img

কুলাউড়ার নার্সারি পুঞ্জিতে পানজুমে দুর্বৃত্তদের হামলা: অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন

প্রকাশিত :  ১২:৩১, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫৪, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

কুলাউড়ার নার্সারি পুঞ্জিতে পানজুমে দুর্বৃত্তদের হামলা: অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের নার্সারি খাসিয়া পুঞ্জিতে রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে হাজারো ফলবান পানগাছ। এক রাতের এই তাণ্ডবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পান চাষের ওপর নির্ভরশীল ১০টি খাসিয়া ও গারো পরিবার। তাঁদের দাবি, কেটে ফেলা পানগাছের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি, আর এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। পানজুম হারিয়ে পরিবারগুলো এখন জীবিকা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ঘটনার পর থেকে পুঞ্জির বাসিন্দাদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ।

এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আদিবাসী পান চাষিদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী ও পরিবেশকর্মীরা।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব চত্বরে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখা, কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন, খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটি এবং ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) যৌথভাবে এর আয়োজন করে।

মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান অংশগ্রহণকারীরা। সেখানে পাঁচ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

এক রাতের ঘটনায় অনিশ্চিত ১০ পরিবারের ভবিষ্যৎ

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একদল দুর্বৃত্ত নার্সারি পুঞ্জির পানজুমে ঢুকে পানগাছ কেটে ফেলে। এতে ১০টি খাসিয়া ও গারো পরিবারের পান চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুক্তভোগীদের হিসাবে, কেটে ফেলা গাছের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা।

পুঞ্জির বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকার উৎস পান চাষ। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচর্যা করে একটি পানগাছ থেকে আয় পাওয়ার উপযোগী করে তুলতে হয়। সেই গাছ এক রাতেই কেটে ফেলা হলে শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিই হয় না, বন্ধ হয়ে যায় ভবিষ্যৎ আয়ের পথও। নতুন করে পানগাছ লাগিয়ে উৎপাদনে ফিরতে গেলেও প্রয়োজন হয় সময়, শ্রম ও অর্থের।

কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, নার্সারি পুঞ্জির ঘটনার আগে সাহেব টিলা পুঞ্জিতেও দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে পানগাছ কেটে ফেলেছিল। এরপর একই ধরনের ঘটনা ঘটায় পান চাষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তাঁর ভাষ্য, পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এভাবে একের পর এক পানগাছ ধ্বংস হতে থাকলে তাঁরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন পুলিশের

পানগাছ কাটার ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পানজুম পরিদর্শন করেছেন কুলাউড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে তিনি ঘটনাস্থলে যান। এ সময় কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না, উপপরিদর্শক (এসআই) অলক বিহারী গুন ও মো. ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনকালে পুলিশ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত খাসিয়া ও গারো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন। এ সময় তাঁরা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে উপস্থিত ছিলেন কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং, কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিলভেস্টার পাঠাং, নার্সারি পুঞ্জির মান্ত্রী (প্রধান) জনি পতামসহ ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় আদিবাসীরা।

সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নার্সারি পানপুঞ্জিতে পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত পানপুঞ্জি পরিদর্শন করে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ কাজ করছে। অপরাধীরা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন

মঙ্গলবারের প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় শুধু কয়েকটি পরিবারের সম্পদের ক্ষতি হয়নি, তাঁদের দীর্ঘদিনের জীবিকা ও ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়েছে। তাই অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

মানববন্ধন থেকে পাঁচ দফা দাবির ভিত্তিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পানগাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং আদিবাসী পান চাষিদের জীবন-জীবিকা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাংয়ের সভাপতিত্বে এবং মানবাধিকারকর্মী হেলেনা তালাংয়ের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম, ভয়েস অব রিভার মনুর প্রধান নির্বাহী আসম ছালেহ সুহেল, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ডাডলি ডেরিক প্রেন্টিস ও সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল হাসান।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলার সহসভাপতি নারায়ন কুর্মী, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পংকজ কন্দ, মুন্ডা সমাজ কল্যাণ পরিষদ বৃহত্তর সিলেটের সাধারণ সম্পাদক লক্ষন মুন্ডা, লাউয়াছড়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমী, খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লান্ছার তংপের, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি বিশ্বজিৎ নন্দী ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব সূত্রধর, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মৌলভীবাজার জেলার ইনচার্জ উজ্জল রায় এবং ফাদার যোসেফ গমেজসহ স্থানীয় আদিবাসী নেতারা।

নিরাপত্তা ও জীবিকা রক্ষার দাবি

নার্সারি পুঞ্জিতে পানগাছ কাটার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে তাঁরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। পান চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁদের নিয়মিত আয়ের উৎস সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে, একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও তাঁদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

স্থানীয় আদিবাসী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক পুনর্বাসনের বিষয়টিও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পুঞ্জিবাসী ও আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাতে তাঁদের জীবিকা পুনর্গঠন করতে পারেন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাজারো পানগাছের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কয়েকটি পরিবারের দীর্ঘদিনের শ্রম, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই অবলম্বন হারিয়ে তাঁদের জীবনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে অপরাধীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবির পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

৯১ বছর পর সীমানা বাড়ানোর পথে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা, খুলছে আধুনিক নগরায়ণের সম্ভাবনা

প্রকাশিত :  ১২:৪৯, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

চায়ের রাজধানী ও পর্যটননগরীর আয়তন বাড়বে প্রায় চার গুণ | তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজা ও চা-বাগান এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব | ১৯৮১ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান এম এ মোছাব্বিরের আমলেও প্রকাশিত হয়েছিল গেজেট | এবার খসড়া গেজেট প্রকাশ, চলছে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা

সংগ্রাম দত্ত: চা-বাগানের সবুজে ঘেরা শহর শ্রীমঙ্গল। একদিকে দেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদনকেন্দ্র, অন্যদিকে পর্যটনের আকর্ষণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণচাঞ্চল্য আর নানা জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান। উপজেলা শহর হলেও গুরুত্ব, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈচিত্র্যে শ্রীমঙ্গল দেশের অনেক বিভাগীয় শহরের সঙ্গেও পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। অথচ শহরের পরিধি বেড়েছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন; কিন্তু ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পৌরসভার আয়তন ৯১ বছরেও বাড়েনি।

দীর্ঘদিনের সেই সীমাবদ্ধতা কাটানোর পথ এবার খুলছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের প্রস্তাবে গত ২১ সেপ্টেম্বর খসড়া গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে পৌরসভার আয়তন বর্তমানের ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ বর্তমান আয়তনের প্রায় চার গুণ হবে পৌর এলাকা। জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

শ্রীমঙ্গলের জন্য এটি কেবল প্রশাসনিক সীমানা বাড়ানোর উদ্যোগ নয়; বরং দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদকে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার সম্ভাবনা। প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ কার্যকর হলে সড়ক যোগাযোগ, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহসহ নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের আগে পেরোতে হবে আইনি প্রক্রিয়ার বাকি ধাপগুলো।

উপজেলা শহর, গুরুত্বে বহুমাত্রিক

শ্রীমঙ্গলকে শুধু একটি উপজেলা শহর হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত পরিচয় বোঝা কঠিন। দেশের চা-শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য চা-বাগান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষের যাতায়াত। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহাবস্থান শহরটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

বাঙালিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস, চা-শিল্পের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পর্যটননির্ভর ব্যবসা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিস্তৃতি মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল অনেক আগেই বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক নগরজীবনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এক অর্থে এটি একটি কসমোপলিটন টাউন। শহরের অর্থনৈতিক পরিসর ও সামাজিক বৈচিত্র্য যে গতিতে বেড়েছে, পৌরসভার প্রশাসনিক সীমানা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

শহরের আশপাশের অনেক জনপদ এখন কার্যত শ্রীমঙ্গলের নগরজীবনের অংশ। এসব এলাকার মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনযাত্রা শহরকেন্দ্রিক হলেও প্রশাসনিকভাবে তারা ইউনিয়ন পরিষদের আওতাভুক্ত। ফলে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ ও নাগরিক সেবা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে।

তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখা থেকে প্রকাশিত অতিরিক্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে শ্রীমঙ্গল সদর, আশিদ্রোন ও কালিঘাট ইউনিয়নের নির্দিষ্ট মৌজা ও দাগকে পৌর এলাকার অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় জানানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৩ ধারা ও ৩(১) উপধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব ড. শাহেদ মোস্তফা।

প্রস্তাবিত এলাকার মধ্যে রয়েছে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের রূপসপুর, শ্রীমঙ্গল, ভাড়াউড়া, সুনগইড় ও উত্তরসুর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ। আশিদ্রোন ইউনিয়নের সুনগইড় ও রামনগর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ এবং কালিঘাট ইউনিয়নের ভুড়ভুড়িয়া টি এস্টেট এলাকার নির্দিষ্ট দাগও এ প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট মৌজার সব জমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌরসভার আওতায় আসছে না। গেজেটে উল্লেখ করা নির্দিষ্ট দাগের ভিত্তিতেই নতুন সীমানা নির্ধারিত হবে। ফলে চূড়ান্তভাবে কোন কোন এলাকা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তা নির্ভর করবে প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত সীমানা ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

৯১ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে, বাড়েনি পৌরসভার আয়তন

১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০০২ সালে পৌরসভাটি ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হলেও আয়তন রয়ে গেছে আগের মতোই—মাত্র ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নয়টি ওয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি হোল্ডিং রয়েছে। নিজস্ব রাজস্ব আয় বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। পৌরসভার অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়ক, ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন, ৬৭৫টি স্ট্রিট লাইট ও ২ হাজার ৩০০টি পানির সংযোগ।

এই সীমিত পরিসরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে। শহরের জনবসতি বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে যানবাহন চলাচল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা। কিন্তু প্রশাসনিক সীমানা অপরিবর্তিত থাকায় আশপাশের সম্প্রসারিত জনপদকে একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পৌরসভার সীমানার কাছাকাছি বসবাস করেও অনেক পরিবার পৌরসভার নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সীমানা সম্প্রসারণ কার্যকর হলে এসব এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

১৯৮১ সালে এম এ মোছাব্বিরের আমলেও প্রকাশিত হয়েছিল গেজেট

শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান এম এ মোছাব্বিরের আমলে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে সীমানা সম্প্রসারণের বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।

১৯৮৩ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এম এ রহিম পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তৎকালীন জেনারেল এরশাদ সরকারের সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পৌরসভার আয়তন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।

তবে ওই সময় শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী এ উদ্যোগে আপত্তি জানান। তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসকসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে স্মারকলিপি দিয়ে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের সব মৌজা ও এলাকা পৌরসভার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান। তাঁর আপত্তির কারণে তখন সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তী সময়ে পৌরসভার বিভিন্ন চেয়ারম্যানও সীমানা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু নানা কারণে তা কার্যকর হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পৌরসভাটির আয়তন অপরিবর্তিত থেকে যায়, যদিও শহরের অর্থনৈতিক ও জনবসতিগত বিস্তার অব্যাহত ছিল।

চলতি বছরের উদ্যোগে নতুন গতি

দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়টি আবার সামনে আসে চলতি বছরের ১৫ মার্চ। ওই দিন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি আধা-সরকারি পত্র বা ডিও লেটার দেন।

এরপর স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে। গত ১৯ জুলাই সম্প্রসারণের প্রস্তাব মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রস্তাবটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ২১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় খসড়া গেজেট প্রকাশ করে।

এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এক ধাপ এগিয়েছে। তবে খসড়া গেজেট প্রকাশের অর্থই সীমানা সম্প্রসারণ চূড়ান্ত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্টদের আপত্তি ও মতামত নিষ্পত্তি এবং সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই নতুন সীমানা কার্যকর হবে।

আয়তন বাড়লে বদলাতে পারে নগর ব্যবস্থাপনার পরিসর

শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আফম আব্দুল হাই ডন বলেন, প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে পৌরসভার আয়তন ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার হবে। জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ওয়ার্ডের সংখ্যা বর্তমানের নয়টি থেকে বেড়ে ১২ থেকে ১৪টি হতে পারে।

তিনি বলেন, “সীমানা সম্প্রসারণ হলে পৌরসভার রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়বে। পাশাপাশি নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ, পথবাতি, পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবা পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।”

তবে আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৌরসভার দায়িত্বও বাড়বে। নতুন এলাকার সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য অপসারণ ও পানি সরবরাহের চাহিদা পূরণে প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত অর্থ, জনবল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা কার্যকর করতে করব্যবস্থা, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং সেবার অগ্রাধিকার নির্ধারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।

নগর পরিকল্পনাবিষয়ক এই বাস্তবতা শ্রীমঙ্গলের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চা-বাগান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্র, আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তৃতিকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু সীমানা বাড়ানো হলে পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। তাই নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকায় ভূমির ব্যবহার, পানি নিষ্কাশন, সড়ক যোগাযোগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।

আপত্তি জানানোর সুযোগ, এরপর চূড়ান্ত গেজেট

খসড়া গেজেটে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৩ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ থেকে অনূর্ধ্ব এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা প্রস্তাবিত এলাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছে লিখিত আপত্তি বা মতামত জানাতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনের ৩ ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী, উত্থাপিত আপত্তি ও পরামর্শ পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। আপত্তি ও মতামত পর্যালোচনা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠাকালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল মাত্র দুই হাজার, যা বর্তমানে ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু আয়তন সেই ২.৫৮ বর্গকিলোমিটারে আটকে থাকায় সঠিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সার্বিকভাবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত ও সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন থেকেই দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার সীমানা বাড়ানোর দাবি ছিল। অবশেষে মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া গেজেট প্রকাশ হয়।”

তিনি আরও বলেন, “খসড়া গেজেট পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাঁদের কাছ থেকে কোনো আপত্তির কথা জানা যায়নি।”

আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন সীমানা কার্যকর করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রত্যাশা একটাই—সীমানার সঙ্গে বাড়ুক নাগরিক সেবাও

খসড়া গেজেট প্রকাশের খবরকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সীমানা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ায় তাঁরা মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সম্প্রসারণ কার্যকর হলে শহরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত জনপদগুলোকে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সহজ হবে। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে সীমানা বাড়ানোই শেষ কথা নয়। নতুন এলাকার বাসিন্দারা যাতে বাস্তবে পৌরসভার সেবা পান, তা নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বাড়তি জনসংখ্যা ও বর্ধিত এলাকার চাহিদা অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে।

চা-শিল্প, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বহুজাতিক সংস্কৃতির সমন্বয়ে শ্রীমঙ্গল ইতিমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ৯১ বছর পর পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ সেই বাস্তবতার সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোর সামঞ্জস্য তৈরির সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, খসড়া গেজেটের পরবর্তী আইনি ধাপগুলো কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কতটা কার্যকর নগরসেবায় রূপ নেয়।

সিলেটের খবর এর আরও খবর