রয়টার্সের বিশ্লেষণ

img

ব্যর্থ প্রেসক্রিপশন, পুরোনো ফাঁদেই পা দিচ্ছেন ট্রাম্প

প্রকাশিত :  ০৭:৩৫, ১৮ জুলাই ২০২৬

ব্যর্থ প্রেসক্রিপশন, পুরোনো ফাঁদেই পা দিচ্ছেন ট্রাম্প

মাত্র এক মাস আগে সই হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে একদিকে যেমন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বৈশ্বিক তেল বাজার ও অর্থনীতির চাপ বাড়ছে। দুই পক্ষ এখনো সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়িয়ে চললেও সংকট থেকে কূটনৈতিক উপায়ে বের হওয়ার পথ দিন দিন আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে।

চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা ষষ্ঠ দিনের মতো দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র হামলা-পাল্টা হামলা চলেছে। তবে এবারের সংঘাত কেবল পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে এর জবাবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সংকেত দিয়ে রেখেছে তেহরান।

ভূরাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হয় অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মুখে ট্রাম্প এখন ইরানের জ্বালানি কেন্দ্র, সংযোগ সেতু এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে বোমাবর্ষণের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছেন। এমনকি স্থলসেনা পাঠিয়ে ইরানের প্রধান তেল হাব খার্গ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনাও মার্কিন টেবিলে রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের জোগান পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে।

সাড়ে চার মাসের এই ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন এবং তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বড় ক্ষতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইরানের নীতিনির্ধারকদের অবস্থান পরিবর্তন করা যায়নি। আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ এই সামরিক কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, এই নতুন সেট বা ট্রাম্পের মাথায় থাকা যে কোনো নতুন হামলার পরিকল্পনা ইরানিদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে বলে বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বরং এটি তেহরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কট্টর ও জেদি করে তুলবে।

যদিও হোয়াইট হাউসের দাবি, তারা কূটনীতির পথ খোলা রাখতে চায়, তবে ইরান শুধু সামরিক শক্তির ভাষা বোঝে বলেই তারা মনে করছে। সে কারণেই হরমুজ প্রণালিতে ওয়াশিংটন তার ভাষায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে নতুন করে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বিক্রির বিশেষ ছাড়পত্র বাতিল করেছে।

ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের পেছনে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও বড় ভূমিকা রয়েছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই যুদ্ধের ফলে এরই মধ্যে ইরান ও লেবাননের হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক স্তরে ওয়াশিংটনকে নৈতিক সংকটে ফেলেছে। পাশাপাশি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেও অর্থনৈতিক মন্দার চাপ বাড়ছে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিংয়ে বড় ধস নামিয়েছে।

ইসরায়েলের গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, মার্কিন প্রশাসন যতই চাপ তৈরি করুক, ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করবে না। ট্রাম্প যদি হামলার পরিধি বাড়াতে থাকেন, তবে তেহরানের পক্ষ থেকেও সমানুপাতিক পাল্টা আঘাতের শঙ্কা তৈরি হবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়ে মারবে।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলায় নিহত ৩৮, আহত চার শতাধিক

প্রকাশিত :  ০৬:০০, ১৮ জুলাই ২০২৬

 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত ৩৮ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০০ জনেরও বেশি।

গতকাল শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী একজন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। ইরানের দাবি, এই হামলায় দেশের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং চাবাহার শহরের শহীদ কালান্তারি বন্দরের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত একাধিক দফায় এই হামলা চালানো হয়। এতে হরমোজগান, বুশেহর, সিস্তান ও বেলুচিস্তান, খুজেস্তান এবং লোরেস্তান প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় চাবাহারের শহীদ কালান্তারি বন্দরের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ধ্বংস হয়েছে।

তবে বন্দরের জেটি, পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অক্ষত রয়েছে। প্রেস টিভির দাবি, বন্দরের ভেতরে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুক্রবার স্থানীয় সময় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা চাবাহারে অবস্থিত শহীদ কালান্তারি বন্দরের নজরদারি টাওয়ার সফলভাবে ধ্বংস করেছে। সেন্টকমের দাবি, এই টাওয়ারটি এমন একটি সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার অংশ ছিল, যা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ওমান উপসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ নজরদারিতে এটি ব্যবহৃত হতো বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, হামলার পরপরই কারিগরি ও পরিচালনাসংক্রান্ত দল ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা শুরু করেছে। পাশাপাশি এলাকা নিরাপদ করা এবং বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ হলে আবার পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম শুরু হবে।

হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হরমোজগান প্রদেশ। প্রাদেশিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একাধিক স্থানে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খামির কাউন্টির অন্তত ছয়টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমোজগানের গভর্নরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রদেশটিতে সাতজন নিহত এবং আরো নয়জন আহত হয়েছেন। প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, হামলার কারণে বন্দর আব্বাস, বন্দর খামির ও লার শহরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জরুরি উদ্ধারকারী ও মেরামতকারী দল কাজ করছে। এ ছাড়া বন্দর আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় একজন নিহত এবং আরো আটজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। একই শহরের একটি রেলওয়ে শাখা স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন বলে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বুশেহর প্রদেশের গভর্নর মোহাম্মদ মোজাফফারি বলেছেন, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন আহত হয়েছেন। খুজেস্তান প্রদেশের উপ-গভর্নর ভালিওল্লাহ হায়াতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আহভাজের আশপাশের এলাকায় হামলা চালিয়েছে। সেখানে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর আগে ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছিলেন, আহভাজের কাছে হামলার কারণে ক্যানসার চিকিৎসায় বিশেষায়িত শহীদ বাঘায়ি হাসপাতাল সাময়িকভাবে খালি করতে হয়েছিল। পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের উপ-গভর্নর সাঈদ পুরআলি জানিয়েছেন, চেগেনি কাউন্টির ভেইসিয়ান জেলাতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে সেন্টকম জানিয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে একাধিক দফায় সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি, রসদ সরবরাহের অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, এই অভিযান ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য তৈরি হওয়া হুমকির জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

এদিকে উত্তেজনার মধ্যেই ইরানও পাল্টা হামলার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির দাবি, তারা বাহরাইন, কুয়েত, সিরিয়া এবং ওমানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর