স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার ৩১তম বার্ষিকীতে টাওয়ার হ্যামলেটস ও ইস্ট লন্ডন মসজিদের যৌথ স্মরণসভা : শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন
লন্ডন, ১০ জুলাই ২০২৬ : বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসায় সংঘটিত গণহত্যায় শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে ইস্ট লন্ডন মসজিদ । একই সঙ্গে ন্যায়বিচার, শান্তি এবং সব ধরনের ঘৃণা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে ।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ও ইস্ট লন্ডন মসজিদের যৌথ উদ্যোগে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার ৩১তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণসভায় এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
৯ জুলাই বৃহস্পতিবার টাউন হলের গ্রোসারস উইংয়ে ‘রিমেম্বারিং স্রেব্রেনিৎসা ২০২৬: উই আর হেয়ার’ শীর্ষক মর্মস্পর্শী এই স্মরণসভায় কাউন্সিলের কেবিনেট মেম্বার, কাউন্সিলর, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষার্থী ও কমিউনিটির বিভিন্নস্তরের মানুষ একত্রিত হয়ে ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে নিহত ৮ হাজারের বেশি বসনীয় পুরুষ ও বালকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সূচনা বক্তব্য রাখেন এবং অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জুনায়েদ আহমেদ। বক্তব্য রাখেন কাউন্সিলের কেবিনেট মেম্বার ফর হাউজবিল্ডিং এন্ড এনহ্যান্সিং কাউন্সিল-হোমস্ এন্ড নেইবারহুডস্, কাউন্সিলর সাঈদ আহমেদ, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বসনিয়া-হার্জেগোভিনার রাষ্ট্রদূত ওসমান তপচাগিচ, বো কমন এলাকার সেন্ট পলস চার্চের ভিকার মাদার বার্নাডেট হেগার্টি, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের পাবলিক প্রোটেকশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড এনফোর্সমেন্ট বিভাগের ডিরেক্টর কিরণ ভাগারওয়াল, ভ্রমণ-লেখক ও ইতিহাসবিদ তারিক হুসেন । স্মরণসভায় সোয়ানলি সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব ভাবনা ও প্রতিফলন উপস্থাপন করে।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জুনায়েদ আহমেদ বলেন, "স্রেব্রেনিৎসা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঘৃণাকে অবহেলা করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে । স্মরণ শুধু সহানুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এটি আমাদের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। মানবিক মর্যাদা রক্ষা, অবিচারের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শান্তি, সম্মান ও সহমর্মিতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের কর্তব্য।"
তিনি আরও বলেন, "টাওয়ার হ্যামলেটসের 'নো প্লেস ফর হেট' উদ্যোগকে সমর্থন করতে পেরে আমরা গর্বিত। বর্ণবাদ, ইসলামবিদ্বেষ, ইহুদিবিদ্বেষসহ সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে একযোগে কাজ করে আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে চাই, যেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদ, সম্মানিত বোধ করবেন।"
কাউন্সিলের ক্যাবিনেট মেম্বার কাউন্সিলর সাইদ আহমেদ একটি ঐক্যবদ্ধ ও সহনশীল টাওয়ার হ্যামলেটস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বসনিয়ার রাষ্ট্রদূত ওসমান টপচাগিচ গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বেঁচে থাকা মানুষের সাহস ও দৃঢ়তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
কিরণ ভাগারওয়াল বলেন ঘৃণা মোকাবিলা, নিরাপদ, বিশ্বাসভিত্তিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়তে বাস্তবমুখি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
লেখক, ভ্রমণলেখক ও ইতিহাসবিদ তারিক হোসেন একটি হৃদয়স্পর্শী ও চিন্তাপ্রসূত উপস্থাপনা করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে ইতিহাসকে স্মরণে রাখা, নিজের পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সেন্ট পলস চার্চের ভিকার মাদার বার্নাডেট হেগার্টি বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে সোয়ানলী সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন কাউন্সিলর সাইদ আহমেদ এবং রাষ্ট্রদূত ওসমান টপচাগিচ । তরুণদের এই অংশগ্রহণকে ভবিষ্যতে শান্তি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বার্তা এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই বসনিয়ান সার্ব বাহিনী জাতিসংঘ ঘোষিত 'নিরাপদ এলাকা' স্রেব্রেনিৎসার নিয়ন্ত্রণ দখল করে। ১১ থেকে ২২ জুলাই স্রেব্রেনিৎসা ও এর আশপাশের এলাকায় ৮ হাজারের বেশি বসনিয়াক (বসনিয়ান মুসলিম) পুরুষ ও কিশোরকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এই গণহত্যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ১১ জুলাই স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। জাতিসংঘ ২০২৪ সালে ১১ জুলাইকে আন্তর্জাতিক দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে।


















