৯১ বছর পর সীমানা বাড়ানোর পথে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা, খুলছে আধুনিক নগরায়ণের সম্ভাবনা
চায়ের রাজধানী ও পর্যটননগরীর আয়তন বাড়বে প্রায় চার গুণ | তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজা ও চা-বাগান এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব | ১৯৮১ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান এম এ মোছাব্বিরের আমলেও প্রকাশিত হয়েছিল গেজেট | এবার খসড়া গেজেট প্রকাশ, চলছে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা
সংগ্রাম দত্ত: চা-বাগানের সবুজে ঘেরা শহর শ্রীমঙ্গল। একদিকে দেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদনকেন্দ্র, অন্যদিকে পর্যটনের আকর্ষণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণচাঞ্চল্য আর নানা জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান। উপজেলা শহর হলেও গুরুত্ব, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈচিত্র্যে শ্রীমঙ্গল দেশের অনেক বিভাগীয় শহরের সঙ্গেও পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। অথচ শহরের পরিধি বেড়েছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন; কিন্তু ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পৌরসভার আয়তন ৯১ বছরেও বাড়েনি।
দীর্ঘদিনের সেই সীমাবদ্ধতা কাটানোর পথ এবার খুলছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের প্রস্তাবে গত ২১ সেপ্টেম্বর খসড়া গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে পৌরসভার আয়তন বর্তমানের ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ বর্তমান আয়তনের প্রায় চার গুণ হবে পৌর এলাকা। জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
শ্রীমঙ্গলের জন্য এটি কেবল প্রশাসনিক সীমানা বাড়ানোর উদ্যোগ নয়; বরং দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদকে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার সম্ভাবনা। প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ কার্যকর হলে সড়ক যোগাযোগ, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহসহ নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের আগে পেরোতে হবে আইনি প্রক্রিয়ার বাকি ধাপগুলো।
উপজেলা শহর, গুরুত্বে বহুমাত্রিক
শ্রীমঙ্গলকে শুধু একটি উপজেলা শহর হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত পরিচয় বোঝা কঠিন। দেশের চা-শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য চা-বাগান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষের যাতায়াত। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহাবস্থান শহরটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
বাঙালিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস, চা-শিল্পের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পর্যটননির্ভর ব্যবসা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিস্তৃতি মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল অনেক আগেই বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক নগরজীবনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এক অর্থে এটি একটি কসমোপলিটন টাউন। শহরের অর্থনৈতিক পরিসর ও সামাজিক বৈচিত্র্য যে গতিতে বেড়েছে, পৌরসভার প্রশাসনিক সীমানা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
শহরের আশপাশের অনেক জনপদ এখন কার্যত শ্রীমঙ্গলের নগরজীবনের অংশ। এসব এলাকার মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনযাত্রা শহরকেন্দ্রিক হলেও প্রশাসনিকভাবে তারা ইউনিয়ন পরিষদের আওতাভুক্ত। ফলে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ ও নাগরিক সেবা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে।
তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখা থেকে প্রকাশিত অতিরিক্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে শ্রীমঙ্গল সদর, আশিদ্রোন ও কালিঘাট ইউনিয়নের নির্দিষ্ট মৌজা ও দাগকে পৌর এলাকার অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় জানানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৩ ধারা ও ৩(১) উপধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব ড. শাহেদ মোস্তফা।
প্রস্তাবিত এলাকার মধ্যে রয়েছে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের রূপসপুর, শ্রীমঙ্গল, ভাড়াউড়া, সুনগইড় ও উত্তরসুর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ। আশিদ্রোন ইউনিয়নের সুনগইড় ও রামনগর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ এবং কালিঘাট ইউনিয়নের ভুড়ভুড়িয়া টি এস্টেট এলাকার নির্দিষ্ট দাগও এ প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট মৌজার সব জমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌরসভার আওতায় আসছে না। গেজেটে উল্লেখ করা নির্দিষ্ট দাগের ভিত্তিতেই নতুন সীমানা নির্ধারিত হবে। ফলে চূড়ান্তভাবে কোন কোন এলাকা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তা নির্ভর করবে প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত সীমানা ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
৯১ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে, বাড়েনি পৌরসভার আয়তন
১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০০২ সালে পৌরসভাটি ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হলেও আয়তন রয়ে গেছে আগের মতোই—মাত্র ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নয়টি ওয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি হোল্ডিং রয়েছে। নিজস্ব রাজস্ব আয় বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। পৌরসভার অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়ক, ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন, ৬৭৫টি স্ট্রিট লাইট ও ২ হাজার ৩০০টি পানির সংযোগ।
এই সীমিত পরিসরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে। শহরের জনবসতি বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে যানবাহন চলাচল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা। কিন্তু প্রশাসনিক সীমানা অপরিবর্তিত থাকায় আশপাশের সম্প্রসারিত জনপদকে একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পৌরসভার সীমানার কাছাকাছি বসবাস করেও অনেক পরিবার পৌরসভার নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সীমানা সম্প্রসারণ কার্যকর হলে এসব এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
১৯৮১ সালে এম এ মোছাব্বিরের আমলেও প্রকাশিত হয়েছিল গেজেট
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান এম এ মোছাব্বিরের আমলে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে সীমানা সম্প্রসারণের বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।
১৯৮৩ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এম এ রহিম পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তৎকালীন জেনারেল এরশাদ সরকারের সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পৌরসভার আয়তন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
তবে ওই সময় শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী এ উদ্যোগে আপত্তি জানান। তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসকসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে স্মারকলিপি দিয়ে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের সব মৌজা ও এলাকা পৌরসভার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান। তাঁর আপত্তির কারণে তখন সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে পৌরসভার বিভিন্ন চেয়ারম্যানও সীমানা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু নানা কারণে তা কার্যকর হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পৌরসভাটির আয়তন অপরিবর্তিত থেকে যায়, যদিও শহরের অর্থনৈতিক ও জনবসতিগত বিস্তার অব্যাহত ছিল।
চলতি বছরের উদ্যোগে নতুন গতি
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়টি আবার সামনে আসে চলতি বছরের ১৫ মার্চ। ওই দিন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি আধা-সরকারি পত্র বা ডিও লেটার দেন।
এরপর স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে। গত ১৯ জুলাই সম্প্রসারণের প্রস্তাব মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রস্তাবটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ২১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় খসড়া গেজেট প্রকাশ করে।
এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এক ধাপ এগিয়েছে। তবে খসড়া গেজেট প্রকাশের অর্থই সীমানা সম্প্রসারণ চূড়ান্ত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্টদের আপত্তি ও মতামত নিষ্পত্তি এবং সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই নতুন সীমানা কার্যকর হবে।
আয়তন বাড়লে বদলাতে পারে নগর ব্যবস্থাপনার পরিসর
শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আফম আব্দুল হাই ডন বলেন, প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে পৌরসভার আয়তন ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার হবে। জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ওয়ার্ডের সংখ্যা বর্তমানের নয়টি থেকে বেড়ে ১২ থেকে ১৪টি হতে পারে।
তিনি বলেন, “সীমানা সম্প্রসারণ হলে পৌরসভার রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়বে। পাশাপাশি নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ, পথবাতি, পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবা পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।”
তবে আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৌরসভার দায়িত্বও বাড়বে। নতুন এলাকার সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য অপসারণ ও পানি সরবরাহের চাহিদা পূরণে প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত অর্থ, জনবল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা কার্যকর করতে করব্যবস্থা, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং সেবার অগ্রাধিকার নির্ধারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
নগর পরিকল্পনাবিষয়ক এই বাস্তবতা শ্রীমঙ্গলের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চা-বাগান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্র, আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তৃতিকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু সীমানা বাড়ানো হলে পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। তাই নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকায় ভূমির ব্যবহার, পানি নিষ্কাশন, সড়ক যোগাযোগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।
আপত্তি জানানোর সুযোগ, এরপর চূড়ান্ত গেজেট
খসড়া গেজেটে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৩ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ থেকে অনূর্ধ্ব এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা প্রস্তাবিত এলাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছে লিখিত আপত্তি বা মতামত জানাতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনের ৩ ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী, উত্থাপিত আপত্তি ও পরামর্শ পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। আপত্তি ও মতামত পর্যালোচনা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠাকালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল মাত্র দুই হাজার, যা বর্তমানে ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু আয়তন সেই ২.৫৮ বর্গকিলোমিটারে আটকে থাকায় সঠিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সার্বিকভাবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত ও সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন থেকেই দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার সীমানা বাড়ানোর দাবি ছিল। অবশেষে মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া গেজেট প্রকাশ হয়।”
তিনি আরও বলেন, “খসড়া গেজেট পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাঁদের কাছ থেকে কোনো আপত্তির কথা জানা যায়নি।”
আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন সীমানা কার্যকর করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রত্যাশা একটাই—সীমানার সঙ্গে বাড়ুক নাগরিক সেবাও
খসড়া গেজেট প্রকাশের খবরকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সীমানা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ায় তাঁরা মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সম্প্রসারণ কার্যকর হলে শহরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত জনপদগুলোকে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সহজ হবে। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে সীমানা বাড়ানোই শেষ কথা নয়। নতুন এলাকার বাসিন্দারা যাতে বাস্তবে পৌরসভার সেবা পান, তা নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বাড়তি জনসংখ্যা ও বর্ধিত এলাকার চাহিদা অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে।
চা-শিল্প, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বহুজাতিক সংস্কৃতির সমন্বয়ে শ্রীমঙ্গল ইতিমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ৯১ বছর পর পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ সেই বাস্তবতার সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোর সামঞ্জস্য তৈরির সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, খসড়া গেজেটের পরবর্তী আইনি ধাপগুলো কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কতটা কার্যকর নগরসেবায় রূপ নেয়।



















