর্যটননির্ভর জনপদে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র ছড়া ও কৃষিজমির আশপাশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। প্রশাসনের অভিযানে বালু জব্দ হলেও মূল হোতারা ধরা পড়ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার পারের টং গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় ছড়া ও ফসলি জমির কাছ থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। এতে পরিবেশের ক্ষতি, কৃষিজমির ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। স্থানীয় সাংবাদিক ও বাসিন্দাদের পোস্টে ছড়া ও কৃষিজমির পাশ থেকে বালু উত্তোলনের দৃশ্য উঠে আসে। এসব পোস্ট দ্রুতই জনমনে আলোচনার জন্ম দেয় এবং প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

দৈনিক কালের কণ্ঠের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মো. আল আমিন এবং দৈনিক খবরের কাগজের প্রতিনিধি মো. এহসানুল হক তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ও সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিষয়টি তুলে ধরেন। পাশাপাশি দৈনিক কালের কণ্ঠ ও দৈনিক বাংলা ট্রিবিউনের মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে উল্লেখ করেন, নতুন সরকার গঠনের পর শ্রীমঙ্গলে মব এবং অবৈধ বালু লুটের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠছে। এ ছাড়া ইতিপূর্বে  শ্রীমঙ্গলের অবৈধ বালু ব্যবসার সাথে তদবিরে এক প্রভাবশালী সাংবাদিক জড়িত বলে তিনি এক পোস্টে উল্লেখ করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সংঘবদ্ধ একটি চক্র নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করছে এবং তা পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন। এসব যান চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে কাদা জমে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থী, কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে।

অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে কৃষিজমির স্বাভাবিক গঠনও পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, ভূমিক্ষয় ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর আগে উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে দি হেলদি চয়েজ অ্যান্ড ফুড বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের পূর্ব পাশে জাগছড়াগামী সড়কের ডানদিকে একটি স্থান থেকেও অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, জাগছড়া এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে ওই স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুন মিয়া, অঞ্জু বর্মন এবং শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর জমির ওপর দিয়ে ট্রাক ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় বালু পাচার করা হয়েছে। এছাড়া কিছুদিন পরপর ওই স্থান থেকে পুনরায় বালু উত্তোলন ও পাচারের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে। সোমবার (২ মার্চ )সহকারী কমিশনার ভূমি মো. মহিবুল্লাহ আকনের নির্দেশনায় লাহারপুর ভূমি অফিসের তহসিলদার কনিকা দেবের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ২০ গাড়ি বালু জব্দ করা হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় শ্রমিক বা ট্রাকচালক আটক হলেও প্রকৃত পরিকল্পনাকারীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ফলে অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আবারও একই কার্যক্রম শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ইতিপূর্বে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বালু পরিবহনের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পর প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও দীর্ঘমেয়াদে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু বালু জব্দ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অবৈধ উত্তোলনের উৎস চিহ্নিত করে মূল পরিকল্পনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও কৃষিজমি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ ও অবকাঠামো রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য বজায় রাখাই এই অঞ্চলের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

হবিগঞ্জে জমির বিরোধ নিয়ে সংঘর্ষে কলেজ ছাত্র নিহত, আহত অন্তত ২০

প্রকাশিত :  ১১:৩৭, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলাস্থ বেগমপুর গ্রামে সরকারী জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়া (২৩) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

নিহত মঞ্জুর মিয়া ওই গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে এবং নবীগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র।

রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকালে উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের বেগমপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে সরকারী জমিতে বসবাস করে আসছিলেন। একই গ্রামের হেলাল মিয়া ও মনিরুজ্জামান ওই জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার সকালে হেলাল ও মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়াসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মঞ্জুর মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন সাফি মিয়া (৩২), মুজিবুর রহমান (৩২), শামিম মিয়া (৫০), মামুন মিয়া (৩১), জুনেদ মিয়া (২৮), রুহেল মিয়া (৩৮), ইমন মিয়া (১৭), কাউছার মিয়া (২২), জুয়েল আহমেদ (৩২)সহ আরও অনেকে। বাকিরা বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েছেন।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

নিহতের বাবা খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা ওই জমিতে বসবাস করে আসছেন। প্রতিপক্ষ জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল এবং ঘটনার দিন ভাড়াটিয়া লোকজন নিয়ে হামলা চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে থানার ওসি (তদন্ত) দুলাল মিয়া জানান, সরকারী জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর