img

বিদায়বেলায় সিঁদুরের রঙে সম্প্রীতির বন্ধন, শ্রীমঙ্গলে বিজয়া শোভাযাত্রায় হাজারো মানুষের ঢল

প্রকাশিত :  ০৭:০১, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বিদায়বেলায় সিঁদুরের রঙে সম্প্রীতির বন্ধন, শ্রীমঙ্গলে বিজয়া শোভাযাত্রায় হাজারো মানুষের ঢল

সংগ্রাম দত্ত: পর্যটননগরী ও চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। সবুজ চা-বাগান, পাহাড়-টিলা, বনভূমি আর বৈচিত্র্যময় জনপদের এই শহর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষের সহাবস্থানেও স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। সেই বৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল প্রকাশ দেখা গেল শারদীয় দুর্গোৎসবের বিদায়বেলায়। মা দুর্গার বিসর্জনকে ঘিরে সিঁদুর খেলা, আবেগঘন প্রার্থনা আর হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে শ্রীমঙ্গল শহরে অনুষ্ঠিত হলো বিজয়া শোভাযাত্রা। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বিদায়ের বিষাদ, আর সেই আবহে ফুটে উঠল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানুষের মিলনমেলার চিরচেনা ছবি।

বুধবার ( ২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে শ্রীমঙ্গল শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয়। দুপুর ২টায় মৌলভীবাজার সড়কে অবস্থিত শ্রীশ্রী সার্বজনীন দুর্গাবাড়ীর সামনে থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রায় প্রায় ৬০টি ট্রাকে প্রতিমা বহন করা হয়। এতে অংশ নেন হাজারো মানুষ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি পরিণত হয় ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও সম্মিলিত উৎসবের এক বর্ণিল আয়োজনে।

শ্রীমঙ্গল শহর ছাড়াও আশপাশের গ্রামাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন চা বাগানের পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে আসেন পূজারিরা। দুর্গাবাড়ীর সামনে থেকে যাত্রা শুরু করে শোভাযাত্রাটি চৌমুহনী, কলেজ রোড, গুহ রোড, ভানুগাছ রোড ও স্টেশন রোড প্রদক্ষিণ করে আবার চৌমুহনী হয়ে হবিগঞ্জ সড়কে জগন্নাথদেবের আখড়ার সামনে যায়। পরে প্রতিমাগুলো নিজ নিজ মণ্ডপে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

শোভাযাত্রাকে ঘিরে শহরের সড়কগুলোতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাকের বাদ্য, মানুষের উচ্ছ্বাস আর প্রতিমার বর্ণিল সাজে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তবে আনন্দের এই আয়োজনের মধ্যে ছিল দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগও। কারণ, বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি ঘরের মেয়ের বাপের বাড়িতে আসা, কয়েক দিনের আনন্দ শেষে আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন কাহিনি।

সিঁদুরের রঙে বিদায়ের আবেগ

দুর্গাপূজার শেষ দিন বিজয়া দশমী। এই দিনেই প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। বিসর্জনের আগে বিভিন্ন মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয় দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। এরপর একে অপরের সিঁথি ও কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন। কারও গালে লেগে থাকে লাল রং, কারও চোখে জল, আবার কারও মুখে বিদায়ের বেদনা আড়াল করার হাসি।

সিঁদুর খেলার এই রীতিতে মিশে আছে বাঙালির পারিবারিক জীবন, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিফলন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সিঁদুর সৌভাগ্য, দাম্পত্যের মঙ্গল ও সমৃদ্ধির প্রতীক। দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে কল্পনা করে তাঁকে বিদায় জানানোর সময় নারীরা প্রার্থনা করেন, সংসারে যেন শান্তি বজায় থাকে, ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকে এবং সবার জীবনে আসে কল্যাণ।

দেবীবরণের আনুষ্ঠানিকতায় সিঁদুরের পাশাপাশি পান-সুপারি, ধান-দূর্বা ও মিষ্টি নিবেদন করা হয়। দেবীর চরণে সিঁদুর অর্পণের পর নারীরা পরস্পরের মধ্যে তা বিনিময় করেন এবং বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান। সময়ের পরিবর্তনে এই আয়োজন অনেক জায়গায় আরও বিস্তৃত হয়েছে। কোথাও অবিবাহিত নারীরাও অংশ নেন, আবার উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে পুরুষদের উপস্থিতিও দেখা যায়।

শ্রীমঙ্গলের দুর্গোৎসবেও এই আবেগের প্রকাশ কেবল পূজামণ্ডপের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিদায়বেলায় পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবটি হয়ে ওঠে বৃহত্তর সামাজিক মিলনমেলা।

চায়ের রাজধানীতে উৎসবের বর্ণিল আয়োজন

শ্রীমঙ্গলের পরিচয় দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত। বিস্তীর্ণ চা-বাগান, পাহাড়ি প্রকৃতি, বনাঞ্চল ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে পর্যটকদের কাছে উপজেলাটি বিশেষ আকর্ষণের। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। তাঁদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য শ্রীমঙ্গলের স্বতন্ত্র পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে।

 এই জনপদে দুর্গাপূজা তাই কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর আয়োজন ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সমাজে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষের উপস্থিতিতে পূজামণ্ডপগুলো হয়ে ওঠে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা ও শোভাযাত্রা উপভোগ করতে ভিড় করেন নানা বয়সের মানুষ।

 প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত এই শহরে ধর্মীয় উৎসবের এমন আয়োজন স্থানীয় ঐতিহ্য ও পর্যটন আকর্ষণকে নতুন মাত্রা দেয়। চা-বাগানের সবুজের সঙ্গে শহরের উৎসবমুখর পরিবেশ মিলেমিশে শ্রীমঙ্গলকে তুলে ধরে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক প্রতীক হিসেবে।

নিরাপত্তার চাদরে শোভাযাত্রা

বিজয়া শোভাযাত্রাকে নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। বিভিন্ন পূজামণ্ডপের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। নিরাপত্তা তদারকিতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়। শোভাযাত্রার বিভিন্ন অংশে দায়িত্ব পালন করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। স্থানীয় পর্যায় থেকে বিভাগীয় পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।

 স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সিলেটের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নেন।

 শোভাযাত্রার কারণে সড়কে যান চলাচল যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্যও নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের জন্য বিকল্প পথের ব্যবস্থা করা হয়। শোভাযাত্রা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিকল্প পথে যানবাহন চলাচলে সহযোগিতা করেন। প্রতিমাবাহী ট্রাক ও অংশগ্রহণকারীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করার পর মহাসড়কে আবার স্বাভাবিক যান চলাচল শুরু হয়।

 শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার এই আয়োজন উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষের স্বস্তি বাড়িয়েছে। ধর্মীয় আবেগের এমন বড় আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রশাসন, আয়োজক ও স্থানীয় মানুষের সমন্বিত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রীতির বন্ধনেই শ্রীমঙ্গলের পরিচয়

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো শ্রীমঙ্গলেও দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে এই উৎসবের তাৎপর্য পূজার আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও বিস্তৃত। বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাসের কারণে শ্রীমঙ্গলের সামাজিক জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুভূত হয়।

 দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, শোভাযাত্রা দেখতে মানুষের সমাগম এবং উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এই আয়োজন সম্প্রীতির একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও আনন্দ, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রত্যাশা যে সবার এক, শ্রীমঙ্গলের উৎসবমুখর পরিবেশ সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।

 সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়। শ্রীমঙ্গলের মতো বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় জনপদে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উৎসবকে ঘিরে মানুষের অংশগ্রহণ সেই সামাজিক বন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

বিদায়ের বিষাদে ফিরে আসার প্রত্যাশা

বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রা শেষ হয় প্রতিমাগুলো নিজ নিজ মণ্ডপে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতায় সমাপ্তি ঘটে কয়েক দিনের পূজা, প্রার্থনা ও উৎসবের। মণ্ডপের আলো একসময় নিভে আসে, ঢাকের শব্দ থেমে যায়, আর মানুষের মনে থেকে যায় আবারও মা দুর্গার আগমনের অপেক্ষা।

 তবু এই বিদায় নিছক বিচ্ছেদের নয়। বাঙালির কাছে বিজয়া মানে একদিকে বিষাদ, অন্যদিকে নতুন করে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা। সিঁদুরের লাল রং, পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা আর আশীর্বাদের আকাঙ্ক্ষা সেই প্রত্যাশাকেই বহন করে।

 প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগানের ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যময় জনজীবনের জন্য পরিচিত শ্রীমঙ্গলে দুর্গোৎসবের এই আয়োজন আরও একবার তুলে ধরেছে উৎসবের সামাজিক শক্তিকে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বিজয়া শোভাযাত্রা শুধু প্রতিমা বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সম্প্রীতির বন্ধন উদ্‌যাপনেরও উপলক্ষ।

মা দুর্গা কৈলাসে ফিরে গেলেও উৎসবের স্মৃতি থেকে যায় মানুষের মনে। সেই স্মৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকে একটি প্রত্যাশা—ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিক বন্ধন সবার। শ্রীমঙ্গলের সবুজ প্রকৃতির মতোই এই সম্প্রীতি অটুট থাকুক, আর বহুত্বের সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হোক এই জনপদ, দেশ ও মানুষের আগামী দিন।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

চায়ের সবুজ গালিচায় নবদুর্গার আরাধনা, ইছামতিতে ভক্তি ও প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন

প্রকাশিত :  ১৪:২২, ২১ অক্টোবর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ইছামতি চা-বাগানের ভেতরে সবুজ টিলার কোলে শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী মন্দির। চারপাশে চা-গাছের সারি, মন্দির প্রাঙ্গণে ঢাকের বাদ্য আর মন্ত্রোচ্চারণ। দেবী দুর্গার নয় রূপের আরাধনাকে কেন্দ্র করে এখানে সমবেত হচ্ছেন দূরদূরান্তের ভক্ত-পুণ্যার্থী ও পর্যটকেরা। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি চা-বাগানের নৈসর্গিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে আগত দর্শনার্থীদের।

চোখজুড়ে শুধু সবুজ। ছোট ছোট চা-গাছের সারি যেন বিছিয়ে রেখেছে প্রকৃতির গালিচা। তার বুক চিরে চলে গেছে আঁকাবাঁকা পথ। সেই পথ ধরে এগোলে দেখা মেলে এক প্রাচীন উপাসনালয়ের। চারপাশের নিসর্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটিতে তখন চলছে দেবী দুর্গার আরাধনা। ঢাকের ছন্দ, ঘণ্টাধ্বনি আর পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে উঠেছে নির্জন চা-বাগান।

এটি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও ইউনিয়নের ইছামতি চা-বাগানে অবস্থিত শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী সেবাশ্রম। এখানে চলছে ‘নবরূপে নবদুর্গা পূজার্চনা’। অন্য অনেক পূজামণ্ডপে যখন প্রতিমা নির্মাণের ব্যস্ততা, তখন এই মন্দিরে শুরু হয়ে গেছে দেবীর নয়টি রূপের পূজা। প্রতিদিনই এখানে আসছেন ভক্ত, পুণ্যার্থী ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ।

মন্দিরটির বিশেষত্ব শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়; এর অবস্থানও একে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজের মধ্যে মন্দিরের উপস্থিতি যেন প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। কেউ আসছেন দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে, কেউ পূজার আনুষ্ঠানিকতা দেখতে, আবার কেউ মুগ্ধ হচ্ছেন চারপাশের মনোরম দৃশ্য দেখে।

নয় রূপে দেবীর আরাধনা

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মহালয়ার দিন থেকে শুরু হয় এই পূজার্চনা। চলে বিজয়া দশমী পর্যন্ত। নবরাত্রির প্রচলিত রীতি অনুসারে, প্রথম দিন দেবীর শৈলপুত্রী রূপের পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আরাধনা। দ্বিতীয় দিনে পূজিত হন ব্রহ্মচারিণী। এরপর ধারাবাহিকভাবে চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী রূপে দেবীর বন্দনা করা হয়। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসব।

হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে দেবীর প্রতিটি রূপের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। শৈলপুত্রী দৃঢ়তা ও ধৈর্যের, ব্রহ্মচারিণী তপস্যা ও সংযমের এবং চন্দ্রঘণ্টা সাহস ও বীরত্বের প্রতীক। কুষ্মাণ্ডাকে মনে করা হয় সৃষ্টির আদি শক্তি, আর স্কন্দমাতা মাতৃত্ব ও স্নেহের প্রতীক।

অন্যদিকে কাত্যায়নী অশুভ শক্তির বিনাশ ও বিজয়ের, কালরাত্রি অন্ধকার ও অশুভের বিনাশের এবং মহাগৌরী পবিত্রতা ও শান্তির প্রতীক হিসেবে পূজিত হন। নবম দিনে সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় নবদুর্গার উপাসনা। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর এই নয় রূপের বন্দনার মধ্য দিয়ে জীবনে মঙ্গল, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা করা হয়।

প্রতিদিনের পূজায় মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ভক্তদের প্রার্থনা, পূজার সামগ্রী নিয়ে আগমন এবং দেবীদর্শনের অপেক্ষায় কাটে অনেকের সময়। উৎসবের এই আয়োজন ইছামতি চা-বাগানের শান্ত পরিবেশে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

সাত কিলোমিটার পথজুড়ে সবুজের হাতছানি

শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ইছামতি চা-বাগান। এটি সাতগাঁও চা-বাগানের একটি ফাঁড়ি বাগান। মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কের সাতগাঁও চা কারখানাসংলগ্ন লছনা বাজার থেকে উত্তরে প্রায় সাত কিলোমিটার এগোলেই পৌঁছানো যায় সেখানে। পথের প্রায় পুরোটাই চা-বাগানের ভেতর দিয়ে।

এই যাত্রাপথও দর্শনার্থীদের কাছে কম আকর্ষণীয় নয়। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি চা-গাছ, টিলার ঢাল আর দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সবুজের বিস্তার। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে বাগানের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে চোখে পড়ে প্রকৃতির নানা রূপ। কোথাও টিলার গায়ে সাজানো চা-গাছ, কোথাও গাছপালার ফাঁকে উঁকি দেওয়া আকাশ।

এরই মধ্যে সবুজের গভীরে অবস্থান মঙ্গলচণ্ডী মন্দিরের। আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকা উপাসনালয়টি কাছে পৌঁছালে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। একদিকে চা-বাগানের বিস্তৃতি, অন্যদিকে পূজার ধর্মীয় আবহ—দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা এখানে একই সঙ্গে উপভোগ করা যায়।

অনেকে মন্দিরে প্রণাম সেরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন চারপাশের দৃশ্য। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছবি তোলেন, কেউ মুঠোফোনে ধারণ করেন সবুজ টিলার সৌন্দর্য। পূজার স্মৃতির পাশাপাশি চা-বাগানের এই নৈসর্গিক দৃশ্যও তাঁদের ভ্রমণের অংশ হয়ে ওঠে।

বিশ্বাসের টানে মঙ্গলচণ্ডী মন্দিরে

স্থানীয় মানুষের কাছে শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী মন্দির দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ভক্তির একটি পরিচিত স্থান। প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে, এখানে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন দেবীদর্শনে।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মঙ্গলবার মন্দিরে বিশেষভাবে ভক্তদের সমাগম ঘটে। কেউ পূজা দিতে আসেন, কেউ মানত করেন, আবার কেউ নিজের ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। তাঁদের কাছে মন্দিরে আসা নিছক ভ্রমণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আশা ও মানসিক প্রশান্তি।

মন্দিরের পাশেই পূজিত হন ভগবান শিব, যিনি শংকর নামেও পরিচিত। দেবী মঙ্গলচণ্ডীর আরাধনার পাশাপাশি মহাদেবের উপাসনাও উপাসনালয়টির ধর্মীয় গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ফলে এখানে এসে ভক্তরা একই প্রাঙ্গণে দুই দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনার সুযোগ পান।

চায়ের রাজধানীতে নতুন পর্যটন-আকর্ষণ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগান ও পর্যটনকেন্দ্রের জন্য শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম পরিচিত জনপদ। সবুজ টিলা, চা-গাছের সারি আর নিরিবিলি পরিবেশ দেখতে প্রতিবছর এখানে আসেন অসংখ্য পর্যটক। ইছামতি চা-বাগানের মঙ্গলচণ্ডী মন্দির সেই পরিচিত পর্যটনভূমিতে যোগ করেছে ধর্মীয় ঐতিহ্যের আরেকটি আকর্ষণ।

সাধারণত দুর্গাপূজার মণ্ডপে দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে প্রতিমা, আলোকসজ্জা ও উৎসবের আয়োজন। ইছামতিতে এর সঙ্গে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য। চা-বাগানের সবুজের পটভূমিতে মন্দিরের অবস্থান একে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

পূজা দেখতে আসা দর্শনার্থীরা তাই শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা উপভোগ করেই ফিরে যান না; তাঁরা সঙ্গে নিয়ে যান সবুজ প্রকৃতির স্মৃতিও। অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে ইছামতি চা-বাগানের এই বিশেষ আয়োজন সম্পর্কে আরও মানুষের জানার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে চা-বাগান একই সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মস্থল। তাই দর্শনার্থীদের চলাচলের সময় বাগানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন না ঘটানো, চা-গাছের ক্ষতি না করা এবং অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ না করা জরুরি। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাও দায়িত্বশীল পর্যটনের অংশ।

উৎসবের আনন্দে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা

ধর্মীয় উৎসব ঘিরে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লে নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চা-বাগানের ভেতরে অবস্থিত এই মন্দিরে যাতায়াতের পথ, যানবাহন চলাচল এবং দর্শনার্থীদের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

পূজা উপলক্ষে আগত ভক্ত ও পর্যটকেরা যাতে নির্বিঘ্নে আনুষ্ঠানিকতা উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আয়োজক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং ধর্মীয় স্থানের মর্যাদা রক্ষা করাও সবার দায়িত্ব।

 সবুজের বুকে ভক্তির এক শান্ত নীড়

ইছামতি চা-বাগানের শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী সেবাশ্রমে নবদুর্গার পূজার আয়োজন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখানে দেবীর নয় রূপের আরাধনার সঙ্গে মিশে আছে চা-বাগানের নৈসর্গিক পরিবেশ, মানুষের বিশ্বাস এবং ভ্রমণের আনন্দ।

চা-গাছের সারি পেরিয়ে মন্দিরের দিকে এগোলে দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের শব্দ। কাছে গেলে শোনা যায় মন্ত্রোচ্চারণ, দেখা যায় প্রার্থনায় নিমগ্ন ভক্তদের। আর চারদিকে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজের বিস্তীর্ণ সমারোহ।

কারও কাছে এই মন্দির আশ্রয় বিশ্বাসের, কারও কাছে প্রশান্তির; আবার প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য আবিষ্কারের একটি বিশেষ ঠিকানা। সবুজ চা-বাগানের গভীরে তাই নবদুর্গার আরাধনা হয়ে উঠেছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের আবেগের এক অপূর্ব সম্মিলন।


সিলেটের খবর এর আরও খবর